Bartaman Logo
১৪ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

জগৎকল্যাণে স্বামী বিবেকানন্দের দুর্গাপুজোর ১২৫তম বর্ষে পদার্পণ

মাদুর্গা নৌকো করে মঠে অসছেন—স্বপ্নে দেখে নরেনকে বললেন স্বামী ব্রহ্মানন্দ। ক’দিন আগে স্বামীজিও দেখেছেন মঠে বেলগাছতলায় মাদুর্গাকে। শ্রীরামকৃষ্ণের দুই শিষ্য মঠে দুর্গাপূজার সূচনা করার জন্য মায়ের অনুমতি চাইলেন।

জগৎকল্যাণে স্বামী বিবেকানন্দের  দুর্গাপুজোর ১২৫তম বর্ষে পদার্পণ
  • ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

অতূণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা; মাদুর্গা নৌকো করে মঠে অসছেন—স্বপ্নে দেখে নরেনকে বললেন স্বামী ব্রহ্মানন্দ। ক’দিন আগে স্বামীজিও দেখেছেন মঠে বেলগাছতলায় মাদুর্গাকে। শ্রীরামকৃষ্ণের দুই শিষ্য মঠে দুর্গাপূজার সূচনা করার জন্য মায়ের অনুমতি চাইলেন। শ্রীমা সারদার অনুমতিক্রমে পুজো শুরু হল বেলুড় মঠে। ১৯০১ সালে খুব অল্প সময়ের মধ্যে চালু হাওয়া দুর্গাপুজো আজ ১২৫তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। স্বামীজির ইচ্ছায় এবং বিবেকানন্দ ও সারদা মায়ের উপস্থিতিতে খুব অল্পদিনের ব্যবস্থাপনায় সেই পুজো হয়েছিল। আজ তা আকারে আয়তনে বিশাল।

Advertisement

কয়েকবছর আগে গড়ে ওঠা রামকৃষ্ণ মঠের দুর্গাপূজায় ভক্ত থেকে তৎকালীন সমাজপতি, অনেকেই পেয়েছিলেন স্বামীজির সাদর আমন্ত্রণ। সেই রীতি মেনে আজও বেলুড় মঠ থেকে চার লক্ষাধিক নিমন্ত্রণপত্র যায়। সারাবছর ধরে পুজোর জন্য প্রয়োজনীয় মহাস্নানের নানারকম জলমাটি সংগ্রহ করা হয়। জন্মাষ্টমীর দিন কাঠামো পুজো দিয়ে সূচনা হয় দেবীর প্রতিমা তৈরি। প্রথম পুজোর প্রতিমা কুমোরটুলি থেকে আনা হয়। তবে এখন মঠেই তৈরি হয় দেবীমূর্তি। শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দিরের নাটমন্দিরে দীর্ঘদিন এই পুজো হয়েছে। তবে ভক্তদের সুবিধার্থে এই শতাব্দীর শুরু থেকে অস্থায়ী বিরাট মণ্ডপে মাদুর্গা পূজিতা হচ্ছেন। 
বৈদিক বিধি মেনে শিখা সূত্রধারী ব্রহ্মচারী এখানে পূজা করেন। এবছর স্বামী শাস্ত্রজ্ঞানন্দের নির্দেশনায় পৌরোহিত্য করবেন ব্রহ্মচারী সৌমিত্র। সূচনার দিন থেকে স্থানীয় জগন্নাথ মন্দির থেকে আনা হয় নারায়ণশিলা। পূজার ক’দিন মাদুর্গাকে আমিষ ভোগ নিবেদন করা হলেও শিব ও নারায়ণকে দেওয়া হয় নিরামিষ অন্নভোগ। বাদ যান না মহিষাসুরও। কালীঘাট মন্দিরে উৎসর্গ বলির মাংস মাকে নিবেদন করা হয় সন্ধিপূজায়। তবে দশমীতে দেবীকে নিবেদন করা হয় দই-চিঁড়ে এবং নানারকম ফল-মিষ্টি। তবে সেদিন নারায়ণ অন্নভোগ গ্রহণ করে দুপুরেই ফিরে যান নিজ মন্দিরে। 
প্রথম পুজো থেকেই স্বামীজির নির্দেশমতো আজও শ্রীমা সারদা দেবীর নামে সংকল্প করে বেলুড় মঠের পুজো হয়ে আসছে। অষ্টমীর সকালে কুমারী পুজো দর্শন করতে মঠ প্রাঙ্গণে অসংখ্য ভক্ত উপস্থিত হন। বেলুড় মঠের ম্যানেজার মহারাজ স্বামী জ্ঞানব্রতানন্দ বলছিলেন, অষ্টমীর দিন দুপুরে ৫০ হাজারেরও বেশি ভক্ত মায়ের প্রসাদ পান। সারদা সদব্রত ভবনে থাকে ভক্তদের ভোগ বিতরণের বিরাট ব্যবস্থা। রামকৃষ্ণ মঠ মিশনের বিভিন্ন শাখা কেন্দ্র থেকে আসেন কয়েকশো স্বেচ্ছাসেবক। মঠের সাধু-ব্রহ্মচারীদের সঙ্গে তাঁরা দিনরাত পরিশ্রম করেন। মায়ের পূজাকে সুন্দর করে তোলাই তাঁদের লক্ষ্য। পুজোর কয়েকদিন সন্ধ্যাবেলা শ্রীমন্দিরে ঠাকুরের আরতি শেষে মণ্ডপে দুজন সন্ন্যাসী ও পূজারি মায়ের সন্ধ্যা আরতি করে থাকেন। দশমীর দিন সন্ধ্যায় শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দিরে আরতি শেষে মণ্ডপ থেকে মাদুর্গা চলেন শ্রীমা সারদা দেবীর মন্দিরের সামনের গঙ্গার ঘাটে। ঢাক-ঢোলের শব্দে মুখরিত সেখানে মায়ের সামনে সাধু ব্রহ্মচারীরা অপূর্ব ধুনুচি নাচে মেতে উঠেন। এরপর নিরঞ্জন শেষ করে দেবীঘট দেবীদুর্গার আসনে স্থাপন করে চলে শান্তিজল গ্রহণ পর্ব। এইসময় বেলপাতায় ‘শ্রীশ্রীদুর্গা’ নাম লেখা বেলুড় মঠের এক প্রাচীন ঐতিহ্য।
শাস্ত্রমতে ও ভক্তিসহকারে দুর্গাপূজা করলে মানুষের চতুর্বর্গ লাভ হয়। তবে বেলুড় মঠের পুজো গৃহত্যাগী ব্রহ্মচারী সন্ন্যাসীদের পুজো। বেলুড় মঠের পুজোর বৈশিষ্ট্য বলতে গিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের পার্ষদ ও রামকৃষ্ণ মঠের দ্বিতীয় অধ্যক্ষ স্বামী শিবানন্দ মহারাজ বলেছিলেন, ‘‘মঠে মায়ের পুজো যেমন হয় তেমনটি আর কোথাও হয় না। এখানকার পুজো ঠিক ঠিক ভক্তির পুজো। আমাদের কোন কামনা নেই, আমরা কেবল মায়ের প্রীতির জন্য পূজা করি। আমাদের একমাত্র প্রার্থনা—‘মা তুমি প্রসন্না হয়ে আমাদের ভক্তি বিশ্বাস দাও আর সমগ্র জগতের কল্যাণ কর।’ আমাদের হল সাত্ত্বিক পুজো। শাস্ত্রে আছে—সুন্দর প্রতিমা পূজক ভক্তিমান এবং যিনি করাচ্ছেন তিনি  শুদ্ধসত্ত্ব ও নিষ্কাম হলে তবে সেই পুজোয় ভগবানের বিশেষ আবির্ভাব হয়। এখানে সবই আছে, তাই মায়ের এমন আবির্ভাব।’’ বেলুড় মঠের দুর্গাপূজার এই আকর্ষণে এই ক’দিন লক্ষ লক্ষ মানুষ উপস্থিত হন মায়ের পুজো দেখতে। স্বামী বিবেকানন্দের শুরু করে যাওয়া, জগতের কল্যাণে অনুষ্ঠিত বেলুড় মঠের  দুর্গাপূজা ঐতিহ্য আর আকর্ষণের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ