Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

পাখি

হু হু করে হাওয়া দিচ্ছে। পাখির মতো উড়ে যেতে ইচ্ছে করছে বাবাইয়ের। ননীদাদু গল্প করত পাখি হলে খুব সুবিধা

পাখি
  • ৪ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সৌমী গুপ্ত: হু হু করে হাওয়া দিচ্ছে। পাখির মতো উড়ে যেতে ইচ্ছে করছে বাবাইয়ের। ননীদাদু গল্প করত পাখি হলে খুব সুবিধা। যেখানে খুশি যাওয়া যায়, আকাশে ওড়া যায়। লুকিয়ে পড়া যায়। ছোটবেলায় লুকোচুরি খেলা যায়, বড় হলে মানুষ নিজেকে কী করে লুকোয় তা জানা নেই। পাখির মতো উড়ে যায় তখন?
বাবাইয়ের মনে হয় সবাই ওকে দেখে হাসে। ওকে নিয়ে আলোচনা করে। কেন হাসে সেটাই তো বুঝতে পারে না। ওর তখন কষ্ট হয়। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে মায়ের কোলের কাছে গিয়ে গুটিশুটি মেরে শোয়। নিজের মনের কথা এলোমেলো হয়ে গেলেও বুঝতে পারে ও বাকি পাঁচজনের থেকে আলাদা।

Advertisement


তখন বুকের ভেতর মাঝে মাঝে একটা যন্ত্রণা হয়। কাউকে বোঝাতে চায় ও। মাকে বোঝাতে চেয়েছে বহুবার। কিন্তু পারেনি। কথাগুলো জিভের ডগায় এলেই কেমন যেন গিঁট পাকিয়ে যায়। অর্ধেক শব্দ বেরয়, অর্ধেক শব্দ গিলে নেয় তখন। কী যে তার কারণ আজ পর্যন্ত বাবাই বুঝেও ঠিক ধরতে পারল না। পাখি হওয়ার চেষ্টা করেও সেই যন্ত্রণা থেকে পালানোর উপায় বের করতে পারল না। পাখিরাও তো কথা বলতে পারে না। কেউ কেউ পারে। বউ কথা কও, ময়না, টিয়া। মানুষের শেখানো বুলি আওড়ায় ওরা। বাবাই নিজের কথা বলতে চায়। কারওর শেখানো বুলি নয়। আসল কারণ একদিন ডাক্তারকাকু মাকে বুঝিয়ে বলেছিল। সেদিন বাবাই দেখেছে মা কাঁদছে। মা কাঁদলে বাবাইয়ের অদ্ভুত একটা কষ্ট হয়।
ট্রেনটা দুরন্ত গতিতে সামনের রাস্তার বুক চিরে যেন দৌড়চ্ছে। বাবাই অনেকদিন দৌড়য় না! টুবাই আরও ছোটবেলায় দৌড়ত। মা মাঠে নিয়ে যেত। দূরে দাঁড়িয়ে থাকত। মাঠের অপরপ্রান্ত থেকে টুবাই আর বাবাই দৌড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরত। মা বলত দেখি তো কে আগে আমাকে ধরতে পারে। ছোট থেকে একটা প্রতিযোগিতার খাতায় সবাই নাম লেখালেও বাবাই কিন্তু চেয়েছে শুধু নিজেকে ছুঁতে। দৌড়ে আসত তখন প্রাণপণ। মাকে জড়িয়ে ধরাটাই যেন বাবাইয়ের একমাত্র লক্ষ্য ছিল। মায়ের গায়ে একটা গন্ধ পেত বাবাই। মনে হতো পৃথিবীতে আর কোনও ভয় নেই, চিন্তা নেই, কষ্ট নেই, অদ্ভুত এক শান্তির ছায়ায় ঢুকে যেত যেন। আজ বহুদিন পর আবছা-আবছা মায়ের কথা মনে পড়ছে বাবাইয়ের। বাবাই সবটা মনে করতে পারে না। এলোমেলো ভাবনাগুলো মাথায় জট পাকাতে থাকে। মায়ের মুখটা অদ্ভুতভাবে গুলোয় না। শুধু গুলিয়ে যায় অতীত আর বর্তমানের মাঝের সীমারেখাটুকু।


একজন ফেরি এসে বলল, ‘ওই ভেতরে যা, পড়ে মরবি তো!’
এলোমেলো তাকাল বাবাই। চোখের ভাষা অস্পষ্ট, অর্থহীন। তারপর রংচটা মলিন জামার হাতার উপর মুখটা মুছে একটু সরে দাঁড়াল। একটা নির্জন জায়গায় ট্রেনটা থেমেছে। হকার নেমে গেল। নতুন করে কেউ উঠল না। বাবাই এক কোণে দরজার দিকে মুখ করে বসল। কপালে চোখে মুখে নোংরা, মুখ ভর্তি দাড়ি। বাবাই হাসছে।
উল্টো দিকে লোকজন ওর দিকে তাকাচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই ওর দিকে সবাই দু’বার তাকাত। ওর ভ্যাবলা দৃষ্টি, ওর অবোধ্য ভাষা কেউ ধরতে পারত না। মা অবশ্য পারত। ধৈর্যের মধ্যে থাকলে আদর করে কাছে টানত। ধৈর্য ধরে রাখতে পারত না যেদিন সেদিন পিঠে ঘা কতক দিয়ে বলত, ‘মরতে পারিস না! নিজেও জ্বলছিস, আমাকেও জ্বালাচ্ছিস!’ বাবাই মরতে পারেনি। মরে গেল ওর মা। মা যেদিন মারা গেল সেদিন ননীদাদু ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, ‘আজ থেকে মায়ের আর কোনও কষ্ট নেই, দুঃখ নেই। আজ থেকে মা পাখি!’ বাবাই তাই পাখি দেখলেই মাকে খোঁজে। ননীদাদুর সব কথা বাবাই বিশ্বাস করে। ননীদাদু রাস্তার ধারে ছেঁড়া কম্বল পেতে শোয়। পাড়ার নেড়িকে বিস্কুট খেতে দেয়। সারাদিন ভিক্ষা করে আর রাতে পাঁচুদার হোটেলে ডিম ভাত খায়। বাবাইকে একদিন খাইয়েছিল। সেদিন টুবাই খুব রাগ করেছিল। রান্নার দিদি রান্না করে গেছে। মা চলে যাওয়ার পর টুবাই একটা রান্নার লোক রেখেছে। সারাদিন কাজ করে এসে টুবাইয়ের শরীর আর দিত না।


দুপুরে বাবাই খাবার নিতে গিয়ে সবটা ফেলে দিয়েছিল, ইচ্ছে করে ফেলেনি, ভুলবশত। টুবাই বাড়ি ফিরে এসে বাবাইকে কষিয়ে থাপ্পড় মেরেছিল একটা। বাবাই খুব বোঝাতে চেয়েছিল আসল কথাটা। টুবাই বোঝেনি। ভয় পেয়ে বাবাই আরও গোঙাচ্ছিল। টুবাই রেগে গিয়ে ঘর থেকে ওকে বের করে দিয়েছিল। বাবাই কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গিয়েছিল। বাড়ির পিছনে বারান্দায় বসে কাঁদছিল। আর সেই প্রথম বাবাই বুঝেছিল খিদে পেলে সবাই মাকে কেন খোঁজে। বাবাই খুঁজছিল। মা কোথায়! ননীদাদু যে বলেছিল মা পাখি হয়ে গেছে। ঠিক সেই সময় ননীদাদু এসে ওকে নিয়ে গিয়েছিল পাঁচুর দোকানে। ডিম ভাত খাইয়েছিল। বাবাই খেতে খেতে হলুদ ঝোল জামায় ফেলছিল, লালে ঝোলে মাখামাখি করে বলছিল, ‘খুব ঝাল ননী দাদু, মা এত ঝাল দেয় না!’
ননী দাদু হেসে বলেছিল, ‘তুই আর বড় হলি না বাবাই!’
বাবাই হেসেছিল। আর ঠিক তখনই পাঁচুর দোকানের উল্টোদিকে বিনি এসে দাঁড়িয়েছিল। অন্যমনস্ক। আকাশের দিকে তাকিয়ে। বাবাই হা করে তাকিয়ে দেখছিল। আবছা আলোয় ওকে কী মায়াবী লাগছিল। বাবাইয়ের একটা সমস্যা আছে। ওর সব জিনিস এলোমেলো হয়ে যায়। ও গুছিয়ে ভাবতে পারে না। ভাবলেও বলতে পারে না। পৃথিবীর যাবতীয় নিয়ম ওর নিয়মের সঙ্গে মেলে না।
ও বিনিকে দেখতেই থাকল। একসময় বিনি ওর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ঘরে ঢুকে পড়ল। বিনি যে ওর দিকে তাকিয়ে হাসল সেটা বুঝতেই সময় লেগেছিল মিনিট সাতেক। সেই প্রথম বাবাইয়ের মনের ভেতর প্রথম বৃষ্টিতে ভেজার মতো আনন্দ হয়েছিল। মনে হয়েছিল এক ছুটে গিয়ে মাকে খুঁজে জড়িয়ে ধরে বলে, আজ খুব খুশি হয়েছে ও। কিন্তু কেন খুশি হয়েছে জিজ্ঞেস করলে বাবাই হয়তো মুখ নামিয়ে নিত। মনের কথা খোলসা করে বলতে গেলেই ওর জিভ আটকে যায়, আড়ষ্টতা নেমে আসে গলার কাছে। একবার একজন ডাক্তার দেখে বলেছিল, ও ঠিক করে কথা বলতে পারবে দীর্ঘ চিকিৎসা চালানোর পর। তবুও সারাজীবন খুব একটা পরিবর্তন হবে না। তবু নিজের কথাটুকু বলার কাজটুকু চালিয়ে যাওয়ার মতো একটা ব্যবস্থা হবে। বাবাইয়ের মা পরমা ওকে জড়িয়ে ধরে সারারাত কেঁদেছিল। ননীদাদু পরের দিন মাকে বলেছিল মানুষ তো সবাই আলাদা আলাদা। তুমি আলাদা, আমি আলাদা, ও আরেকটু আলাদা। এ নিয়ে আফশোস করলে দুঃখ বাড়বে বই কমবে না। পরমা কাঁদছিল তখনও। আরও কী কী সব বলে যাচ্ছিল। বাবাই শুধু সামনে বকুল ফুলের গাছে দুটো পাখি নাগাড়ে কিচিরমিচির করে যাচ্ছিল ওদের দিকে তাকিয়ে হাসছিল। উল্টোদিকে বিনিদের বাড়ি। ওর মনে হচ্ছিল কে যেন বারান্দায় এসে দাঁড়ায়, কে যেন ওকে দেখে হাসলেই দিনটা রোদের মতো হয়ে যায়, পাখির মতো উড়তে ইচ্ছে করে আকাশে। ও মনে করতে পারছিল না কিছুতেই।
ননীদাদু একদিন ওকে বলেছিল, ‘বাবাই, তুই বিনিকে পছন্দ করিস নারে! কিন্তু কী বল তো তোর মতো, আমার তো মানুষদের কাউকে তেমন করে ভালোবাসতে নেই। তেমন করে ভালোবাসলে বিনিময়ে পাবি অবহেলা! বুঝলি?’ বাবাইয়ের কষ্ট হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল ননীদাদু কেন বলছে এইসব!
তারও কিছুদিন পর একদিন সকালে টুবাই নতুন পাঞ্জাবি পরে সেজেগুজে বেরিয়ে গেল। ননীদাদুর কাছে বাবাইকে রেখে বলল, ‘দেখে রেখ তো! আজ যেন গণ্ডগোল না করে! আমার কাজ হলেই চলে আসব!’
বাবাই জামার সুতো ছিঁড়ছিল বসে বসে। ননীদাদু বলল, ‘বাবাই, তোর দুঃখের জীবনের শেষ নেই রে, চলে যা, এখান থেকে চলে যা, পাখি হবি, নিজের মতো থাকবি। ঘুরে বেড়াবি, শুধু খাবারের জন্য এখানে থাকিস না! আমি কাউকে বলব না! চলে যা!’
বাবাইয়ের আচমকা খুব কষ্ট হয়েছিল। ও মনমরা হয়ে তাকিয়েছিল জানলার দিকে। বিকেলের দিকে বিনি আর টুবাই এসেছিল। মাথা ভর্তি সিঁদুর, লাল টুকটুকে বেনারসি পরে বিনিকে যে কী ভালো দেখতে লাগছিল।
বাবাই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে অনেক পরে বুঝেছিল বিনি ওর দিকে তাকিয়ে হাসলে আর রোদ উঠছে না। বিষণ্ণতার চাদরে মুড়ে যেত ও। প্রতিদিন ওদের খুনসুটি, ওদের বাবাইয়ের প্রতি ঘৃণা, অবজ্ঞা ওকে ঠেলে দিচ্ছিল মন খারাপের দিকে। একদিন টুবাই বিনিকে জড়িয়ে ধরে কানে কানে কীসব বলছিল। বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। বাবাই আচমকা ঢুকে পড়েছিল ঘরে। বিনি ভীষণ রেগে গিয়েছিল। ওকে উদ্দেশ্য করে টুবাইকে বলেছিল, ‘নিজেরা যে একটু নিজেদের মতো করে থাকব এ বাড়িতে তার উপায় নেই। যতদিন ও থাকবে ততদিন এক অশান্তি!’ বাবাইয়ের মনে হয়েছিল এই পৃথিবীতে মা ছাড়া আর কেউ কোথাও ওর জন্য অপেক্ষা করে নেই। আছে একজন সে ননীদাদু। ননীদাদু কিছুটা হলেও ওকে বোঝে।
তার পরদিন বাবাই নিখোঁজ হয়ে গেল। আচমকাই। যেমন হঠাৎ করে ঢুকে পড়েছিল দু’জনের মধ্যে তেমন হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে গেল। কেউ খোঁজ করল না। টুবাই পাড়ার দোকানে খোঁজ করল, একে ওকে দু’-একদিন জিজ্ঞেস করে চুপ করে গেল। ইচ্ছে করেই হয়তো!
শুধু ননীদাদু সন্ধে হলেই বিড়বিড় করে, ‘খাঁচা খুলে দিয়েছি, পাখি উড়ে গেছে! কেউ খোঁজ পাবে না!’
ট্রেনটা বেশ ফাঁকা হয়েছে এখন। গেটের সামনে বড় বড় উস্কোখুস্কো চুল নিয়ে শরীরের অর্ধেক অংশ বের করে বাবাই হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে যেন। গতি কমিয়ে ট্রেনটা ঢুকল আরও একটা স্টেশনে। ইদানীং জিভের সঙ্গে মাথায় একটা গোলমাল চলে। কিছু জিনিস মনে পড়ে, কিছু স্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। বাবাইয়ের মনে হল খুব চেনা। দাঁড়াল। ছেড়ে দিল পাঁচ মিনিট পর। একদম শেষ প্রান্তে বাবাই দেখল বহুদিন পর কে যেন দাঁড়িয়ে। মাথাভর্তি পাকা চুল। চোখ দুটো খুব চেনা। বাবাই বিড়বিড় করতে করতে থেমে গেল। কে ও! মাথাটা তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। ননীদাদু হঠাৎ চিনতে পেরে চিৎকার করে ডাকল, ‘বাবাই!’
বাবাইয়ের আচমকা পাখি হতে ইচ্ছে হল। মনে হল কার নাম যেন। কে যেন ডাকত। কেন যেন মনে হল এখুনি পাখি না হতে পারলে বুকের ভেতরটা আনচান করছে। ও ট্রেনের গেটের হাত ছেড়ে দিল। একটা ল্যাম্পপোস্টে সজোরে ধাক্কার আওয়াজ হল। উপরে কিছু পাখি বসেছিল, ওরা সব উড়ে যাচ্ছে। চোখ দুটো পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আগে বাবাইয়ের মনে হল শরীরটা হালকা হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ! মায়ের মুখটা মনে পড়ছে? তাও বুঝতে পারল না। আবছা হয়ে আসছে ওই দূরে দৌড়ে আসা লোকটা! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ