Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

কলকাতার সেই রাত

রাত প্রায় ১০টা। শহরের রাস্তার মেজাজ দেখে মনে হচ্ছে সন্ধে ৬টা।

কলকাতার সেই রাত
  • ১৭ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত: রাত প্রায় ১০টা। শহরের রাস্তার মেজাজ দেখে মনে হচ্ছে সন্ধে ৬টা। আলোয় ঝলমল কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট, চৌরঙ্গী, হ্যারিসন স্ট্রিট থেকে শিয়ালদা স্টেশন। উপচে পড়ছে ভিড়। কলকাতায় যেন অকাল দুর্গাপুজো। হঠাৎ করেই থেমে গিয়েছিল দাঙ্গা। যদিও কিছু এলাকায় রক্তাক্ত স্মৃতি তখনও টাটকা। আর পাহারায় মোতায়েন স্পেশাল ফোর্স।

Advertisement

ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটা ১৪ আগস্ট ১৯৪৭, বৃহস্পতিবার। পরাধীন দেশের শেষ রাত। প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে মানুষ। বড় মধুর সেই প্রতীক্ষা।  রাত ১২টার ঘণ্টা বাজলেই শেষ হবে ব্রিটিশ শাসন। নতুন করে পথ চলা শুরু করবে ভারতবর্ষ। প্রতিটি মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে তাই রাস্তায় রাস্তায় ঝোলানো বড় বড় ঘড়ি।
মধ্য কলকাতার কংগ্রেস কমিটির সভাপতি মনোরঞ্জন রায়চৌধুরীর ঘোষণা ছিল, দশ হাজার জাতীয় পতাকা বিলি করা হবে। ১০ সি অভয় মিত্র লেন, ৩ নং হরেন্দ্র মল্লিক স্ট্রিট, তালতলার ১ নং নিয়োগী পুকুর লেন, ১০ নং বলরাম দে স্ট্রিট এবং ৩৫/১ বিডন স্ট্রিটে ১৪ তারিখ সকালে শুরু হয় পতাকা বিতরণ। বেলা গড়াতেই সর্বত্র এমন হুড়োহুড়ি যে পুলিস ডাকতে হল।
পিছিয়ে ছিল না বাণিজ্যিক সংস্থাগুলিও। এক লক্ষ বোরোলিন ক্রিম বিনামূল্যে বিতরণের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল সংবাদপত্রে। হিন্দ কেমিকো ইন্ডাস্ট্রিজের বিজ্ঞাপন লেখা হয়েছিল, ‘প্রায় দুই শতাব্দীর পরাধীনতার গ্লানিমা মুছিয়া গেল। আজ আমরা বিদেশী কবলমুক্ত। সম্পূর্ণ স্বাধীন। যে দেশে প্রত্যেকে মুক্ত হৃদয়ে স্ফীত বক্ষে আনন্দে বিভোর। আজ এই উৎসব মুহূর্তে আমরা সকল গ্রাহক ও পৃষ্ঠপোষকদের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করিতেছি ও এক সপ্তাহ কালের জন্য নিম্নোক্ত সুবিধাদানের মনস্থ করিয়াছি - সুবিখ্যাত ‘সুকেশা’ কেশতেলে অদ্য হইতে ৬ ভাদ্র পর্যন্ত প্রতি ডজনে এক টাকা স্বাধীনতা রিবেট দেওয়া হইবে।’
স্বাধীনতা দিবসকে স্মরণীয় করে রাখতে উদ্যোগী ছিল বেঙ্গল বাস সিন্ডিকেটও। ১৫ আগস্ট সকাল ৬টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত বিনা ভাড়ায় যাত্রী পরিষেবা দেওয়ার কথা তারা ঘোষণা করেছিল। ট্রাম কোম্পানির সিদ্ধান্ত ছিল, ১৫ আগস্ট আদায় হওয়া ভাড়া তারা দান করবে দাতব্য কাজে।  ১৫৪ নং ধর্মতলা স্ট্রিটে ‘ফোটোগ্রাফিক ষ্টোর এন্ড এজেন্সি কোং লিঃ’ আবার ফ্রিতে ছবি তোলার সুযোগ দিয়েছিল সেদিন। আর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ঘোষণা ছিল—‘১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসে পশ্চিম বাঙ্গলার সমস্ত জেলার আবগারি ও আফিমের দোকান বন্ধ থাকিবে। কলিকাতায় ১৬ আগস্টও বিদেশী মদের দোকান বন্ধ থাকিবে।’
সেদিন রাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল অল ইন্ডিয়া রেডিওর। সেদিন রাত ১০ টা থেকেই অল ইন্ডিয়া রেডিও শুরু করেছিল বিশেষ অনুষ্ঠান, সন্তোষ সেনগুপ্তের প্রযোজনায় ‘জয়যাত্রা’। পৌনে ১১টায় সাহিত্যিক প্রবোধকুমার সান্যালের প্রযোজনায় ‘দিন আগত ঐ’। রাত ১১টার সময় দিল্লি থেকে সম্প্রচারিত হয় লালকেল্লায় মধ্যরাত্রির স্বাধীনতা অনুষ্ঠান। কলকাতা, হাওড়া, তমলুক, বোলপুর সহ বহু শহরে মাইকে চালানো হয়েছিল গোটা অনুষ্ঠানটি। আর ঘড়িতে ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে আতশবাজির রোশনাইতে ভরে যায় কলকাতার আকাশ। কলকাতার প্রতিটি বাড়ি মুখরিত হয়ে ওঠে শঙ্খ আর উলুধ্বনিতে। মধ্যরাত থেকেই অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায় হেদুয়া পার্ক, দেশপ্রিয় পার্ক ও দেশবন্ধু পার্কে। প্রতিটি রাস্তা থেকে মিছিল যাচ্ছিল রাজভবনের দিকে।
১৪ আগস্ট দুপুর ১টা নাগাদ বিমানে কলকাতায় পৌঁছন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম রাজ্যপাল চক্রবর্তী রাজা গোপালাচারি। গর্ভনর হাউসে তাঁর হাতে দায়িত্ব তুলে দেন শেষ ব্রিটিশ গভর্নর স্যার ফ্রেডরিক বারোজ। ১৫ আগস্ট সকালে রাজভবনে যখন পতাকা উত্তোলন হচ্ছে, তখন সমবেত জনতাকে ধরে রাখা যাচ্ছিল না। যদিও রাজা গোপালাচারির শোভাযাত্রায় কালো পতাকা দেখিয়েছিল বাংলার বিপ্লবীদের একাংশ। ১৩ আগস্ট কলকাতার ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে তাঁর নিয়োগের তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন নেতাজির অগ্রজ শরৎচন্দ্র বসু। বলেছিলেন, রাজা গোপালাচারী ব্রিটিশ সরকারের অনুগত, বিপ্লবী আন্দোলনের বিরোধী। তাঁকে নিয়োগ করে দিল্লির সরকার বাঙালিকে অপমান করেছে। সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষ, মেজর সত্যভূষণ গুপ্তের মতো বিপ্লবীরা।
বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিল কলকাতা পুরসভাও। ক্লাইভ স্ট্রিট, চার্ণক প্লেস ও ডালহৌসি স্কোয়ার ওয়েস্টের নাম পরিবর্তন করে নেতাজি সুভাষ রোড রাখার প্রস্তাব দেন তৎকালীন মেয়র সুধীরচন্দ্র রায়চৌধুরী। এও বলেন, এই বিষয়ে কারও আপত্তি থাকলে তিনদিনের মধ্যে জানান। বলাই বাহুল্য আপত্তি আসেনি। উল্টে মেয়রের কাছে অনুরোধ আসে কলকাতার নাম বদলে সুভাষ নগর রাখার জন্য। কর্পোরেশনের সদস্য যোগীন্দ্রনাথ সাহা সেই দাবির সমর্থনে দীর্ঘ বক্তৃতাও করেন।
প্রথম স্বাধীনতা দিবসে কিন্তু মাংস থেকে বঞ্চিতই ছিল বাঙালি। কারণ, দেশজুড়ে সমস্ত মাংসের দোকান ও কসাইখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় ভারত সরকার। তবে সেই সময় মাছেই ছিল বাঙালির বেশি আগ্রহ। বাজারে ভিড় তাই কমেনি।
যদিও অনেকের কাছেই স্বাধীন ভারতের প্রথম দিনটি আনন্দের ছিল না। কারণ স্বাধীনতা বয়ে এনেছিল দেশভাগ। তাই তো উৎসব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী। নিয়েছিলেন মৌনব্রত। তখন তিনি কলকাতার মিঁয়াবাগানের (আজকের বেলেঘাটা) হায়দরি মঞ্জিলে। দাঙ্গাবিধ্বস্ত কলকাতায় প্রথমবার তাঁকে শুনতে হয়েছিল, ‘গো ব্যাক’ স্লোগান। তবু ১৪ আগস্ট সন্ধ্যায় তাঁর দর্শন পেতে বহু মানুষ ছুটে এসেছিলেন। প্রায় দশ হাজার মানুষকে স্থিরভাবে বসাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন স্বেচ্ছাসেবকরা। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সকলে সামনে আসতে হয় গান্ধীজিকে। অনেকে চেয়েছিলেন তাঁর সামনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে। রাজি হননি তিনি। শুধু সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় বলেছিলেন, আগামী কাল হর্ষ ও বিষাদের দিন। কারণ, স্বাধীনতা যেমন আসছে, তেমনি দেশ দ্বিখণ্ডিতও হচ্ছে।
১৫ আগস্ট গোটা কলকাতা যখন স্বাধীনতা প্রাপ্তির আনন্দে উদ্বেল, ঠিক তখনই ঘটেছিল আরও এক অভাবনীয় ঘটনা। উন্মত্ত জনসমুদ্রের বুক চিরে কালো ব্যাজ পরে মৌন শোভাযাত্রা আয়োজন করেছিলেন হাওড়ার জননেতা বিপ্লবী হরেন্দ্রনাথ ঘোষ। শোকযাত্রার পুরোভাগে আজাদ হিন্দ সরকারের মন্ত্রী দেবনাথ দাস। আসলে দেশভাগ মেনে নিতে পারেননি নেতাজির সহযোদ্ধা, ফরওয়ার্ড ব্লকের বাংলা কমিটির সম্পাদক হরেন্দ্রনাথ। তাই পালন করেছিলেন কালা দিবস।
এত কিছুর মধ্যেও চন্দননগরে শুরু করেছিল নতুন লড়াই। ফরাসি শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য। ১৫ আগস্ট দুপুরবেলা ফরাসি প্রশাসনিক ভবনের সামনে আমরণ অনশন শুরু করেন চারজন। কংগ্রেসের তিনকড়ি মুখার্জি, ফরওয়ার্ড ব্লকের রমেন ঘোষ, কমিউনিস্ট পার্টির উমেশ নন্দী ও ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের কার্তিক দাস।
সব মিলিয়ে স্বাধীন ভারতের প্রথম দিনটা ছিল ইতিহাসের সন্ধিক্ষণ। আনন্দ-শোক বিপরীতমুখী দুই প্রতিক্রিয়ার মতো এই স্বাধীনতার ভিত্তিভূমিও ছিল বহুমাত্রিক। ভেদাভেদ ভুলে ‘বিবিধের মাঝে’ মহা-মিলনই আসলে আমাদের দেশ!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ