নিজস্ব প্রতিনিধি, বাঁকুড়া: কেন্দ্রীয় সরকার বকেয়া না মেটানোয় বাঁকুড়ায় জলজীবন মিশনের কাজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছেন ঠিকাদাররা। ফলে রুখাশুখা এই জেলায় বাড়ি বাড়ি পানীয় জলের সংযোগ দেওয়ার কাজ পুরোপুরি থমকে গিয়েছে। প্রায় তিন লক্ষ পরিবার পরিস্রুত পানীয় জল পরিষেবা থেকে বঞ্চিত। জানা গিয়েছে, জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের (পিএইচই) বাঁকুড়া ডিভিশনের আওতায় ছোট বড় মিলিয়ে মোট ৮৮৮টি জলপ্রকল্পের কাজ চলছিল। সোমবার থেকে ঠিকাদাররা কর্মবিরতির ডাক দেওয়ায় অধিকাংশ প্রকল্প অর্ধসমাপ্ত হয়ে পড়ে রয়েছে। তারফলে চরম বিপাকে পড়েছেন বাসিন্দারা। গরমে জলের জন্য তাঁরা তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করছেন। কেন্দ্র টাকা না মেটানো পর্যন্ত কাজ শুরু হবে না বলে ঠিকাদাররা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তাঁরা বাঁকুড়ায় পিএইচই-র অফিসের সামনে তিনদিন ধরে অবস্থান কর্মসূচিও পালন করেছেন।
আন্দোলনরত ঠিকাদারদের মধ্যে তপন চৌধুরী, তরুণ পাত্র বলেন, জল জীবন মিশন প্রকল্পে বাঁকুড়া জেলাজুড়ে আমাদের প্রায় ২২৫ কোটি টাকা বকেয়া পড়ে রয়েছে। রাজ্য সরকার এতদিন তার ভাগের টাকা কিছু কিছু করে দেওয়ায় কোনওমতে কাজ চালু রাখা হয়েছিল। কিন্তু, কেন্দ্র টাকা বন্ধ করে দেওয়ায় আমরা শ্রমিক, মিস্ত্রিদের মজুরি মেটাতে পারছি না। তাই অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ডাক দেওয়া হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের বাঁকুড়া ডিভিশনের নির্বাহী বাস্তুকার ঋতম ভট্টাচার্য বলেন, আমাদের ডিভিশনে ঠিকাদারদের ৯০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। জেলার জল প্রকল্পগুলির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাজ্য সরকার টাকা মিটিয়ে দিয়েছে। তবে গত অক্টোবর মাস থেকে কেন্দ্রীয় সরকার নতুন কাজের জন্য এক টাকাও দেয়নি। ঠিকাদারদের পাশাপাশি ওই প্রকল্পের অন্তর্গত কর্মী, ইঞ্জিনিয়ার মিলিয়ে চুক্তিভিত্তিক প্রায় ২৫০ জন বেতন পাচ্ছেন না। কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যাচ্ছে না। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বিজেপির সুভাষ সরকার বলেন, রাজ্যকে কেন্দ্রীয় সরকার ইউপি জমানা থেকেও গত ১০ বছরে চার গুণ বেশি বরাদ্দ দিয়েছে। তাই জল জীবন মিশন প্রকল্পে কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগ ঠিক নয়। বাঁকুড়া-২ ব্লকের বিকনা অঞ্চলের বাসিন্দা মৌমিতা ঘোষ, রমেশ অধিকারী বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে পরিস্রুত পানীয় জলের জন্য অপেক্ষা করছি। এলাকায় পাইপ পাতার পর জলের আশা করেছিলাম। ফের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভোগান্তি অবসানের সম্ভাবনা দেখছি না। অবিলম্বে কাজ শুরুর দাবি জানাচ্ছি।
বাঁকুড়া সদর ও খাতড়া মহকুমা এলাকা এমনিতেই খরা প্রবণ বলে চিহ্নিত। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে চাষের খেত থেকে জলাশয় সবকিছু শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। শালতোড়া, ছাতনা, হীড়বাঁধ, ইন্দপুর, রানিবাঁধ ও খাতড়া ব্লকের কিছু এলাকায় ভূগর্ভস্থ জলেরস্তর অনেক নীচে রয়েছে। পাশাপাশি বাঁকুড়া-১ ও ২ এবং তালডাংরা ব্লকের পরিস্থিতিও খুব একটা ভালো নয়। অগভীর নলকূপ বসিয়েও অনেক সময় প্রয়োজন মতো জল পাওয়া যায় না। বাড়ি বা পাড়ার মোড়ে বসানো নলকূপগুলিও গরমের মরশুমে অকেজো হতে শুরু করে। এখনও সর্বত্র নলবাহিত পানীয় জল পরিষেবার কাজ শুরু করা যায়নি। ফলে জলের জন্য বাসিন্দাদের হাপিত্যেশ করে অপেক্ষা করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে পিএইচই কর্তৃপক্ষ জেলার ৭ লক্ষ ৪২ হাজার ৮০৮টি বাড়িতে নলবাহিত পরিস্রুত পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছিল। তারমধ্যে ৪ লক্ষ ৪২ হাজার ৮২৫টি পরিবারকে এখনও পর্যন্ত সংযোগ দেওয়া গিয়েছে। প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাকিরা কার্যত অথই জলে পড়েছে।