চিরবাসা, ভূজবাসা পেরিয়ে তপোবন। শিবলিঙ্গ পাহাড় শৃঙ্গ সেখান থেকে স্বমহিমায় দৃশ্যমান। ঠিন যেন জটাজুটধারী দেবাদিদেব মহাদেব ধ্যানে বসেছেন।
চিরবাসা, ভূজবাসা পেরিয়ে তপোবন। শিবলিঙ্গ পাহাড় শৃঙ্গ সেখান থেকে স্বমহিমায় দৃশ্যমান। ঠিন যেন জটাজুটধারী দেবাদিদেব মহাদেব ধ্যানে বসেছেন।
হিমালয়ের দুর্নিবার আকর্ষণে আবার হিমালয়ের পথে পা বাড়াই। এবার লক্ষ্য গোমুখ পেরিয়ে তপোবন। একেবারে শিবলিঙ্গ শৃঙ্গের পায়ের তলায়। ঋষিকেশ থেকে সকালে রওনা দিয়ে উত্তরকাশী পেরিয়ে ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম মানেরিতে একরাত কাটিয়ে গঙ্গোত্রী পৌঁছলাম পরের দিন দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ। বিরাট গিরিশ্রেণির মাঝে অপূর্ব স্থাপত্যশৈলী সম্বলিত মা গঙ্গার মন্দির, একেবারে গঙ্গার তীরে। গঙ্গা এখানে ক্ষীণকায়া, স্রোতস্বিনী পাহাড়ি নির্ঝরিণী। তখন মে মাস। গঙ্গোত্রীর উচ্চতা প্রায় দশ হাজার ফুটের আশপাশে। অধিক উচ্চতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার জন্য দু’দিন থাকলাম এখানেই। গঙ্গামন্দির, সূর্যকুণ্ড, পাণ্ডব গুহা এসব দেখেই কেটে গেল সময়।
সকাল ৭টায় গঙ্গোত্রী থেকে যাত্রা শুরু হল। গঙ্গামন্দিরে প্রণাম সেরে সামনের রাস্তা ধরে আস্তে আস্তে এগিয়ে চলেছি। দলে আমরা ৪জন। তিন জনেরই বয়স ষাটের উপর। আরেকজনের বছর পঁচিশ। সঙ্গে গাইড বিজয় পাল সিং রাওয়াত। অল্পবয়সি ছেলে পল্লব গতকাল থেকে আমাদের সঙ্গ নিয়েছে। সে সংসারধর্ম ত্যাগ করে সন্ন্যাস জীবনের জন্য নিজেকে তৈরি করছে।
মাইলখানেক দূরে ‘গঙ্গোত্রী জাতীয় অরণ্যের’ চেকপোস্টে অনুমতিপত্র দেখিয়ে আবার হাঁটা শুরু হল। আজ আমাদের লক্ষ্য ১৪-১৫ কিলোমিটার দূরে ভূজবাসা। বাঁদিকে পাহাড়ের গা ধরে চড়াই উতরাই পথ। ডান দিকে স্রোতস্বিনী গঙ্গা। গোটা পথে পাইন দেবদারুর ঘন জঙ্গল। ছোট ছোট পাখির কলতান পথের সঙ্গী। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সরু রাস্তা ধরে আস্তে আস্তে এগিয়ে চলেছি। পথ এবার নেমে গিয়েছে একেবারে নদীর তীর বরাবর। উতরাই পথ দেখলেই ভয় হয়। আবার তো এতটাই উঠতে হবে! পাথরের উপর বসে ক্ষণিক বিশ্রাম নিই সকলে।
আবার হাঁটা শুরু হয়। একসময় পৌঁছেও যাই সমতল জায়গায়। রাওয়াতজি জানান, এই হল চিরবাসা। তার মানে আমরা ৯ কিমি হেঁটে ফেলেছি। সবুজের জগৎ এইখানেই শেষ। এবার শুরু হল ধূসর পাহাড়ের রাস্তা। চারিদিকে কঠিন কঠোর পাহাড়, মাথায় বরফের মুকুট। সামনেই সুস্পষ্ট সুদর্শন পর্বত শৃঙ্গ। মাঝে মাঝেই পথ একদম নেমে এসেছে নদীর তীর বরাবর, সেখান থেকে আবার চড়াই ভাঙা। অবশেষে নজরে আসে মন্দিরের চূড়া। ওই তো লালবাবার আশ্রম। তার মানে আমরা ভূজবাসাতে পৌঁছে যাব কিছুক্ষণেই। দ্বিগুণ উৎসাহে পা চালিয়ে নেমে আসি ভূজবাসার প্রান্তরে। সরকারি অতিথিশালা, লালবাবা ও রামবাবার আশ্রমের মতো জায়গা থাকায় রাত্রিবাসের জায়গার অভাব হয় না।
একটা বড় পাথরের উপর বসে আছি। সামনের আকাশজুড়ে ভাগীরথী পর্বত শৃঙ্গ। পড়ন্ত বিকেলে ভাগীরথীর উপর আলো মেঘের লুকোচুরি খেলার মধ্যেই ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসে ভূজবাসার প্রান্তরে। ভূজবাসায় বিদ্যুৎ নেই। সৌর আলোয় রাতের খাওয়া সেরেই ঢুকে পড়ি লেপের তলায়।
পরদিন খুব সকালে লাইনে দাঁড়াতে হল নদী পেরনোর জন্য। ধসের কারণে গোমুখ তপোবন যাওয়ার রাস্তা সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। পুরনো রাস্তা বিলুপ্তপ্রায়। তাই ভূজবাসাতেই ভাগীরথীর উপর প্রথম ফেরিঘাট চালু করা হয়েছে মোটা লোহার তারের উপর দিয়ে ট্রলির সাহায্যে। সে এক বড় ঝক্কির কাজ। শুধু তো নিজে পেরনো নয়, এই উচ্চতায় নিজে পেরনোর পর পরবর্তী ৪জন সহযাত্রীকেও দড়ি টেনে পার করাতে হবে। কষ্টকর হলেও সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। ট্রলি পেরিয়ে এসে পড়লাম বোল্ডারের রাজত্বে। রাস্তা বলে কিছু নেই। আগের যাত্রীদের রেখে যাওয়া নিশানা ধরে এগিয়ে চলা। নীচে বাঁদিকে গোমুখ। গঙ্গার উৎসস্থল। তবে আগের মতো গোমুখের সেই আকৃতি নেই। হঠাৎ উপর দিকে তাকিয়ে দেখি নীল আকাশ ভেদ করে ঝরঝর ধারায় নেমে আসছে এক স্বচ্ছ জলের রাশি। গাইড বলে আকাশগঙ্গা। আর দেরি নেই, একটু উপরে উঠলেই তপোবন। পা চালিয়ে এক সমতল উপত্যকার মাঝে এসে দাঁড়াই। ততক্ষণে আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করেছে। ‘শিবলিঙ্গ’ চলে যাচ্ছে কালো মেঘের আড়ালে।
তপোবনে মৌনীবাবার আশ্রমে থাকব এ আমার বহুদিনের স্বপ্ন। স্বপ্ন সত্যি হল যখন দেখি গাইড বিজয় সিং সকলকে নিয়ে মৌনীবাবার আশ্রমেই উঠলেন। আকাশগঙ্গার সরু ধারা পেরিয়ে একটা টিলার মতো উঁচু জায়গায় মৌনীবাবার আশ্রম। স্মিতহাস্যে গরম চা হাতে ধরিয়ে দিয়ে সাদর আমন্ত্রণ জানালেন মৌনীবাবা নিজেই। বিকেল থেকেই শুরু হয়েছে তুষারপাত। কালো মেঘে চতুর্দিক ঢাকা পড়েছে। বাইরে কিছুই প্রায় দেখা যায় না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তপোবন ঢাকা পড়ল নরম বরফের চাদরে। কনকনে ঠান্ডা সঙ্গে দমকা হাওয়া যেন শরীরে ছুঁচ ফোটাচ্ছে। মৌনীবাবা নিজে হাতে সবাইকে খাবার পরিবেশন করছেন। পল্লব ব্রহ্মচারীও হাত লাগিয়েছে। রাত ক’টা হবে জানি না। আপাদমস্তক কম্বলে ঢেকে বেরিয়ে এসেছি ঘর থেকে। তুষারপাত বন্ধ হয়েছে। আকাশ ঝকঝকে। আজ বুদ্ধ পূর্ণিমা। চাঁদের আলোয় শিবলিঙ্গের রূপ দেখব। পরম মুগ্ধতায় উপভোগ করি সেই স্বর্গীয় সৌন্দর্য। অনুভব করি সর্বত্র বিরাজমান সর্বশক্তিমানের উপস্থিতি।
ভোরে কোলাহলে ঘুম ভেঙে দেখি, ঝকঝকে আকাশ। চারিদিকের সমস্ত পর্বত শৃঙ্গের মাথায় দিনের প্রথম আলো পৌঁছে গিয়েছে। মাথাটা চতুর্দিকে ঘুরিয়ে তুষার শিখরগুলোর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করি। ভাগীরথী ১,২,৩; শিবলিঙ্গ, মেরু পর্বত, ভৃগুপন্থ, চতুরঙ্গী, সুদর্শন, রক্তবর্ণ আরও কত কী! ততক্ষণে আমার একদম সামনে শিবলিঙ্গের উপর সূর্যের আলো পড়ে ঝলমল করছে। রং বদলাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। সোনালি, হলুদ, গোলাপি থেকে একদম ধবধবে সাদা। শুভ্র, জটাজুট, যোগীশ্বর ‘শিবলিঙ্গ’ ধ্যানমগ্ন দেবাদিদেব মহাদেব যেন! নীচে বয়ে যাচ্ছে আকাশগঙ্গা। নদীর উপর বরফের চাদর ভাঙছে মর্মর শব্দে। বরফ ভেঙে বোতলে ভর্তি করি আকাশগঙ্গার জল।
মৌনীবাবাকে প্রণাম করেই রওনা দেব। দেখি মৌনীবাবা সহাস্যে দাঁড়িয়ে, হাতে গরম ছোলার ঘুগনি নিয়ে। রাস্তায় যে কিছুই জুটবে না!
শিবলিঙ্গ অনেকটাই পিছনে ফেলে এসেছি। সবাই যেন মৌনী হয়ে গিয়েছে। হঠাৎই পল্লবের গলা শুনে ঘুরে দেখি, বড় পাথরের উপর বসে গান ধরেছে—
‘আর কতকাল এ সংসারে
যাই চলো সেই নগরে
যেথা দিবা নিশি পূর্ণ শশী
আনন্দে বিরাজ করে...।’
কীভাবে যাবেন: গঙ্গোত্রী পর্যন্ত গাড়ির রাস্তা। তারপর দু’দিনের হাঁটা পথ। মে-জুন অথবা সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত যাওয়া ভালো। রাস্তা দুর্গম তবে অগম্য নয়।
রমেন ভট্ট
ছবি: লেখক