নিজস্ব প্রতিনিধি, মালদহ: দশচক্রে ভগবানও ভূত হয়ে যান। নার্সিংহোমের পাল্লায় পড়লে? মরা মানুষ ‘জ্যান্ত’ হতে খুব বেশি সময় লাগে না! মালদহের একটি নার্সিংহোমের অমানবিক কর্মকাণ্ড সামনে আসার পর ছিঃ ছিঃ পড়েছে জেলাজুড়ে। অবিলম্বে ওই নার্সিংহোমের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিয়ে জেলাজুড়ে লাগাতার অভিযানের দাবি উঠেছে।
সোমবার আনুমানিক দুপুর একটা নাগাদ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। অথচ বিকেলেও নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ পরিবারকে বলছে তাঁর অবস্থা খুব খারাপ। অবিলম্বে মালদহ মেডিক্যাল কলেজ বা অন্যত্র স্থানান্তরিত করতে হবে।
এদিকে রোগীকে দেখেই সন্দেহ হয় পরিবারের। বিকেলেই তাঁরা এক পঞ্চায়েত সদস্যের মাধ্যমে এনিয়ে অভিযোগ জানান মালদহ সদর মহকুমা শাসক পঙ্কজ তামাংয়ের কাছে। গুরুতর অনিয়মের গন্ধ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে পদক্ষেপ নেন পঙ্কজ। তাঁর নির্দেশ পাওয়া মাত্রই সোমবার বিকেলে মালদহের সুজাপুরের ওই নার্সিংহোমের উদ্দেশ্যে রওনা হয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য দপ্তরের বিশেষ নজরদারি দল। সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল সরকারি হাসপাতালের দুই চিকিত্সক ও পুলিসকে।
দলটি নার্সিংহোমে পৌঁছনোর পর প্রাথমিক খোঁজখবর নিতেই বিপদ বুঝতে পারে কর্তৃপক্ষ। নিজেদের কুকর্ম ঢাকতে সার্ভেল্যান্স টিমের সামনে এক চিকিত্সক রোগীকে সিপিআর দিতে শুরু করেন। অর্থাত্, বুকে বারবার চাপ দিয়ে হৃদযন্ত্র চালু করার চেষ্টা করছিলেন তিনি।
কিন্তু সরকারি চিকিত্সক রোগীকে দেখে নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষকে বলেন, অন্তত চারঘণ্টা আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। কারণ মৃতদেহ ততক্ষণে শক্ত হয়ে ডিকম্পোজড হতে শুরু হয়েছে। ঘটনাস্থলেই সার্ভেলান্স দলটির কাছে নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ দায়ের করে মৃতের পরিবার। প্রশাসন ও স্বাস্থ্য দপ্তর শুরু করেছে তদন্ত।
জেলা প্রশাসনের এক কর্তা জানান, প্রাথমিক তদন্তে বোঝা যাচ্ছে, ভুল চিকিৎসার কারণে রোগীর মৃত্যু হয়েছে। মৃতের পরিবার চাপ সৃষ্টি করতে পারে, এই আশঙ্কা থেকে নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ রোগী মৃত্যুর খবর গোপন করার চেষ্টা করে। নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ চাইছিল, কোনওভাবে রোগীকে রেফার করে ডিসচার্জ করে দিতে। রোগী মৃত্যুর দায় এড়াতেই নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ এই চেষ্টা করছিল। কিন্তু রোগীর পরিজনদের সামান্য সন্দেহ তাদের পরিকল্পনায় শেষপর্যন্ত জল ঢেলে দিয়েছে।
অতিরিক্ত জেলাশাসক (স্বাস্থ্য) শেখ আনসার আহমেদ বলেন, খবর পাওয়া মাত্রই আমাদের সার্ভেল্যান্স টিম নার্সিংহোম পরিদর্শন করে। দলের সদস্যরা একটি রিপোর্ট পেশ করেছেন। তার ভিত্তিতে নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষকে শুনানির জন্য ডাকা হবে। প্রয়োজনে ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্ট অ্যাক্টের অধীনে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ সুদীপ্ত ভাদুড়ি বলেন, ডিস্ট্রিক্ট সার্ভিল্যান্স টিমের সঙ্গে দু’জন চিকিৎসকও ওই নার্সিং হোমে গিয়েছিলেন। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে মৃত্যুর আসল কারণ জানা যাবে।
মঙ্গলবার দুপুরে মালদহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যুবকের মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। মর্গের বাইরে মৃত সাকিরুল ইসলামের (২৮) ভাইপো মহম্মদ ঈশা বলেন, কাকু গলব্লাডার অপারেশনের জন্য ভর্তি হয়েছিলেন। চিকিৎসক বলেছিলেন মাইক্রো সার্জারি করবেন। কিন্তু পরিবারকে না জানিয়েই ওপেন সার্জারি করা হয়। অপারেশনের সময়ই কাকুর মৃত্যু হয়। অথচ তারপরেও নার্সিংহোম থেকে রক্ত পরীক্ষা করানো হয়, ওষুধ কিনে দিতে বলে। প্রশাসনের লোক গেলে কাকুকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। এদিকে কয়েকবার চেষ্টা করেও নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষের কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মৃত সাকিরুল ইসলাম।