জগতে যতক্ষণ আছি, বিপদ-আপদ ও রিপুর তাড়না হতে রেহাই না মেলাই সম্ভব। জবের গ্রন্থে (বাইবেলের কোন অধ্যায়) আছে ‘মানুষের জীবনটাই প্রলোভনে ভরা।’ সুতরাং প্রত্যেকেরই নিজ নিজ রিপু সম্বন্ধে সতর্ক ও প্রার্থনাকালে সেবিষয়ে অবহিত থাকা উচিত। তার রিপু যেন তাকে প্রতারিত করার কোনও ছিদ্র না পায়। শয়তানের চোখে ঘুম নাই, সদাই সন্ধানে আছে কাকে গ্রাস করবে কখন।
কখনও কোন প্রলোভনে পড়তে হয়নি এমন পুণ্যাত্মা কি এমন নিখুঁত মানুষ দুনিয়ায় নাই। কাজেই আমরাও পুরোপুরি ওর হাত না এড়াতে পারি। সে যাই হোক, বড় রকম প্রলোভনে পা দিয়ে দুর্ভোগ ভুগতে হলেও ওতে অনেক সময় প্রকৃতই কল্যাণ হয় মানুষের। কারণ ওতে মানুষের অভিমান দূর হয়, মনের ময়লা কাটে, কঠোর শিক্ষা মেলে। সাধুসন্তরা সকলেই নানা দুর্বিপাক ও রিপুর তাড়না সয়েছেন, উপকৃত হয়েছেন তাতে। প্রলোভন সয়ে টিকে থাকতে নারাজ যারা, মুক্তিপথ রুদ্ধ তাদের। পথভ্রষ্টও হয় তারাই।
প্রলোভন কি নানা অসুবিধা নাই এমন শুদ্ধশীল নয় কোনও সম্প্রদায়। তাছাড়া জগতের কোন খানেই এ আশ্বাস কি এতখানি নিভৃতাবসর মিলবে না। এ দেহে প্রাণ থাকতে যে প্রলোভনের হাত থেকে রেহাই মিলবে সে বিষয়ে নিঃসংশয় নয় কেউ। ইন্দ্রিয়লালসায় আমাদের জন্ম, প্রলোভনের বীজ আমাদের সত্তায় রয়েছে। একটা সংকট কি প্রলোভন কাটতে না কাটতেই এসে হাজির হয় আর একটা। পরমানন্দসম্ভোগের সৌভাগ্য যখন আমরা হারিয়েছি, তখন সবসময় কিছু না কিছু ভুগতেই হবে। পালিয়ে গিয়ে প্রলোভন জয় করতে চায় অনেকে। তাদের পতন হয় আরও শোচনীয়। কেবল পালিয়ে বেড়ালে রিপুজয় সম্ভব না হতেও পারে। তিতিক্ষা ও নিরভিমানতা আশ্রয় করলেই বরং ঐসব রিপুর চেয়ে শক্তিশালী হওয়া যায়। মূলোচ্ছেদ না করে কেবল বাইরের প্রলোভন এড়িয়ে চললে বিশেষ লাভ নাই। আবারও প্রলোভন আসবে সামনে, অবস্থা উত্তরোত্তর মন্দ হবে।
কঠোর নিগ্রহ আর নিজে ও নিয়ে বিব্রত হয়ে পড়ার চেয়ে ধীরভাবে রিপুর তাড়না সয়ে ভগবৎকৃপাসহায়ে ক্রমে ক্রমে রিপুদমনের চেষ্টা করলে ফল ভাল হয়। প্রলোভন সামনে এলেই বেশির ভাগ সময় অপরের সৎ পরামর্শ নেবে। প্রলুব্ধ ব্যক্তির প্রতি কঠোর হয়ো না। নিজের বেলায় যে ধরণের আশ্বাস তোমার কাম্য, তাকেও তেমনি আশ্বাস দিও। প্রলোভনের মূলে থাকে মনের অস্থিরতা ও ভগবন্নির্ভরতার অভাব। কাণ্ডারীবিহীন তরণী যেমন ঢেউয়ে এদিক ওদিক করে, নিরুদ্যম ব্যক্তিরও সেই দশা। সংকল্পের দৃঢ়তা না থাকলে মানুষ নানা রকমে প্রলুব্ধ তো হবেই। সোনা যাচাই হয় আগুনে, তেমনি প্রলোভনেই ধার্মিক ব্যক্তির পরখ্। আমাদের শক্তি যে কত, অনেক সময় তা আমরা একেবারেই ধরতে পারি না। প্রলোভনে পড়লে তখন ধরা যায় আমরা কে কি। সে যাই হোক, গোড়া থেকেই আমাদের বিশেষ ভাবে সতর্ক থাকা উচিত। কারণ মনের ধারে-কাছে ঘেঁষতে না দিলেই অতি শীঘ্র দমিত হয় রিপু। যেমনি জানান দেবে, অমনি মুখোমুখি হবে তার।
‘ঈশানুস্মরণ’ টমাস আ কেম্পিস অনুবাদ শ্রীনারায়ণী দেবী থেকে