অন্ধ্রপ্রদেশের গুন্টুর থেকে গাড়ি নিয়ে আমরা যাব সূর্যলঙ্কা সি বিচ। ট্রেন লেট করে সময়ের তালগোল পাকিয়ে দিল। ছকা ছিল এক রকম, হল আর এক রকম। যাইহোক, স্টেশনের বাইরে এসে গাড়িওয়ালাদের সঙ্গে একপ্রস্থ কথার ঝড় উঠল। আমি বাংলায়, ওরা তেলুগুতে। গুন্টুর থেকে পঞ্চাশ কিমি দূরে সূর্যলঙ্কা সমুদ্রতট। ট্রেনেই সূর্য ডুবেছে। সহযাত্রী মৃদুল আমার এই বদভ্যাসের জন্য রাগ করে। ও বলে, যস্মিনদেশে যদাচার। আমি প্রতিবাদ করে বলি, সব ক্ষেত্রে তা নয়। ওরা যদি নিজের ভাষা থেকে না সরে আমিই বা কেন সরব? তবে এই তর্ক বেশি দূর যাওয়ার আগেই মৃদুল মধ্যস্থতা করতে এগিয়ে এল। না ঠিক মৃদুল নয়, মধ্যস্থতা করল হিন্দি। এই করতে করতে ঘড়ির কাঁটা অনেকটা ঘুরে গিয়েছে। শহর ছেড়ে গাড়ি ছুটল হাইওয়ে ধরে। বাইরের বাতাস গুমোট। গাড়ির এসি বেশ চড়া। ভালোই লাগছে, মৃদুল আবার ঠান্ডায় একটু কাবু হয়ে যায়। যত গরম তত আরাম। যাই হোক, মৃদুলের জন্যই সূর্যলঙ্কা আসা। ইন্ডিয়া মেটেরিওলজিকাল দপ্তর বা আইএমডি জানিয়েছে, মৌসুমী বায়ুর অগ্রগতির কথা। সমুদ্রের কিনারে বসে বৃষ্টি দেখার মজাই আলাদা। এসব ভাবতে ভাবতে এসে গিয়েছি বাপাতলা। সূর্যলঙ্কার আগের জেলা সদর শহর। দোকান পাট, ঘরবাড়ি, আলোর ঝলকানি, কেনাকাটার ভিড়। এখানে গাড়ির গতি শ্লথ হয়ে গেল। ইচ্ছে হচ্ছিল নেমে একটু পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখতে। ইচ্ছে আর শরীর দুটো ভিন্ন মতে চলে। ইচ্ছেকে হারিয়ে শরীর জিতে গেল। তাই আলোর ঝলকানি পিছনে ফেলে এগিয়ে চলি ডেস্টিনেশনের পথে, অচেনা সূর্যলঙ্কায়। কাছাকাছি পৌঁছে গেলে একটা গন্ধ বোধহয় পাওয়া যায়। ভ্রামণিকদের কোনো সপ্তম বা অষ্টম সেন্স দিয়ে পাঠান ঈশ্বর। নারকেল গাছের সারি জানান দেয় সমুদ্র আর বেশি দূরে নয়। গাড়ির জানালা খুলে দিয়ে বাতাসের আঁশটে গন্ধ নেওয়ার চেষ্টা করে মৃদুল। জলের শব্দ কাছে আসতেই বুঝলাম গন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছি।
গাড়ি আমাদের নিয়ে পৌঁছল সমুদ্রতটের উপর পর্যটনের রিসর্টে। গাড়ি থেকে নামতেই ঝটকা নোনা বাতাস সমুদ্র সৈকতে স্বাগত জানাল। আমরা সেই আহ্বান গ্রহণ করে রিসেপশনের প্রাথমিক কাজকর্ম সেরে কটেজে গিয়ে ঢুকলাম। রিসেপশন থেকে কটেজে যাওয়ার পথে একঝলক দেখা হল সমুদ্রর সঙ্গে। এসি চালিয়ে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিলাম বিছানায়। রাতের খাবার রুম সার্ভিসেই বলা হয়েছে।
সারাদিনের ক্লান্তি শরীরকে এমন গ্রাস করেছিল যে এক ঘুমেই রাত কাবার। কাবারই শুধু নয়, উঠতেও দেরি হল। সূর্যলঙ্কায় সূর্যোদয়ের সাক্ষী হতে পারলাম না। ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম দু’জনে। সোনালি বালির বিস্তৃত তটে পা ডুবিয়ে উদ্দেশ্যহীন হাঁটাহাঁটি। যতদূর চোখ যায় শুধু নীল জল আর সাদা ফেনা পাড়ে এসে ধাক্কা দিয়ে আবারও পিছিয়ে যাচ্ছে বহু দূর। এখানে বঙ্গোপসাগরের চরিত্র একটু অন্যরকম। উল্লাস আছে উচ্ছ্বাস কম। চেনা-পরিচিত বঙ্গোপসাগরের যে রূপে আমরা অভ্যস্ত, এ সে নয়। বিস্তৃত লম্বা তটের এ মাথা থেকে ও মাথা গুটিকয় স্থানীয় মানুষ চোখে পড়ে। সার দেওয়া মাছ ধরার নৌকা দাঁড়িয়ে রয়েছে। কখন এদের সময় আসবে কে জানে। সন্ধ্যায় সমুদ্রতীর যে জমে ওঠে তা অস্থায়ী খাবারের দোকানগুলো দেখে বোঝা যায়। রোদ না উঠলেও একটা গরম ভাব আছে। মৃদুল ভাগ্যিস সঙ্গে একটা জলের বোতল নিয়ে বেরিয়েছিল। জনশূন্য একটা দোকানে বসে জল খেয়ে জিরিয়ে নিলাম। সামনে অনন্ত জলরাশি। একের পর এক ঢেউ এসে খেলা করে যায় তটে। সোনালি বালির উপর লেখা হয়ে যায় তাদের চিহ্ন। কয়েকটা সারমেয় ঢেউয়ের সঙ্গে খেলায় মেতেছে। পাল্লা দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে ঢেউ ডিঙিয়ে, আবার ঢেউয়ের উপর লুটোপুটি খাচ্ছে, ফেনার সঙ্গে বালি মাখছে গায়ে। সে এক আজব খেলা। তবে সবসময় যে জিততে পারছে তা নয়। কখনো আবার ঢেউ এসে ডুবিয়ে দিয়ে যাচ্ছে তাদের। আমি আর মৃদুল দু’জন মিলে এই অলস দিনযাপনে মেতেছি। ঢেউ আসা যাওয়ার সঙ্গে ছুটে চলে সময়। নিত্য যাপনের বাইরে গেলে সময়কে সময়ের হাতে ছেড়ে দেওয়াই আমাদের রীতি। অন্তহীন ঢেউ আর নারকেল গাছে হাওয়ার দোলা সূর্যলঙ্কার আকাশে বাতাসে অনুরণন তোলে। একজন, দু’জন করে স্থানীয় মানুষ আসে। কেউ স্নান করতে, কেউ মাছের কারবারি। কেউ বা বিকেলের দোকান খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমাদের কোনো কাজ নেই। কেবল সমুদ্রের তীরে বসে ঢেউ গুনছি। একসময় আলস্যে ক্লান্তি এলে রিসর্টে ফিরলাম। চারপাশে বেশ কয়েকটি সুন্দর রিসর্ট আছে। কিন্তু পর্যটকের আনাগোনা নেই। লাঞ্চের পরে একটু রেস্ট। বাইরে আর্দ্রতার জন্য ঘাম হচ্ছে বেশ। মেঘ ছেয়ে আছে আকাশ জুড়ে। বৃষ্টি হবে কি না জানি না। হলে প্রাণ ভরে ভিজতাম। মৃদুলও বৃষ্টি ভালোবাসে। বাড়িতে থাকলেও বৃষ্টিতে ভেজে। বৃষ্টি, কবিতা, প্রেম এসব নিয়ে কথা বলতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি দু’জনে।
ঘুম ভাঙলে তড়িঘড়ি বেরিয়ে পড়ি। সূর্য প্রায় পাটে যাওয়ার পথে। সূর্যোদয়টা মিস করে গিয়েছি, সূর্যাস্ত অন্তত দেখা যাক। মেঘের স্তর পাতলা হয়ে অদ্ভুত সব আকার ধারণ করেছে। মেঘের শরীর জুড়ে অদ্ভুত মায়াবী আলো। আলোর রোশনাই সমুদ্রের গায়েও। এক মায়াবী পরিবেশ। স্থানীয় মানুষজন পরিবার নিয়ে এসেছে সময় কাটাতে। স্নানের আনন্দে মশগুল অনেকে। সমুদ্রপাড়ে বল নিয়ে খেলা এক পরিচিত দৃশ্য। চাউমিন, এগরোলের গন্ধ নোনা বাতাসকে হারিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে তটময়। ইডলি, ধোসা, আইসক্রিম, মাছ ভাজা, আরও কত কীই না বিকোচ্ছে চারপাশে। মানুষজন সমুদ্রকে উপলক্ষ্য করে খেতে ব্যস্ত। সূর্যলঙ্কায় সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ করার দায় তাদের নেই। আসলে এরা তো পর্যটক নয়। এদের কাছে দিনের শেষে একটু আরাম। যুবক যুবতী থেকে বৃদ্ধ বৃদ্ধা, সকলেই এখানে এসেছেন আনন্দের সন্ধানে।
দেখতে দেখতে গলানো সোনার মতো সমুদ্রে ডুব দিল সূর্য। তার আভা ছড়িয়ে পড়ল সাগরের জলে। সে এক অপার্থিব সৌন্দর্য। আকাশ আর সমুদ্র মিলেমিশে তখন একটাই ক্যানভাস। ঈশ্বরের নিপূণ এই শিল্পকার্যে মুগ্ধ না হয়ে থাকা দায়। সূর্যাস্তের এই দৃশ্যকে ব্যাকড্রপে রেখে সেলফি তোলার হুল্লোড় পড়ে গিয়েছে ততক্ষণে। কেউ কেউ পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে ফ্রেমবন্দি করছে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, কেউ বা সূর্যাস্তের সঙ্গে নিজের সিলিউয়েট তুলতেই ব্যস্ত। প্রকৃতির কিছু রুটিন চিত্র আছে। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত তারই অন্যতম। এগুলো কমবেশি সব মানুষকেই আকৃষ্ট করে। আর সেই মুগ্ধতা চিরস্থায়ী হয় ফোনে তোলা ছবির মাধ্যমে। কিন্তু সমুদ্রের এই অবিরাম পথচলার সাক্ষী হতে চান ক’জন? কারই বা সাগর পাড়ে ঢেউয়ের খেলার ছন্দে মনে হিল্লোল ওঠে?
এই তটে সমুদ্রে নামার একটা সময় রয়েছে। সকাল ছ’টা থেকে সন্ধ্যা ছ’টা। বাদ বাকি সময় যতক্ষণ খুশি বিচে থাকা যায় কিন্তু জলে নামা যায় না। দিনের আলো হারিয়ে যায় বঙ্গোপসাগরের জলের গভীরে। ভিড় হালকা হতে থাকে ক্রমশ। একা হয়ে পড়ে সমুদ্র। খাবার স্টলগুলো আরও খানিকক্ষণ ব্যবসা করবে। সেখানে আলোর ঝলক, প্রাণের মেলা। মৃদুল আর আমি শুধু সেই হাতছানিতে সাড়া না দিয়ে ধু ধু বিচে বসে রইলাম। এলোমেলো নোনা বাতাস আপন মনে দৌড়ে বেড়াচ্ছে আমাদের চারপাশ দিয়ে। জলকণা, বালি, বাতাসের সঙ্গে যেন ভারী চেনা এক খেলায় মত্ত। অগুনতি ঢেউ সারাদিন, সারারাত তট ছোঁয়ার চেষ্টায় আসে আর যায়। তটের হাইমাস্ট লাইটের আলোয় অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায় তরঙ্গের মেলা, জেলে নৌকার ওঠানামা। রাত ক্রমশ গাঢ় হয়ে এল। সাগর পাড়ের স্টলগুলোর বাতি নিভল একে একে। এবার ফিরতে হবে। ডিনারের সময় হয়ে গিয়েছে। রাজ্য পর্যটনের হারিতা রিসর্ট সমুদ্র তটের উপরই প্রায়। কটেজগুলো এক তলায় হলেও ভিউয়ের কোনো সমস্যা হয় না। বারান্দায় সমুদ্রের মুখোমুখি বসে থাকা যায় যতক্ষণ ইচ্ছে। ডিনারের পরে আমরা দু’জন বারান্দায় বসে তাকিয়ে ছিলাম সমুদ্রের দিকে। কতক্ষণ জানি না।
সকালে বারান্দায় বসেই সূর্যোদয়ের সাক্ষী থাকলাম। ব্রেকফাস্ট করে বাপাতলায় ভাবানারায়ণ স্বামী মন্দির দর্শন করতে যাব। সূর্যলঙ্কা থেকে বাপাতলা নয় কিলোমিটার মাত্র। গতকাল অটো বুক করে রেখেছিলাম। দায়িত্ব নিয়ে সময়ে এসেও গিয়েছে সে। বেরিয়ে পড়লাম মন্দির দর্শনের আশায়। বিচ রোড ধরে অটো ছুটে চলল সমুদ্রকে পিছনে ফেলে। স্টেশন থেকে পাঁচশো মিটার দূরে এই মন্দিরটিতে ভগবান বিষ্ণু পূজিত হন। প্রায় দেড় হাজার বছরের প্রাচীন এই মন্দির চোল সাম্রাজ্যের সময়কালে নির্মাণ করা হয়েছিল। রাজা ক্রিমিকাকান্ত চোল মন্দির নির্মাণে সহায়তা করেছিলেন। এই মন্দিরে দেবতা স্বয়ম্ভু। চোল দ্রাবিড়ীয় শৈলীতে নির্মিত এই বিষ্ণু মন্দির। তবে তা মেরামত ও পুননির্মাণ করা হয়েছে বিভিন্ন রাজার সময়কালে। চারদিকে চারটি গোপুরম বা প্রবেশদ্বার আছে। গোপুরমগুলিতে দেবদেবীদের মূর্তি সাজানো। মন্দির দর্শন করে এবার একটু শহর দর্শন। ঘোরাঘুরি, কেনাকাটার পর আবার ফিরতি পথে যাব সেই অমলিন সূর্যলঙ্কায়।
তাপস কাঁড়ার