সংবাদদাতা, কাটোয়া: নামী ব্র্যান্ডের দামি মোবাইল আর ঝা চকচকে বাইক— এই দুইয়ের নেশায় পড়াশোনায় জলাঞ্জলি দিয়ে কেরলে পাড়ি জমাচ্ছে কাটোয়ার বহু কিশোর। কেরলে গিয়ে একটা কাজ জোটাতে পারলেই কাঁচা টাকা আসবে হাতে। সেই টাকায় হবে ইচ্ছেপূরণ। দামি মোবাইল আর ঝকঝকে বাইক। স্কুলের শিক্ষকরাই এই দাবি করছেন। স্কুল ছেড়ে কেরলে গিয়ে ফোন নম্বরও পাল্টে ফেলছে কিশোররা। যাতে স্কুল থেকে যোগাযোগ করতে না পারে। পড়ুয়াদের এই আচরণে উদ্বিগ্ন শিক্ষকমহল।
কাটোয়া মহকুমার কেতুগ্রাম, মঙ্গলকোট সহ পাঁচ ব্লকেই স্কুলে বাড়ছে ড্রপ আউটের সংখ্যা। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে আর স্কুলমুখো হচ্ছে না বহু ছাত্র। তারা কাজের সন্ধানে চলে যাচ্ছে কেরলে। অনেকে একাদশের গণ্ডি টপকে পাড়ি দিচ্ছে ভিনরাজ্যে। নির্মাণ শ্রমিকের কাজে ভিন রাজ্যে প্রতিদিন এক হাজার টাকা পারিশ্রমিক। তাছাড়া রয়েছে ওভারটাইম। ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সের কিশোরদের কাছে টাকার অঙ্কটা নেহাত ফ্যালনা হয়। মাসে ৩০ হাজার টাকা রোজগার। কয়েক মাস কাজ করলেই কিনে ফেলা যায় কাঙ্খিত বাইক বা মোবাইল। হাতে মোবাইল পেলেই পাবজির নেশায় বুঁদ হয়ে যাচ্ছে। মাথার চুল লাল করে বাইকে গতি তুলে ছুটে বেড়াচ্ছে। অদ্ভুত ব্যাপার হল, অভিভাবকরাও সেভাবে বাধা দিচ্ছেন না। স্কুল থেকে পড়ুয়ার খোঁজ করলে সে কোথায় আছে তা জানাচ্ছেন না অভিভাবকরা। দু’-একজন ফিরে এসে স্কুলে ভর্তি হলেও ফের ড্রপ আউট হয়ে যাচ্ছে।
কেতুগ্রামের আনখোনা উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা ১৯০০। তার মধ্যে ড্রপ আউট ৪০-৫০ জন। নবম থেকে একাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের মধ্যেই এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রধান শিক্ষক অরিজিৎ ভট্টাচার্য বলেন, কাঁচা টাকার লোভ তারা ছাড়তে পারছে না। আমরা খোঁজ করতে বাড়িতে গেলে অভিভাবকরাই বলছেন, আমরা কেরলে পাঠিয়েছি। আর লেখাপড়া শিখবে না। কেতুগ্রামের মৌগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়েরও একই অবস্থা। সেখানে ৩০-৩৩ জন পড়ুয়া আর স্কুলমুখো হচ্ছে না। প্রধান শিক্ষক পলাশ রায় বলছেন, এরা দামি বাইক ও মোবাইল কেনার নেশায় কেরলে পাড়ি দিচ্ছে। সেখানে নির্মাণ শ্রমিকের কাজে মোটা আয়। আমরা যাতে যোগাযোগ করতে না পারি সে জন্য মোবাইলের নম্বরও বদলে ফেলছে। অভিভাবকদের সচেতন করতে আমরা স্কুলে বৈঠক ডেকেছিলাম। কিন্তু মাত্র দু’ জন অভিভাবক সেই বৈঠকে হাজির ছিলেন। এসব ছেলেরা কেরলে যাওয়ার আরেকটা কারণ বাড়িতে অভাব।
কাটোয়ার নামী স্কুল কাশীরাম দাস বিদ্যায়তনেও প্রায় ১৫-২০ জন পড়ুয়া আর স্কুলে আসছে না। স্কুলের প্রধান শিক্ষক কমলাকান্ত দাস বলেন, মোবাইল শেষ করে দিচ্ছে এসব পড়ুয়াদের জীবন। আমরা বোঝাচ্ছি, কিন্তু তাতে কাজ হচ্ছে না।
মোবাইলে রিলসের নেশাও পড়ুয়াদের মধ্যে চেপে বসে আছে। কাটোয়ায় কয়েকদিন আগে মোবাইলে গেম খেলতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল নবম শ্রেণির এক পড়ুয়া। কেতুগ্রামের নতুনগ্রামের এক পড়ুয়া বলে, আমি নবম শ্রেণিতে স্কুলে রেজিষ্ট্রেশন করিয়ে রেখেছি। এখন কেরলে থাকি। পরীক্ষার সময় এসে পরীক্ষা দিয়ে যাব। এছাড়া মঙ্গলকোটের যজ্ঞেশ্বরডিহি স্কুলে ৮ জন পড়ুয়া কেরলে পাড়ি দিয়েছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক অনুপ মাইতি বলেন, আমরা প্রতিটি ছাত্রকে বোঝাচ্ছি। তাতেও অভিভাবকরা সচেতন হচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে আবার পড়ুয়াদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না অভিভাবকরা।