মধুছন্দা মিত্র ঘোষ: আদিত্যদেব পশ্চিমে হেলে গেলেও সন্ধে নামতে আরও কিছুটা দেরি হয় পশ্চিমমুলুকে। ফলে অনেকটা সময় জুড়ে বিকেলবেলার রাজত্ব। সেই বিকেলও যখন ম্লান হয়ে আসে তখনই সাগরসৈকতে মনখারাপের কুচি ছড়িয়ে যায়। কাছেপিঠে অনেকগুলি সৈকত থাকলেও আমাদের ম্যাঙ্গালুরু যাপনের তিন রাতের সন্ধেগুলোয় কেটেছে পানাম্বুর সৈকতে। মিহি সোনালি বালি ছেয়ে রয়েছে গোটা সৈকত জুড়ে। সাগরতটের নিজস্ব কিছু ভাষা থাকে। স্তব্ধ ও নীরব। কর্নাটকের এক উপকূলীয় বন্দরশহর ম্যাঙ্গালুরু। পানাম্বুর এখানকার জনপ্রিয় প্রাচীন সৈকত।
সৈকত ছাপিয়ে সাগরকে ছুঁয়ে যায় ছায়ামাখা নিস্তেজ সূর্য-কিরণ। সফেদ ঢেউগুলো এসে জুটে যায় পায়ের পাতায়। তারপর আবার সাগর জলে ফিরে যায় গুটিগুটি। দিগন্তের ক্যানভাসে সূর্যের আভা একটু একটু করে ফিকে হতে থাকে ক্রমশ। সন্ধে নামে, সাগরের জল কালো হয়ে যায়।
কিন্তু তার আগেই গোটা বিকেল জুড়ে হুটোপাটির শেষ নেই। আকাশময় উড়ন্ত রঙিন ঘুড়ির উড়াল। অনেকেই উটের পিঠে ঝালর দেওয়া হাওদায় সওয়ার হয়ে বালির উপর ঘুরে বেড়াচ্ছেন। উটের পিঠে সহজে চড়ার জন্য স্টিলের মই রয়েছে। সৈকতের মাঝে রয়েছে একটি লম্বা বাতিস্তম্ভ। তাকে ঘিরে পর্যটকদের জন্য পাথরের বাঁধানো বসার জায়গা। সেখানে ভিড় করেছে বৈকালিক ভ্রমণে আগত স্থানীয় পরিবারগুলো। ঘুড়ির লড়াই চলছে অবিরাম। লাটাইয়ের দায়িত্ব কখনও রয়েছে ঘুড়ি বিক্রেতার হাতে, কখনও তাঁরা ঘুড়িটা আকাশের অনেকটা ওপরে পাঠিয়ে লাটাইটা সেই ঘুড়ির ক্রেতার হাতে ধরিয়ে দেন এবং মাঞ্জা দেওয়া সুতো টানতে সাহায্য করেন। জমে ওঠে তটরেখায় উপস্থিত লোকের উল্লাস। আর ঘুড়ি যদি ভোকাট্টা হয় তাহলে তো কথাই নেই। সেই উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে উপস্থিত সবার মধ্যে।
পানাম্বুর সৈকতটি পোর্ট ট্রাস্টের অধীনে। প্রবেশপথে একটি তোরণ, লেখা ‘ওয়েলকাম টু কুড়লে বিচ ট্যুরিজম’। যতদূর দেখা যায় দিগন্ত বরাবর নীলাভ চাদর বিছানো। বালিয়াড়ি চত্বরে, মাধুর্যের আঁচ মেখে পায়ে পায়ে পৌঁছে যাই সাগরের কাছে। পায়ের পাতায় ধেয়ে আসে ঢেউ। যাওয়া-আসার পথে কিছু স্টল রয়েছে, সামুদ্রিক জিনিসের। গয়না, রোদ চশমা, বাহারি টুপি, সমুদ্রস্নানের উপযুক্ত পোশাক, ডাব, কফি, সি-ফুডের দোকান সেখানে। সমুদ্রপাড়ে কিছু দক্ষিণী খাবারদাবারের রেস্তরাঁও রয়েছে। কোলাহল, ভিড়, ও দুর্নিবার আমোদপ্রমোদে জেগে থাকে সমুদ্র চত্বর। বিনোদনমূলক নানা আয়োজন যেমন প্যারাসেলিং, পেন্ডুলাম রাইড, চলন্ত ঘুর্ণি, শিশুদের উপযোগী নানা জয় রাইড, এক্কাগাড়িতে ভ্রমণ, ফুট স্পা, শরীরে ট্যাটু আঁকানো, হাতে মেহেন্দি লাগানোর সুযোগ ভরপুর। তন্দুরি মশলা চায়ের দোকান, মেশিন ফিল্টার কফির দোকান, সদ্য উনুনে সেঁকে আচার মাখানো রোস্টেড মকাইদানা... কত আর বলব। এছাড়া সাগরতটের অপূর্ব রম্য শোভা তো আছেই। এরই মাঝে অতন্দ্র প্রহরীর কাজ করে যাচ্ছেন তটরেখা-নিরাপত্তা কর্মীরা। পর্যটকদের নিরাপত্তা তাঁদেরই দায়িত্বে। কেউ অসাবধানে দূরে কোথাও চলে গেলেন কি না সব সময় সেই খেয়াল রাখতেই তাঁরা ব্যস্ত।
নিতান্তই শখে কর্তা ফিশ-স্পা করাল। ১৫০ টাকা পারিশ্রমিক। সৈকত লাগোয়া দোকানিরা জেগে উঠলে, সৈকতের প্রান্তরও যেন মায়াবী হয়ে ওঠে। সায়াহ্নের ছায়া মাড়িয়ে দিবাকর আরও কিছুক্ষণ থেকে যান এখানে।
অলস দুপুরে, ইতিহাস খুঁজে নব্য এক ভ্রমণগল্প হয়ে উঠতেই পারে, কর্নাটকের উপকূল লাগোয়া, আরবসাগরের কিনারা ঘেঁষা ম্যাঙ্গালুরু সমুদ্রশহর। কর্নাটক উপকূল ঘিরে এই সৈকত মনের কুঠুরিতে স্থায়ী আসন পেতে রাখে। ঘন নীল জল, ঢেউ ভাঙার ছন্দ সুষমা, বালিয়াড়ির বুকে নারকেল-পাম গাছেদের হেলে পড়া ছায়া সবই যেন এক একটা গল্প বলে ভ্রামণিকদের। এভাবেই আরবসাগরের দাক্ষিণ্যে, জমাটি মুখরতায় কর্ণাটকের বন্দরশহর ম্যাঙ্গালুরু।
দিগন্তবিস্তৃত জলকথার নীল পেলবতাকে সঙ্গী করেই আরবসাগরের লোনা হাওয়ার সঙ্গে লেপটে থাকে সাগরতটের অনন্ত কলধ্বনি। নিসর্গ বিছিয়ে থাকে চারদিকে। প্রকৃতিপাঠ দিব্য সহজ হয়ে ওঠে তখন।