আজকের অর্থনীতি বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণ করে পেট্রোপণ্য। পেট্রোপণ্য বেচে একদিকে সংগৃহীত হয় রাজস্ব। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও এই বস্তুটির ভূমিকা অনবদ্য। তাই প্রতিটি রাষ্ট্র পেট্রোপণ্য আঁকড়েই রাজকোষের স্বাস্থ্যরক্ষার চেষ্টা চালায়। কিন্তু তাতে রাষ্ট্রের দৃষ্টি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অলস এবং একবগ্গা হয়ে যায়। পেট্রোপণ্য অবাধে রাজস্ব জোগাতে থাকলে নীতিনির্ধারকগণ সরকারের আয়-রোজগারের বিকল্প পথগুলির দিকে তাকাবার কসরত করেন না। রাজকোষের সুস্বাস্থ্য ফেরাবার এই ভ্রান্ত পন্থা দেশবাসীর স্বাস্থ্যহানির বিশেষ কারণ হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক স্তরে অশোধিত তেলের দাম বাড়লে ভারতের বাজারে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে থাকে পেট্রোল-ডিজেল। স্বভাবতই তার দাম কমে গেলে সুবিধা সাধারণ মানুষেরও পাওয়ার কথা। অর্থাৎ তখন পেট্রোপণ্যের দাম কমবে। কিন্তু মোদি জমানায় জনতা চাক্ষুষ করছে উলটপুরাণ। তেল কোম্পানিগুলির মুনাফার সৌজন্যে ভারত সরকারের রাজকোষ উপচে পড়লেও দেশবাসীকে বঞ্চিতই রাখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের এখন দাম সবচেয়ে কম। রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল আমদানি করেছে ভারত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের তেলের দামও নেমেছে পাল্লা দিয়ে।
তার যাবতীয় মুনাফা কে লুটেছে? কেন্দ্রীয় তেল উৎপাদন সংস্থাগুলি। ক্রিসিল-সহ একঝাঁক সমীক্ষক সংস্থার পূর্বাভাস, চলতি অর্থবর্ষেই (২০২৫-২৬) এক লক্ষ কোটি টাকা মুনাফার পাহাড় ছুঁতে চলেছে তারা। অথচ, দেশের মানুষ বছরভর অগ্নিমূল্যেই পেট্রোল-ডিজেল কিনে চলেছে। সস্তায় অশোধিত খনিজ তেল কিনে দেশের বাজারে চড়া দামে পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন বেচাই কোম্পানিগুলির রেওয়াজ। সরকারি হিসেব এইরকম: গত অর্থবর্ষে ভারত এই সময়সীমায় তেল আমদানি করেছিল ১৫.৯০ কোটি টন। পরিমাণটা এবছর ১৬.৩৪ কোটি টন। অর্থাৎ, তেল আমদানি বেড়েছে। কিন্তু ২০২৫-এর প্রথম দশমাসে ১২ শতাংশ কমে গিয়েছে আমদানি খরচ। গত অর্থবর্ষের প্রথম দশমাসে অশোধিত তেল আমদানিতে ভারতীয় সংস্থাগুলির খরচ হয়েছিল ৯,১০০ কোটি ডলার। অঙ্কটা এবছর ৮ হাজার কোটি ডলারে নেমে এসেছে। এই তথ্য পেট্রোলিয়াম প্ল্যানিং অ্যান্ড অ্যানালিসিস সেলের। এর পাশাপাশি আরও জানা যাচ্ছে, একই কারণে বিপুল হারে বেড়ে চলেছে মুনাফাও। সমীক্ষক সংস্থাগুলির পূর্বাভাস, তেল সংস্থাগুলির অপারেটিং মুনাফা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। ব্যারেল পিছু ১৫-১৮ ডলার মুনাফা করছে তেল সংস্থা। গত অর্থবর্ষে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার মতো মুনাফা হয়েছিল। আমদানি ব্যয় হ্রাসের কারণে অঙ্কটা ১ লক্ষ কোটিতে পৌঁছে যেতে চলেছে। প্রথম তিনটি ত্রৈমাসিকে বিভিন্ন তেল সংস্থার নিট মুনাফার গতিপ্রকৃতিতে সেই ইঙ্গিতই স্পষ্ট। গতবছর অশোধিত তেলের ব্যারেল পিছু দাম ছিল ৮০ ডলার, সেটাই এখন ৬৫-৬৭ ডলার। অশোধিত তেলের দাম তিনবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল ডিসেম্বরে।
বিহার বিধানসভা ভোটের আগে পেট্রোপণ্যের দাম কমাবার সিদ্ধান্ত নিয়েও মোদি সরকার তা কার্যকর করেনি। দেশবাসীকে বঞ্চনা থেকে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ ভরছে তেল সংস্থাগুলি—লিটার পিছু তাদের গড় মুনাফা ৮-১০ টাকা! তেলের দামের মধ্যে শুল্কও ধরা হচ্ছে। সেটাও ঢুকছে মোদি সরকারের ঘরে। সোজা কথায়, তেল বাণিজ্যে মোদি সরকারের পৌষ মাসে দেশবাসীর সর্বনাশ অব্যাহত। শুধু পেট্রোল ও ডিজেল নয়, রান্নার গ্যাসেও জারি রয়েছে গরিব মারা নীতি। এলপিজির জন্য ভারতের কাছে পশ্চিম এশিয়ার বিকল্প এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। শুল্ক-যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে এই লক্ষণ অনেক বেশি স্পষ্ট। নতুন বছরের শুরুতেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেশ থেকে বিপুল পরিমাণে এলপিজি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মোদিবাবুরা। দূরত্ব বৃদ্ধির কারণে পরিবহণ এবং অন্যান্য খরচ মিলিয়ে বাড়বে আমদানি খরচ। সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা, তাই এলপিজিতে ভরতুকি নির্ধারণের ফর্মুলা পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে কেন্দ্র। অতএব, নতুন বছরে রান্নার গ্যাসে ভরতুকি ছাঁটাই এবং তার দামবৃদ্ধির আশঙ্কা মারাত্মক। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলি আমেরিকা থেকে বছরে প্রায় ২২ লক্ষ টন এলপিজি আমদানি করতে চলেছে। নতুন বছরের গোড়া থেকেই সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে বলে খবর। তাই এলপিজি সরবরাহ-শৃঙ্খল অর্থনীতিও বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সোজা কথায়, মোদি সরকারের অভ্যন্তরীণ নীতি এবং বিদেশ নীতি যেন জনগণের বুকে জোড়া শেল! সরকারের জনবিরোধী ভাবনার মাশুলই গুনছে দেশবাসী। এর বিরূপ প্রভাব নিশ্চিতভাবেই পড়বে ভারতের সমগ্র অর্থনীতিতে। পেট্রোপণ্যের চড়া দামের কারণে পরিবহণসহ সমস্ত সেক্টরে মূল্যবৃদ্ধিই হবে স্বাভাবিক প্রবণতা। এই নীতি মুদ্রাস্ফীতিতে ইন্ধন জোগাবে। কমবে কাজের সুযোগ এবং বাড়বে বেকারত্ব ও বৈষম্য। মোদিবাবুর বহু উচ্চারিত ‘আচ্ছে দিন’-এর থেকে দেশবাসীর দূরত্ব বৃদ্ধি পাবে রোজ।