অতিরিক্ত বড়াই করেন? তা কি স্বাভাবিক নাকি এক ধরনের মানসিক সমস্যা বা অসুখ? জানালেন সল্টলেক মাইন্ডসেট ক্লিনিকের সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ দেবাঞ্জন পান।
অতিরিক্ত বড়াই করেন? তা কি স্বাভাবিক নাকি এক ধরনের মানসিক সমস্যা বা অসুখ? জানালেন সল্টলেক মাইন্ডসেট ক্লিনিকের সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ দেবাঞ্জন পান।
পটলডাঙার টেনিদাকে নিশ্চয়ই চেনেন? বা ৭২ নম্বর বনমালী নস্কর লেনের মেসবাড়ির ঘনাদাকে? নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ও প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত এই দুই চরিত্র নিজেদের ব্যাপারে ঢাক পেটাতে ওস্তাদ! আপনিও এধরনের মানুষকে চেনেন নিশ্চয়ই, যাঁরা নিজের সম্পর্কে একটু বাড়িয়ে বলতে ভালোবাসেন। তার মধ্যে বেশকিছু মিথ্যাও থাকে।
কেন তাঁরা করেন এমন?
আসলে, নিজেকে নিয়ে জাহির করা একটি মানসিক, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। মানুষের বিবর্তনের হাত ধরেই এটা এসেছে। একসময় সমাজে সকলে জোট বেঁধে থাকতেন। তখন সমষ্টিগতভাবে সব কাজ হতো। যখন থেকে ব্যক্তিসত্ত্বা প্রাধান্য পেল, অন্যকে ছাপিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিল। জাহির করার বিষয়টি তখন থেকেই মানুষের মধ্যে রয়েছে। বিশিষ্ট স্নায়ুবিজ্ঞানী মাইকেল গ্যাজানিগা বলেছিলেন, ‘সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর আমরা ত্রিভুজ বা বর্গক্ষেত্রের কথা ভাবি না... বরং আমরা ভাবি, অন্যদের তুলনায় আমাদের অবস্থান কোথায়।’ বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আত্মকেন্দ্রিকতা বাড়ছে। ফলে বড়াই করাও বেড়েছে।
জাহির করার প্রয়োজন কেন পড়ে?
বর্তমানে আমরা সবসময় স্টেটাস অ্যাংজাইটিতে ভুগি। সামাজিক মর্যাদা নিয়ে চিন্তা করি। সবসময় মনে হয়, সকলের কাছে আমার গ্রহণযোগ্যতা থাকবে তো? সেজন্যই নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে জাহির করা হয়। দ্বিতীয়ত, কোনো বিষয়ে আত্মবিশ্বাস নড়বড়ে হলেও জাহির করার প্রয়োজন পড়ে। অনেকেই অপরকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান। অন্যের উপরে প্রভাব বিস্তারের জন্যও, এমনকী অন্যকে ছোটো দেখাতে বড়াই করেন অনেকে। নিজের প্রচণ্ড দুর্বলতা ঢাকতেও বড়াই করা হয়। এছাড়াও রয়েছে—
স্নায়ুগত কারণ: সত্যিই কোনো সাফল্য পেলে যেমন খুশি হয়, একইভাবে জাহির করার ক্ষেত্রেও একই আনন্দ পান অনেকে। মস্তিষ্কে ডোপামিন ক্ষরণ হয়।
নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি: এই ধরনের পার্সোনালিটি যাঁদের থাকে, তাঁরা সবসময় প্রশংসা, সহানুভূতি পেতে ভালোবাসেন। এরা নিজেদের ব্যাপারে জাহির করেন।
কী কী প্রভাব পড়ে?
অতিরিক্ত জাহির করলে সামাজিকভাবে বেশ কিছু প্রভাব পড়তে পারে। যেমন, তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। সকলেই এড়িয়ে যেতে চান। তাঁর সম্পর্কে স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততা কমে যায়। অন্যরা অবিশ্বাস করতেও শুরু করেন।
জাহির করার রকম-সকম
প্রত্যক্ষ প্রমাণ এবং সামাজিক নিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে জাহির করার কয়েকটি ধরন রয়েছে।
নিজের দোষ বা ত্রুটির কথা অতিরিক্ত বলা। এর মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করা হয়।
অনেক সময় বাচ্চারা যখন প্রথম কোনোকিছু শিখছে, তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে জাহির করে। শিশুরা বলে, ‘দেখো মা, আমি পেরেছি।’ খানিক বড়ো হলে তাদের বুঝিয়ে দিতে হয়, কতখানি জাহির করলে তা অন্যদের উপর প্রভাব ফেলবে না। তবে অনেকের ক্ষেত্রেই সাফল্যে অতিরিক্ত বড়াই করাটা থেকেই যায়।
ছদ্মবিনয়: ধরা যাক, কোনো ব্যক্তি জানেন তিনি কাজটি ভালো করেছেন। অথচ অতিরিক্ত প্রশংসা শোনার বাসনায় বলছেন, ‘না, না আমি কি আর ভালো পারি?’। একে বলা হয় ছদ্মবিনয়। এটিও একধরনের জাহির করাই।
এলন মাস্ক একবার বলেছিলেন, ‘বড়াই করতে চাই না, তবে বিনয়ের ক্ষেত্রে আমিই সেরা।’ এই ধরনের মন্তব্য আমরা হামেশাই শুনে থাকি। অর্থাৎ আগেভাগেই বলে দেওয়া তিনি বড়াই করছেন না। কিন্তু আসলে তিনি কিন্তু জাহিরই করছেন।
কোনো বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে পরিচিতি রয়েছে বলেও অনেকে বড়াই করে থাকেন।
নিজের ভালো কাজের বিষয়টি বারবার বলেন অনেকে। অনেকক্ষেত্রে অতিরঞ্জনও থাকে। এগুলিও একপ্রকার জাহির করা। বাইপোলার ডিসঅর্ডার যাঁদের থাকে, তাঁদের ম্যানিয়া পর্বে এই সমস্যা দেখা যায়। পরোক্ষভাবেও জাহির করে থাকেন অনেকে। ধরা যাক, অফিসের বস প্রশংসা করেছেন। বন্ধুদের সামনে সেই কথোপকথন তুলে ধরাও একপ্রকার জাহির।
এটা কি মানসিক সমস্যা?
স্বাভাবিকভাবে জাহির করা মানসিক সমস্যা নয়। সকলেরই সাধারণভাবে জাহির করার বৈশিষ্ট্যগুলি দেখা যায়। এটিই যখন অহংকারের পর্যায়ে চলে যায় তখন ঔদ্ধত্য দেখা যায়। অতিরিক্ত বড়াই করা যে অন্যরা পছন্দ করছেন না, এটাই তাঁরা বুঝে উঠতে পারেন না। এটা সমস্যার। পাশাপাশি নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার থাকলে অবশ্যই চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে। এর জন্য মনোবিদের পরামর্শ নেওয়া শ্রেয়। চিকিৎসক পরীক্ষা করে বোঝেন, কোনো সমস্যা রয়েছে কি না। তবে আপনার কোনো পরিচিত ব্যক্তি অতিরিক্ত জাহির করলে বিষয়টি তাঁর নজরে আনতে পারেন। স্পষ্ট জানান, এতো বড়াই না করাই ভালো। নয়তো পরবর্তীকালে তিনি সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারেন।
লিখেছেন শান্তনু দত্ত