‘আর কত দূর?’
‘আর কত দূর?’
‘আধ ঘণ্টা মতো চলুন, পৌঁছে যাবেন’।
সালোয়ার কামিজ পরা মহিলার মুখ দেখে সিনিয়র সিটিজেন বলেই মনে হল। তিনি ফিরতি পথের পথিক। আঙুল তুলে দেখালেন কিছুটা দূরে থাকা এক প্রবীণকে। ‘ওর বয়স ৭৮। ও পেরেছে মানে আপনারাও পারবেন,’ বললেন হাসিমুখে। ইতিমধ্যে কাছে এসে পড়েছেন প্রবীণ। শর্টস এবং গেঞ্জি পরনে। ক্লান্ত চোখে একমুখ হাসি নিয়ে তাকালেন। বললেন, ‘আপনারা পারবেন না, পেরে গিয়েছেন’।
ফের একই প্রশ্ন করলাম এক দক্ষিণী ভদ্রলোককে। তিনিও ফিরছেন। তাঁর সরাসরি উত্তর, ‘কাফের পর থেকে যে রাস্তাটা রয়েছে, অ্যাথলিট হলে তবেই যেতে পারবেন।’ খানিক হতাশা, খানিক বিরক্তি নিয়ে ঘামতে ঘামতে নামতে লাগলেন তিনি।
দমে গেলাম? হ্যাঁ, দমে গেলাম। কিন্তু থেমে গেলাম না। সকাল ন’টায় হাঁটতে শুরু করেছি। টাইগার নেস্টে পৌঁছলাম দুপুর দেড়টায়। টানা সাড়ে চার ঘণ্টা পাহাড়ি পথে হেঁটে যেখানে পৌঁছলাম আক্ষরিক অর্থেই তা ‘বাঘের বাসা’!
গল্পটা শুরু থেকেই শুরু করা যাক।
ডেস্টিনেশন ভুটান। দিন সাতেকের সফর। শেষের আগের দিন গন্তব্য টাইগার নেস্ট মনাস্ট্রি। যা তাকসাং গুম্ফা নামেও পরিচিত। দলের সকলেই মধ্যবয়সি। জিম, ট্রিম, স্লিম নয়। বরং মধ্যবিত্ত মধ্যপ্রদেশ। ট্রেকিংয়ের জন্য অনুপযুক্ত শরীর। তবে তাকসাং গুম্ফা শেখাল, মনের জোরে অনেক দূর যাওয়া যায়। কখনো পূরণ হয়ে যায় লক্ষ্যও।
ভুটান সফরে গাইড বাধ্যতামূলক। এই বাঙালি দলের গাইড ২৪ বছরের এক তিব্বতি তরুণ। দীপেন। বাঙালিদের মতো নাম জেনে প্রথম থেকেই সে বড়ো আপন হয়ে গিয়েছিল। ছটফটে, হুল্লোড়ে দীপেন সেদিন সকাল থেকেই খানিক শান্ত। আমরা না বুঝলেও সে বুঝেছিল, তার সামনে কত বড়ো চ্যালেঞ্জ! কারণ সে-ই একমাত্র জানত, মনাস্ট্রিতে পৌঁছনোর রাস্তা কতটা কঠিন। এই দলটিকে সেখানে নিয়ে যেতে হলে প্রয়োজন অসীম ধৈর্য। বিরাট সাহস। আর সারাক্ষণ ‘আপনি পারবেন’— এটা বলে যাওয়ার দক্ষতা।
পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত গাড়ি পৌঁছে দিল সকাল সাড়ে আটটায়। এক বয়স্কা বেশ কয়েকটি লাঠি নিয়ে বসেছেন। তাঁর কাছ থেকে ১০০ টাকার বিনিময়ে একটি করে লাঠি ভাড়া নেওয়া হল। টিকিট মাথাপিছু ১০০০ টাকা। আপনি যদি মাঝপথ থেকে বা তারও আগে থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হন, তাও ওই একই টাকার টিকিট কাটতে হবে। মাউন্টেন সিকনেসের নানা লক্ষণ নিয়ে দীপেন সতর্ক করে দিয়েছে। যে হাতে লাঠি ধরা থাকবে, তার অপর হাত হঠাৎ ঝিনঝিন করলে, অসাড় হয়ে এলে সেখান থেকেই নামতে হবে। মাথাব্যথা, বমি ভাব ইত্যাদি মনে হলে, অগ্রাহ্য না করে তখনই জানাতে হবে গাইডকে। কোনো টার্গেট ছাড়াই এবার যাত্রা শুরু হবে। কাঁধের ছোটো ব্যাগে জল, বিস্কুট নিয়ে রওনা হলাম। ঘড়িতে সকাল ন’টা। ছোট্টো একটা নালা পেরিয়ে গিয়ে সমতল জমি। কয়েকটি ঘোড়া ইতিউতি ঘাস খাচ্ছে। সহিসরাও রয়েছেন। এই ঘোড়াও ভাড়া নেওয়া যায়। তবে ঘোড়ার পিঠে পৌঁছনো যাবে যাত্রাপথের মাঝ বরাবর পর্যন্ত। বাকিটা হাঁটা ছাড়া গতি নেই। সেই জমি পেরিয়ে শুরু হল অনন্ত হাঁটা।
প্রথমেই হাঁটু বিদ্রোহ করল। তাকে খানিক দমিয়ে রাখতে না রাখতেই বায়না শুরু করল গোড়ালি। চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখিয়ে মনকে তখন অনবরত ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। প্রতিটা বাঁক নতুন সারপ্রাইজ নিয়ে তৈরি। কোথাও রডোডেনড্রনের লাল সেলাম। কোথাও সবুজের বাহারি শেড। কোথাও উঁকি দিচ্ছে টাইগার নেস্ট গুম্ফা। এক পাঞ্জাবি পরিবারের সঙ্গে আলাপ হল। বছর পাঁচেকের কন্যা ধুলো ঘাঁটছে অনবরত। তার মা জানালেন, ধুলো ঘাঁটতে দিতে হবে, এই শর্তেই সেই কন্যে পাহাড় চড়তে রাজি হয়েছে। তিন বর্ষীয়ান বিদেশি ট্যুরিস্ট চলেছেন। নানা দেশ ভ্রমণই তাঁদের নেশা। সেই তালিকার সাত নম্বর দেশ ভুটানে এসে মুগ্ধ তাঁরা। হঠাৎই বাঁক পেরতে দেখি একাই নেমে আসছেন বছর পঞ্চাশের এক পুরুষ। ঘড়িতে তখন দশটা। আপনি পুরোটা গিয়েছিলেন! প্রশ্ন করতেই সহজ হেসে উত্তর দিলেন, ভোর পাঁচটার সময় শুরু করেছিলাম। পুরোটা গিয়েছি। এখন নামছি। আমরা পারব? আবার মৃদু আশ্বাসের হাসি, ‘সময় নিয়ে উঠুন। দরকার হলে পথের ধারে বসে পড়বেন। জল খান। জার্নি এনজয় করুন। পারবেন।’
এই পজিটিভিটি টাইগার নেস্টের জার্নির মূল অনুপ্রেরণা। বেশিরভাগ মানুষই উৎসাহ দিচ্ছেন। হয়তো তিন ঘণ্টার পথ বাকি। কিন্তু মনোবল যাতে ভেঙে না যায়, তাই তাঁরা বলছেন, আর আধঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাবেন। বিশ্রামের জন্য এই পথের মাঝামাঝি রয়েছে তাকসাং কাফে। ১২টা নাগাদ সেখানে পৌঁছে চা, কফিতে চুমুক দিলাম। সোজাসুজি তাকালেই মনাস্ট্রি। দেখলাম চোখ ভরে। কিন্তু সেখানে পৌঁছতে যে এখনও অনেকটা পথ বাকি, তা তখনও বুঝতে পারিনি। বহু ট্যুরিস্ট কাফে থেকেই ফেরার পথ ধরেন। শারীরিক ধকল নিয়ে না এগনোই ভালো, এই সতর্কবার্তা মনে রাখতে হবে সকলকেই।
কাফের বিরতিতে বেশি সময় ব্যয় করলে পরের পথটুকু আর এগনো যাবে না। তাই ২০ মিনিটের মধ্যেই ফের হাঁটা শুরু। খানিক এগতেই শুরু হল অনন্ত সিঁড়ি! একবার ওঠা, তো একবার নামা। পাহাড়ি পথে এই ওঠা-নামা সত্যিই কষ্টকর। মনভোলানো প্রকৃতি যদিও আশ্বাসবাণী শোনাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে।
আর কত দূর? এবার উত্তর দিল দীপেন, ‘ম্যামজি, ব্রিজটা পেরলেই মনাস্ট্রির গেট।’ ছোট্টো ব্রিজ গাঁথা রয়েছে পাহাড়ি ঝরনাকে ব্যাকড্রপে রেখে। তা পেরিয়ে শেষ ল্যাপের হাঁটা শুরু। এক, দুই, তিন... সিঁড়ির ধাপ গুনতে শুরু করলাম। ক্লান্তিতে বারবার গুলিয়ে গেল সংখ্যা। কানে আসতে লাগল অনেক মানুষের কথোপকথন। উচ্ছল পাহাড়ি ঝরনার ক্যাকোফোনি আবহ সংগীতের আমেজ তৈরি করল। তারপর সামনে এল বহু প্রতীক্ষিত তাকসাং মনাস্ট্রির মূল দরজা। ওখানেই বসে পড়েছিলাম। এই পথটা পেরিয়ে আসতে পেরেছি, এটা বিশ্বাস করার সময় নিচ্ছিলাম। মিনিট পাঁচেক যেন চারপাশটা একেবারে ফাঁকা মনে হচ্ছিল। নিজের সঙ্গে নিজেরই মুখোমুখি দেখা হলে যেমন হয় আরকি!
দুপুর দেড়টা। ভিতরে ঢুকে জমা রাখতে হল ব্যাগ, মোবাইল। জুতো খুলে রাখতে হল। লোককথা অনুযায়ী, অষ্টম শতাব্দীতে গুরু পদ্মসম্ভব তিব্বত থেকে উড়ন্ত বাঘের পিঠে চড়ে এই পাহাড়ের গুহায় এসেছিলেন। এখানে তিনি ধ্যান করেছিলেন। বৌদ্ধ ধর্মের বজ্রযান ধারাকে ভুটানে পরিচিত করে তোলেন পদ্মসম্ভব। স্থানীয় ভাষায় ‘তাকৎসাং’ শব্দের অর্থ ‘বাঘের বাসা’। ভুটানের পারো উপত্যকা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই মনাস্ট্রি। যা পারো ভ্যালি থেকে ৩০০০ ফুট উঁচুতে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৩,১২০ মিটার (১০,২৩২ ফুট)। ইতিহাস অনুসন্ধান করলে জানা যায়, ১৬৯২ খ্রিস্টাব্দে এই মনাস্ট্রি কমপ্লেক্স নির্মাণ করেন চতুর্থ ড্রুক ডেসি তেনজিং রাবগে। ১৯৯৮ সালের ১৯ এপ্রিল মনাস্ট্রির মূল বাড়িতে আগুন লেগে বহু মূল্যবান এবং দুষ্প্রাপ্য হাতে আঁকা ছবি, মূর্তি নষ্ট হয়ে যায়। এক বৌদ্ধ লামার মৃত্যুও হয়। ভুটানের চতুর্থ রাজা জিগমি সিংগে ওয়াংচুক এবং ভুটান সরকারের তত্ত্বাবধানে ২০০৫-এ মনাস্ট্রির পুনরুদ্ধারের কাজ সম্পূর্ণ হয়। এটিকে সম্পূর্ণ আগের রূপ ফিরিয়ে দেওয়া হয়। মনাস্ট্রির ভিতরে প্রায় পাঁচটি ভিন্ন কক্ষ রয়েছে। প্রত্যেকটি কক্ষে রয়েছে বুদ্ধ মূর্তি সহ আরাধ্য গুরুরা। রাজা, রানি সহ রাজপরিবারের সদস্যদের ছবিও রয়েছে সেখানে। প্রণামী দিতে পারেন। প্রদীপ জ্বালাতে পারেন। কিছুক্ষণ নিশ্চিন্তে বসে ধ্যান করতে পারেন। এছাড়াও বৌদ্ধ লামারা রয়েছেন। যে কোনো সমস্যায় তাঁরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
ঠিক বাইরে এসে দাঁড়িয়ে দেখলাম, উলটোদিকের পাহাড়ে তখন সূর্য আভা ছড়াচ্ছে। যে সিঁড়ির ধাপ ধরে উঠে এলাম, তাও দেখতে পাচ্ছি। এখনও আসছেন অনেকে। তাঁদের লিলিপুটের মতো দেখাচ্ছে। মাঝে অতলান্ত খাদ। এই এতটা পথ ফের পাড়ি দিতে হবে। সেই চিন্তা তখন মনে আসেনি। সামনে পাহাড়চূড়া, ঝরনা, খাদের ল্যান্ডস্কেপ আসলে বুঝিয়ে দিচ্ছিল, মনের জোরে অসাধ্য সাধন সত্যিই করা যায়।
দুপুর আড়াইটে। দীপেন তাড়া দিল। এবার নামতে হবে। কতটা সময় লাগবে জানি না। পথে অন্ধকার হয়ে গেলে সমস্যা বাড়বে। জঙ্গুলে পাহাড়ি পথে সূর্যের আলো থাকতে থাকতে নেমে যাওয়ার চেষ্টা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। ফেরার পথ ধরলাম। ঝিরঝিরে বৃষ্টি নামল হঠাৎই। রাস্তা পিছল হল, কঠিনও। যদিও খুব বেশিক্ষণ বৃষ্টির ভোগান্তি হয়নি। জুনের প্রথম সপ্তাহে বৃষ্টি প্রত্যাশিতই ছিল। মার্চ থেকে মে এবং সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় ঘোরার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। চারটে নাগাদ ফের সেই ক্যাফেতে পৌঁছলাম। হালকা খাবার খেয়ে আবার হাঁটা শুরু। এবার যাঁদের সঙ্গেই দেখা হচ্ছে, তাঁরা এত বেশি গল্প করছেন, হাঁটার গতি কমে আসছে। গল্পের নায়ক টাইগার মনাস্ট্রি। আর নায়িকা এই হাঁটার অভিজ্ঞতা। বেস-এ পৌঁছলাম সন্ধে ছ’টায়। দূরে দেখা যাচ্ছে টাইগার মনাস্ট্রি। শেষ বিকেলের আলোয় স্নান করেছে সে। মাথার উপর জমেছে একফালি কালো মেঘ। ধূসর পাহাড়ের সিলুয়েটে সেই মেঘ যেন হাতে আঁকা ছবিটা সম্পূর্ণ করেছে।
হ্যাঁ, ‘ছবি’ই।
নীচ থেকে যেটা ছবি মনে হচ্ছে, সেখানে কয়েক ঘণ্টা আগেই গিয়েছিলাম! জীবন কখনো কখনো এমন অবিশ্বাস্য ম্যাজিক দেখায়। যা গল্প হলেও সত্যি।
স্বরলিপি ভট্টাচার্য