সুমন তেওয়ারি, দুর্গাপুর: দুর্গাপুর আদালতের এজলাস। সেখানে হাজির অল্প বয়সী যুগল। মেয়েটির কপালে গেরুয়া তিলক। ছেলেটির মাথায় লাল তিলক। দু’জনেই বেশ কেতাদুরস্ত। এসেছেন ডিভোর্স নিতে। বিচারক জানতে চাইলেন বিচ্ছেদ নেওয়ার সিদ্ধান্ত কেন? উত্তরে যুবতী জানালেন, ‘টেস্ট ম্যাচিং হচ্ছে না।’
বিয়ের বিষয়ে বলতে গিয়ে তিনি জানান, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে পরিচয়। ২০২৩ সালে বিয়ে। ২০২৪ সাল থেকেই আলাদা থাকেন। ২০২৫ সালে ডিভোর্সের আবেদন করেছিলেন। বিচারক প্রশ্ন করেন, বিয়ের আগে যখন মেলামেশা করতেন তখন টেস্ট ম্যাচিং হচ্ছে কিনা, দেখলেন না? যখন খুশি বিয়ে করা যায়। এখানে আসা যায়, আবার বিচ্ছেদেরও আবেদন করা যায়? নীরব যুগল। একরাশ বিরক্তি নিয়ে বিচ্ছেদের আবেদনে সম্মতি জানালেন বিচারক।
দুর্গাপুর আদালতে চারজন বিচারকের এজলাসে বিবাহ বিচ্ছেদ মামলার শুনানি হয়। সব এজলাসেই একই ছবি। খুন, ধর্ষণ, রাজনৈতিক সংঘর্ষের মতো গুরুত্বপূর্ণ মামলার পাশাপাশি বিচারকদের শুনতে হচ্ছে ভুরি ভুরি ডিভোর্সের আবেদনের শুনানি। আইনজীবীরাও দিনের বেশিরভাগ সময় এইসব মামলা নিয়েই ব্যস্ত। আদালতের করিডোরে দাঁড়িয়ে এক আইনজীবী এক যুবতীকে পই পই করে শেখাচ্ছেন, যাতে তোমাদের ডিভোর্স না হয়, তারজন্য সাহেব বকাবকি করবেন। চুপচাপ শুনে নিও। উচ্চবাচ্য করো না। আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, শুধুমাত্র ডিসেম্বর মাসেই মিউচুয়াল ডিভোর্সের আবেদন জমা পড়েছে ৭৫টি। ২০২৫ সাল জুড়ে আদালতে মিউচুয়াল ডিভোর্সের আবেদন হয়েছে ৮৭১টি। পরিসংখ্যান যথেষ্ট উদ্বেগ জনক বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।
টেস্ট ম্যাচিং আসলে কি? আাইনজীবী মহলের ব্যাখ্যা, আইনের নজরে মিউচুয়াল ডিভোর্সের ছ’টি কারণ রয়েছে। তার মধ্যে একটি হল টেস্ট ম্যাচিং না হওয়া। এর অর্থ হল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা হচ্ছে না। ডিভোর্স দেওয়ার ক্ষেত্রে একেই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছেন নব প্রজন্মের যুগলরা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যুগলরা সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য কোনও মাধ্যমে পরিচিত হয়ে প্রেমে জড়িয়ে পড়ছেন। তারপর পরিবারের সম্মতিতে বা অমতে নিজেরা বিয়ে করছেন।
কিছুদিন পরেই তাঁদের কাছে বিয়ে নামক সামাজিক বন্ধনটা বোঝা মনে হচ্ছে। এরপরই ডিভোর্সের রাস্তা খুঁজছেন। দুর্গাপুরে আইনজীবী মহলের একাংশের দাবি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই বিবাহ বন্ধন থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন অনেকেই। আইন অনুযায়ী, বিয়ের এক বছর আগে ডিভোর্সের আবেদন করা যায় না। সময়সীমা অতিক্রান্ত হতেই আদালতের কড়া নাড়ছেন দম্পতিরা। অনেকের আবার বিয়ে ভাঙতে এতই তাড়া যে, বিয়ের তারিখ খাতায়-কলমে পিছিয়ে দিচ্ছেন। ফলে এক বছরের আগেও আবেদন জমা করছেন।
দুর্গাপুর এখন বেশ আধুনিক শহর। ডিভোর্সের প্রধান কারণ হিসেবে সামনে আসছে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ককে বৈধতা দেওয়া। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদালতের রায়কে হাতিয়ার করে অনেকে প্রকাশ্যেই অন্যজনের সঙ্গে সম্পর্কে লিপ্ত হচ্ছেন। কম বয়সী যুবক-যুবতীদের এমন উদাহরণ যেমন প্রচুর, তেমনই চল্লিশের কোঠা পার করা দম্পতিরাও পিছিয়ে নেই। ছেলে-মেয়ে, সংসার ছেড়ে নতুন সম্পর্কে জড়াচ্ছেন। ডিভোর্স দিচ্ছেন। অনেকে নতুন সম্পর্ককে বৈধতা দিতে বিয়ে করছেন। কেউ আবার লিভ ইনে থাকছেন। মাঝখান থেকে ভুক্তভোগী হচ্ছে পরিবারের সন্তানরা। কেউ সৎ মা, সৎ বাবা কাছে নিপীড়িত হচ্ছে। কারও আবার দিন কাটছে দাদু-ঠাকুমার কাছে।
পশ্চিম বর্ধমান জেলা পরিষদের শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ তথা আইনজীবী বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘ডিভোর্স এখন সামাজিক ব্যাধির রূপ নিয়েছে। দুর্গাপুর কোর্টের আইনজীবী হিসেবে চোখের সামনে দেখছি ক্ষুদ্রতম কারণেও অনেকের সম্পর্ক ভেঙে দিচ্ছেন।’