নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: দেড়শো-দু’শো বছরের ইতিহাস যদি কোনোদিন খাওয়া যেত, তার স্বাদ হয়ত হত এমন-ঘিয়ের সুগন্ধ, পোলাওয়ের সুবাস, খিচুড়ির কুসুম কুসুম গরম স্বাদ, চাটনির টক-ঝাল-মিষ্টি, পায়েসের আর বিভিন্ন মিষ্টির অনাস্বাদিত আঘ্রাণ। এসব নিয়ে কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোর ভোগের থালায় ঢুকে বসে থাকে কয়েক শতাব্দীর স্বাদ।
বনেদি বাড়ির পুজো তাই শুধু চোখে দেখার উৎসব নয়। এ উৎসব নাকের, জিভের, স্মৃতিরও। যদিও সে ভোগ বহুক্ষেত্রেই অনাস্বাদিত। আপামর মানুষ খুব একটা চেখে দেখার সুযোগ পায় না, কারণ পুজোগুলি পারিবারিক। কলকাতার নামজাদা পরিবারগুলিতে কী রান্না হয় তা জানা যাবে, তার আগে সেই সকলের জন্য একটি ভোগের থালা তৈরি করা যাক, যাতে খানিকটা হলেও দর্শনে অর্ধ প্রাপ্তম্ হলেও হতে পারে।
ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত। তার উপর এক চামচ ঘি। থালার একপাশে বাসন্তী পোলাও, তার মধ্যে কিশমিশ, কাজু। খিচুড়ির হাঁড়ি খুলতেই ভাজা মুগডাল আর ঘিয়ের গন্ধ। চচ্চড়িতে আনাজের স্বাদ, নরম, সামান্য কষানো। বড়ির ঝালে পুরনো বাঙালি টক-ঝাল-মশলার পরিমিত সোয়াদ। তারপর মাছ। এ মাছ শুধু মাছ নয়, পুজোর ভোগের মাছ। কোথাও ল্যাটা মাছ পোড়া, কোথাও অন্যান্য মাছের পদ। কলকাতার বহু বনেদি বাড়িতে দেবীর ভোগের এই আমিষ ঐতিহ্য আজও টিকে আছে। মাছের গায়ে আগুনের হালকা পোড়া গন্ধ, মশলার মিহিন আস্তরণ। শেষে মিষ্টি, ঘন দুধের পায়েস। দরবেশ, জিভেগজা কিংবা কোনো বাড়ির নিজস্ব মিষ্টান্ন। এছাড়াও রাধাবল্লভী, ডালনা, ধোঁকা, ফুলকপির রোস্ট, দরবেশ, লেডিকেনি, চন্দ্রপুলি, তিলের সন্দেশ, পেঁড়াকি, গজা, খাজা ইত্যাদি, লিখে শেষ করা যাবে না এত কিছু।
একটি পরিবারের রান্নার প্রাচীন খাতা, প্রয়াত ঠাকুমা বা ঠাকুরদার মুখে মুখে শেখানো রেসিপি, বংশানুক্রমে রান্না করে আসা পাচকের প্রায় গোপন মশলার ঠিকঠাক অনুপান ও রন্ধনশৈলী, সব মিলেমিশে স্বর্গীয় স্বাদের খাবার তৈরি হয়। যার টানে বছর বছর চার ছেলেমেয়েকে নিয়ে মর্ত্যে আসেন দুর্গা। আধুনিক রেস্তরাঁয় এসব খাবারের অনুকরণ করা যায় কিন্তু সেই উত্তরাধিকার কেনা যায় না, কোটি টাকা খরচ করলেও যায় না। এবার দেখা যাক কোলকাতার কোন বনেদি বাড়ি ভোগে কী রান্না করে?
শিবকৃষ্ণ দাঁর বাড়িতে দুর্গাকে ভোগ হিসাবে দেওয়া হয় চাল, ডাল নৈবেদ্যের সঙ্গে ফলমিষ্টান্ন-লুচি-পাঁচরকম ভাজা-নারকেল নাড়ু-ঝাল নাড়ু প্রভৃতি। ছাতুবাবুর বাড়ি ভিয়েনে তৈরি হয় বোঁদে, লেডিকেনি ও অন্য্যান্য মিষ্টান্ন। অন্নভোগ হয় না। ফলমূল, নানা ধরনের মিষ্টি সহযোগে নৈবেদ্য সাজানো হয়। দুর্গার ভোগে থাকে লুচি, নানারকমের ভাজা ও একাধিক মিষ্টি। হাটখোলা দত্তবাড়িতে গাওয়া ঘিয়ের লুচি ও চিনির গুঁড়ো। ভিয়েন বসে। তৈরি হয় দরবেশ, নিমকি, গজা, লেডিকেনি, বালুসাই, মতিচূর, রাধাবল্লভী, খাস্তা কচুরি প্রভৃতি। সাবর্ণদের সব শরিকদের বাড়ি মেলালে দেখা যায়, ঘি-ভাত, বাসন্তী পোলাও, খিচুড়ি, তরকারি, বড়ি, মাছের পদ, পায়েস ও মিষ্টি।। দশমীতে পান্তাভাত, কেশরী ডাল, কচুশাক, কই মাছের ঝাল, চালতার চাটনি ইত্যাদি।
সুজলা-সুফলা বঙ্গদেশে দুর্গাপুজো বৈষ্ণব ও শাক্ত দুই মতেই হয়। বৈঞ্চব ব্রাহ্মণ বাড়িতে ভোগ হয় নিরামিষ আর শাক্তবাড়িতে মাছ-মাংস দেওয়ার চল আছে। শাক্ত বাড়ির পুজোর ভোগে প্রত্যেক দিন মাছ থাকে। খালবিল-নদীনালায় পুষ্ট বঙ্গদেশে আগাগোড়াই মাছের পাল্লা ভারী। বঙ্গে নদীর ফসল হিসাবে মাছ নিবেদিত হয় দুর্গার জন্য। বর্তমানে বঙ্গবাসীর মাছ-মাংস খাওয়া নিয়ে বিতর্ক নতুনভাবে হচ্ছে বটে তবে এ বাংলায় দুর্গার ভোগে মাছের রমরমা আজকের নয়। রুই, কাতলা, ইলিশ ইত্যাদি আঁশযুক্ত মাছের ভোগ দেওয়ারই রীতি।
বনেদি বাড়ির ভোগের কোনো একক মেনু নেই। বাড়ি অনুযায়ী বদলে যায় পদ, রীতিও বদলে যায়, বদলে যায় স্বাদ। কিন্তু প্রতিটি পদেই লেগে থাকে সে বংশের ছাপ। ভোগে আধুনিক ফুড ফেস্টিভ্যালের চাকচিক্য নেই। আছে শুধু উত্তরাধিকার। আছে ঠাকুমা-দিদিমার হাতের রান্নার এক অমোঘ টান। তার স্বাদ নিজস্ব, পরিচয় নিজস্ব, নিজস্ব এবং অচেনা কিছু গল্পও জড়িয়ে।



