বীর যোদ্ধা কানাইলাল
বাঙালি বিপ্লবী কানাইলাল দত্ত ১৮৮৮ সালের ৩০ আগস্ট চন্দননগরে জন্মগ্রহণ করেন। নরেন্দ্রনাথ গোস্বামী বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হতে চাইলে কানাইলাল তাঁকে গুলি করে হত্যা করেন। বিচারে তাঁর ফাঁসি হয়। তিনি এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘দেয়ার শ্যাল বি নো অ্যাপিল।’ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এই কথা শুনে বলেছিলেন শ্যাল ও উইলের ব্যবহার কোথায় কীভাবে করতে হয় কানাই বাঙালি জাতিকে তা শেখাল। ফাঁসির আগের দিন এক ওয়ার্ডেন তাঁকে হাসতে দেখে বলেছিলেন কাল সকালে তোমার সব হাসি উধাও হয়ে যাবে। পরের দিন ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে কানাইলাল হাসিমুখেই তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। এইরকম বীর ছিলেন তিনি।
—সানয় ভট্টাচার্য, অষ্টম শ্রেণি
মহীয়সী নারী দুকড়িবালা
ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন নারী বিপ্লবী ছিলেন দুকড়িবালা দেবী। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৮৭ সালের ২১ জুলাই বীরভূমের নলহাটি থানার অন্তর্গত ঝাউপাড়া গ্রামে। তিনি ছিলেন বাংলার নারী বিপ্লবীদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর বিবাহ হয় ফণিভূষণ চক্রবর্তীর সঙ্গে। তাঁর বোনপো নিবারণ ঘটক ছিলেন সশস্ত্র বিপ্লবী। তিনিই মাসিমা দুকড়িবালা দেবীকে বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন। সেই থেকে তিনি বিপ্লবী দলে ‘মাসিমা’ নামে পরিচিত হন। ১৯১৭ সালের ৮ জানুয়ারি বাড়িতে অস্ত্র রাখার অভিযোগে ব্রিটিশ পুলিসের হাতে গ্রেপ্তার হন। ১৯১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের ২৮ এপ্রিল দুকড়িবালা দেবীর জীবনাবসান হয়।
—সৌমিলি মান্না, একাদশ শ্রেণি
মন্ত্রগুপ্তির শপথ
‘বন্ধুগণ এগিয়ে চল, কখনও পিছিয়ে যেও না। দাসত্বের দিন চলে গিয়েছে। স্বাধীনতার লগ্ন আগত, ওঠো, জাগো। জয় আমাদের সুনিশ্চিত।’ সূর্য সেনের এই স্বপ্ন সফল হয়েছিল। কিন্তু তখন তিনি দূর আকাশের তারা। সূর্য সেন অল্প বয়সেই জাতীয়তাবাদের আদর্শে দীক্ষিত হন। চরিত্র গঠন, কঠোর পরিশ্রম ও নিয়মানুবর্তিতাকে তিনি সঙ্গী করেন। অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর সমিতির আদর্শে চট্টগ্রামে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংস্থা তৈরি করেন। এখানকার সদস্যরা মন্ত্রগুপ্তির শপথে দীক্ষিত হয়ে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেন। ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি তাঁর ফাঁসি হয়। ফাঁসির আগেও তাঁর উপর ব্রিটিশ পুলিস নারকীয় অত্যাচার করে।
—তানিয়া পাত্র, একাদশ শ্রেণি
ক্যাপ্টেন লক্ষ্মীর দেশপ্রেম
লক্ষ্মী স্বামীনাথন (সায়গল) ছিলেন একজন সফল চিকিৎসক। তিনি সিঙ্গাপুরে ডাক্তারি প্র্যাকটিস করতেন। লক্ষ্মী সায়গল সিঙ্গাপুরে থাকাকালীন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগদান করেন। আইএনএ-এর নারী ব্রিগেড ‘রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট’-এ নেতৃত্ব দেন। তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। যিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি দেশপ্রেমের জন্য নিজের সফল কর্মজীবন ত্যাগ করে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিলেন। তাঁর এই আত্মত্যাগের জন্য তিনি ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী নামেও পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীকালে বন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে গরিব মানুষের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা শুরু করেন।
—অন্বেষা ঘোষ, একাদশ শ্রেণি
বীর কন্যা নীরা আর্য
নীরা আর্য ১৯০২ খ্রিস্টাব্দের ৫ মার্চ উত্তরপ্রদেশের খেকরা নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম মহিলা গুপ্তচর। তাঁর বিবাহ হয়েছিল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অফিসার শ্রীকান্ত জয় রঞ্জন দাসের সঙ্গে। কিন্তু তাঁদের আদর্শগত পার্থক্য ছিল। তাই নীরা আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগ দেন। শ্রীকান্ত পদোন্নতির জন্য নেতাজিকে হত্যার চেষ্টা করেন। কিন্তু নেতাজিকে বাঁচানোর জন্য নীরা নিজের স্বামীকে হত্যা করেন। ব্রিটিশ সেনার অফিসারকে হত্যার অভিযোগে নীরাকে আন্দামানের সেলুলার জেলে পাঠানো হয়। জেলেও তাঁর উপর অমানবিক অত্যাচার করা হয়।
—পিয়াশা ঘোষ, একাদশ শ্রেণি
স্বদেশপ্রেম
ক্ষুদিরাম বসু ছিলেন বরাবর জেদি ও নির্ভীক মানুষ। তিনি তমলুক হ্যামিলটন ও পরে মেদিনীপুর কলেজিয়েট বিদ্যালয়ে শিক্ষাগ্রহণ করেন। সালটা ১৯০৩। তখন তিনি ছাত্র ছিলেন। তাঁর সহপাঠী ছিলেন ফণিভূষণ ঘোষ। ফণিভূষণ একদিন বোম্বাই মিলের কোরা পরে এলে সহপাঠীরা তাঁকে দেখে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করেছিলেন। এতে মর্মাহত হন ফণিভূষণ। তখন তাঁর হয়ে ক্ষুদিরাম বলেন, ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় যত পুরনো, যত মোটা, যত ছেঁড়া বা আনকোরা হোক না কেন, তা আমাদের জিনিস। তাতে আমাদের লজ্জার বা অপমানের কী কারণ থাকতে পারে? দেশি কাপড় আমাদের গোলামির চিহ্ন তো নয়। আমি যদি ফণির কাপড়ের মতো একখানি কাপড় পেতাম, তবে তা জড়িয়ে সকলের সামনে ছুটে যেতাম। তাতে যে আমার কী আনন্দ হতো তা আর কী বলব!’ ক্ষুদিরামের এই স্বদেশপ্রেম সকলকে প্রভাবিত করেছিল।
—সুপ্রিয়া দাস, একাদশ শ্রেণি
প্রধান শিক্ষকের কলমে, গরলগাছা হাই স্কুল (উঃ মাঃ)
‘ডাক্তার গ্রাম’! একসময় লোকে চিনত এই নামেই। সেই বর্ধিষ্ণু গ্রামকে নিয়ে কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক লিখেছিলেন—‘গরলগাছা নয়কো তুমি অমৃতফল দিতে পারো’। বহু কৃতী সন্তানের জন্মস্থান হুগলি জেলার ডানকুনি সংলগ্ন এই গরলগাছা গ্রাম।
ঊনবিংশ শতাব্দী। একদিকে চলছে স্বাধীনতার জন্য লড়াই, অন্যদিকে কুসংস্কার, অশিক্ষা দূরীকরণের চেষ্টা। আর স্কুল সে তো সোনার পাথরবাটি। তখন গ্রামের গুরুমশাই ছিলেন বিপিনবিহারী দে। তিনি পাঠশালা চালাতেন স্থানীয় শিক্ষাব্রতী অনুকূলচন্দ্র কোলের চণ্ডীমণ্ডপে। সেই সময় গরলগাছার জমিদার ছিলেন শিক্ষানুরাগী দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। ১৮৯৬ সালের ১৬ মার্চ অহল্যাবাঈ রোডের ধারে তাঁর অর্থানুকূল্যে প্রতিষ্ঠা হয় এই স্কুল। প্রথমে নাম ছিল গরলগাছা হাই-ইংলিশ স্কুল। প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন নারায়ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। বিপিনবিহারী দে সহ পাঁচজন শিক্ষক ও ৯৫ জন ছাত্র নিয়ে শুরু হয় পথচলা। পরের বছরই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন মেলে। চারজন ছাত্র উত্তীর্ণ হন এন্ট্রান্স পরীক্ষায়। প্রাক্তনীদের মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত গণিতবিদ ভোলানাথ মুখোপাধ্যায়, ধন্বন্তরী চিকিৎসক ডাঃ সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায় (সিধু ডাক্তার),
বাংলা সাহিত্যে প্রথম স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত বিশ্বেশ্বর পাল প্রমুখ। শতাব্দী প্রাচীন এই স্কুলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের কৃতীর তালিকায় রয়েছে অগুণতি ছাত্রছাত্রী।
গরলগাছার এই স্কুলটি বহু মনীষীর পদধূলিধন্য। তাঁদের মধ্যে অন্যতম জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ভারত সভার প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ঔপন্যাসিক রমেশচন্দ্র দত্ত প্রমুখ। স্কুলের শতবর্ষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন রাজ্যপাল রঘুনাথ রেড্ডি।
ক্রীড়া, চিত্রাঙ্গন, সঙ্গীত, নৃত্য, বিতর্ক, তাৎক্ষণিক বক্তৃতাতে এই স্কুলের পড়ুয়ারা জাতীয় স্তরে পুরস্কার পেয়েছে। ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মীরা মিলে গরলগাছা হাই স্কুল একটি যৌথ পরিবার। বর্তমানে বিদ্যালয়ে পড়ে প্রায় ১ হাজার ৭০০ ছাত্রছাত্রী। রয়েছে বিজ্ঞান, কলা ও বাণিজ্য বিভাগ। তবে এত ছাত্রছাত্রী নিয়ে স্কুল চালানোর কতগুলি সমস্যা রয়েছে। বেশ কয়েকটি বিষয়ে শিক্ষকের অভাব আছে। এছাড়া স্মার্ট ক্লাসরুম তৈরি, শ্রেণিকক্ষগুলি রং করা, খেলার মাঠের পাঁচিল উঁচু করা সহ স্কুলের বিভিন্ন পরিকাঠামোগত উন্নয়ন আশু প্রয়োজন। সকলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেই ১২৯ বছরের স্কুলটি নবরূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।
—রবীন্দ্রনাথ সাধুখাঁ, প্রধান শিক্ষক
সংকলক: শম্পা সরকার
ছবি: দীপেশ মুখোপাধ্যায়