গ্রহাণুর আঘাতেই কি নির্বংশ হয় ডাইনোসর? কী বলছে নতুন গবেষণা, জানালেন স্বরূপ কুলভী
গ্রহাণুর আঘাতেই কি নির্বংশ হয় ডাইনোসর? কী বলছে নতুন গবেষণা, জানালেন স্বরূপ কুলভী
আজ থেকে কয়েক কোটি বছর আগের কথা। তখন একেবারে অন্যরকম ছিল আমাদের পৃথিবী। ভয়ংকর অতিকায় প্রাণীরা দাপিয়ে বেড়াত। সেগুলি ছিল খুবই শক্তিশালী আর হিংস্র। তবে কিছু তৃণভোজী প্রজাতিও ছিল। কিন্তু একটা সময় পৃথিবী থেকে মুছে গেল তারা। এই প্রাণীগুলি হল ডাইনোসর। এই শব্দটি এসেছে গ্রিক ডিনিয়োস ও সরাস থেকে। ডিনিয়োস অর্থ ভয়ংকর আর সরাস হল টিকটিকি বা সরীসৃপ। ডাইনোসররা ছিল মূলত মেসোজয়িক যুগের প্রাণী। এই যুগটিকে ডাইনোসর বা সরীসৃপদের যুগ বলা হয়। প্রায় ২৫.২ কোটি বছর আগে এই যুগ শুরু হয়। আর এই পর্বটিকে তিনটি উপযুগে ভাগ করা হয়। সেগুলি হল ট্রায়াসিক যুগ (ডাইনোসরদের প্রথম আবির্ভাব), জুরাসিক যুগ (বিশালকায় ডাইনোসরদের রাজত্ব) ও ক্রেটেশিয়াস যুগ (ডাইনোসারদের বৈচিত্র সর্বাধিক পর্যায়ে)। আর এই ৬ কোটি ৬৬ লক্ষ বছর আগে ডাইনোসরদের আধিপত্য আচমকা শেষ হয়ে যায়। বিলুপ্ত হয়ে যায় এই প্রাণী। এরপরই শুরু হয় সিনোজোয়িক যুগ বা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের যুগ। কিন্তু কীভাবে চিরঘুমে চলে গেল কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর বুকে টিকে থাকা ডাইনোসর? আমরা জানি এক সুবিশাল গ্রহাণু পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার ফলে এই প্রাণীদের বিলুপ্তি ঘটে। শেষের সেই ভয়ংকর একটা দিনে মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপে আকাশ থেকে প্রচণ্ড গতিতে নেমে আসে ৬ মাইল চওড়া এক সুবিশাল গ্রহাণু। আর সেই গ্রহাণু এক ঝটকায় পৃথিবী থেকে কেড়ে নিয়েছিল ডাইনোসরদের। কিন্তু ওই বিপর্যয়ের সঙ্গে সঙ্গেই কি সারা বিশ্বজুড়ে ডাইনোসররা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল? নাকি পরবর্তীকালে পরিবেশজনিত কারণে ধীরে ধীরে নিশ্চিত বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে গিয়েছিল? অর্থাৎ গ্রহাণুর আঘাতে ধুলোর মেঘে সূর্য ঢেকে গিয়ে যে দীর্ঘস্থায়ী শীত নেমেছিল, তাতেই কি তারা না খেতে পেয়ে মারা গিয়েছিল? নাকি আকাশ থেকে ঝরে পড়া আগুনে পাথরের টুকরো থেকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া দাবানল পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল তাদের? এই প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। এবার এব্যাপারে একটা চমকপ্রদ তথ্য সামনে এসেছে। জার্নাল অব জিওফিজিক্যাল রিসার্চ: বায়োসায়েন্সেস-এ প্রকাশিত একটি নতুন নথি প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দ্বিতীয় তত্ত্ব অর্থাৎ ‘ফ্লাসড কুকড’ বা জীবন্তু পুড়ে মৃত্যুর পক্ষেই সওয়াল করা হয়েছে।
অন্যতম গবেষক তথা আমেরিকার পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহ বিজ্ঞানী ব্র্যান্ডন জনসনের কথায়, ‘তখন এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে, চিকসুলুব গ্রহাণু আঘাত হানার এক বা দু’ঘণ্টার মধ্যে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। গ্রহাণুটি আছড়ে পড়ার পরই আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার গাছপালা, ডাইনোসর সহ সমস্ত প্রাণী মুহূর্তের মধ্যে মারা গিয়ে থাকতে পারে। আর এতে গোটা বিশ্বেই বিপর্যয় নেমে আসে। এই বিধ্বংসী ঘটনাই পৃথিবীতে ডাইনোসর যুগের অবসান ঘটায়। আর তারপর নতুন স্তন্যপায়ী প্রাণীদের যুগের সূচনা করে। সেকেন্ডে ১২ মাইল গতিতে গ্রহাণুটি আছড়ে পড়ে পৃথিবীতে। এর আঘাতের শক্তি ছিল হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ফেলা পারমাণবিক বোমার চেয়ে শতকোটি গুণেরও বেশি। আর এই বিপুল আঘাতের ধাক্কায় তৈরি হয়েছিল ৬২ মাইল চওড়া আর ১৯ মাইল গভীর একটা গর্ত। সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ২ মাইল উঁচু সুনামির ঢেউ ভাসিয়ে দেয় বিশ্বের বিপুল অংশকে। শুধু কি তাই? ঘণ্টায় ৬২০ মাইল বেগের ঝড় তছনছ হয়ে গিয়েছিল সবকিছু। সেই প্রলয়ের সময় বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ ছিটকে ওঠে আকাশে। গবেষকরা বলছেন, ওই ধ্বংসাবশেষের ওজন প্রায় ২৫ লক্ষ কোটি মেট্রিক টন। সেগুলি তো আর আকাশে ভেসে বেড়ায়নি। বরং অগ্নিপিণ্ড হয়ে ক্ষেপণাস্ত্রের মতো পৃথিবী এসে পড়ছিল। এগুলির নাম স্ফেরুলস। সেগুলি যেখানেই পড়ে সেখানকার বনেই আগুন ধরে যায়। ওই উৎক্ষিপ্ত ধ্বংসাবশেষের একটা বড়ো অংশ বায়ুমণ্ডলের উঁচুতে উঠে গ্যাসীয় শিলা বাষ্পে পরিণত হয়। গবেষকরা ২০২৩ সালে উত্তর আমেরিকার মাটির স্তরে এমন এক ধরনের অতি সূক্ষ্ম ধূলিকণা খুঁজে পেয়েছেন। তা মূলত ওই পাথরের বাষ্প থেকে তৈরি হয়েছিল বলে অনুমান। জনসন জানিয়েছেন, এই ধূলিকণার স্তরই তাঁর কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়। তা থেকেই তিনি ও তাঁর দল নতুন গবেষণা শুরু করেন। তিনি ও তাঁর সহযোগীরা চিকসুলুব ঘটনার কম্পিউটার সিমুলেশন (কৃত্রিমভাবে বাস্তবের কোনো ঘটনা বা পরিস্থিতির নিখুঁত রূপায়ণ) তৈরি করেন । সেখানে দেখা যায়, বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়া শিলা বাষ্প স্ফেরুলসের চেয়েও ছিল মারাত্মক। তা শিলা বাষ্পের চাদর তৈরি করেছিল, যা পৃথিবীর তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। ওই তাপমাত্রা প্রাণীদের মুহূর্তের মধ্যে ঝলসে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট ছিল। আর তা থেকে এমনিতেই দাবানল গ্রাস করে নেয় পৃথিবীকে। জনসন ও তাঁর সহ গবেষকদের মতে, ওই ঘটনায় তুলনামূলকভাবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বেশিরভাগ প্রাণের বিনাশ ঘটে থাকতে পারে। তবে এই তত্ত্ব নিশ্চিত করতে আরও প্রমাণ দরকার বলে তাঁরা জানিয়েছেন। আর জানিয়ে রাখা ভালো, প্রতিকূল আবহাওয়ায় ধীরে ধীরে ওই সময়ের প্রাণীকুলের ধ্বংসের মুখে পড়ার বিষয়টিও কিন্তু বাতিল করে দেননি ওই বিজ্ঞানীরা।