Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আত্মঘাতী!

গেরুয়া শিবিরের অবস্থা অনেকটা, কী চেয়েছিলাম, আর কী হতে চলেছে! হতাশা আর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতাদের গলায়

আত্মঘাতী!
  • ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শেষপর্যন্ত জাতীয় নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার কি আশীর্বাদের পরিবর্তে অভিশাপ হয়ে দেখা দেবেন? এসআইআর-এর শুনানির নামে গত প্রায় এক মাস ধরে বাংলায় সাধারণ মানুষের যে সীমাহীন হেনস্তা ও হয়রানির ছবি উঠে এসেছে, তাতে এমন আশঙ্কাই ক্রমশ চেপে বসছে বিজেপিরই অন্দরে। গেরুয়া শিবিরের অবস্থা অনেকটা, কী চেয়েছিলাম, আর কী হতে চলেছে! হতাশা আর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতাদের গলায়। খোদ দলের রাজ্য সভাপতি বলছেন, ‘জ্ঞানেশ কুমার রাজ্যে এসে ঘুরুন। বাসে-ট্রেনে-মেট্রোয় উঠে শুনুন, মানুষ কী বলছেন! জানুন পরিস্থিতি কী!’ মুশকিল হল, এসআইআর আতঙ্কে শতাধিক মৃত্যুর অভিযোগ, প্রায় প্রতিদিন নিয়ম বদলের নিত্যনতুন ফরমান জারি করে বিভ্রান্তি তৈরি করা, আদালত নির্দেশিত তথ্যকে না মানা, ৮০-৮৫ বছরের বেশি বয়সের প্রবীণদের শুনানির লাইনে টেনে আনা এবং ‘নো ম্যাপিং’ ও যুক্তিগ্রাহ্য অসংগতির কারণ দেখিয়ে যে লক্ষ লক্ষ প্রকৃত ভোটারকে তলব করে চূড়ান্ত হেনস্তা করা হচ্ছে, তা বুঝেও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে পারছেন না বঙ্গ বিজেপি নেতারা। অথচ তাঁরা বেশ ভালোই বুঝতে পারছেন, দ্রুত কাজ শেষ করতে গিয়ে জ্ঞানেশ কুমার বাহিনী যে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, ভোটের বাক্সে তার ফল ভুগতে হতে পারে বিজেপিকে। এই অবস্থায় এসআইআর-এর কাজ মাঝপথে বন্ধ করে দিয়ে হয়তো পরিত্রাণের পথ খুঁজতে চাইছে বিজেপির একাংশ। কিন্তু তাতেও বিধানসভার ‘ম্যাচ’ জেতার কোনো সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।

Advertisement

বিহারে এসআইআর-এর পর মোট ৪৭ লক্ষ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছিল। সে রাজ্যের বিধানসভা ভোটে এর সুবিধা বিজেপি-জোট পেয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবার ‘বাংলার পালা’ হুংকার ছেড়ে বিজেপি নেতারা বলেছিলেন, এ রাজ্যে এক থেকে দেড় কোটি অনুপ্রবেশকারী (প্রধানত মুসলিম) ও রোহিঙ্গার নাম বাদ যাবে ভোটার তালিকা থেকে। ভোটে জিততে মেরুকরণের রাজনীতিই বিজেপির একমাত্র ‘অস্ত্র’। তারই অঙ্গ হিসেবে অনুপ্রবেশকারীদের তাড়াতেই যে তড়িঘড়ি এসআইআর হচ্ছে—সে কথা প্রকাশ্যেই বলছেন বিজেপির কেউ কেউ। কিন্তু ঘটনা হল, পশ্চিমবঙ্গে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর যে ৫৮ লক্ষ লোকের নাম বাদ গিয়েছে দেখা যাচ্ছে, তাতে হিন্দুদের সংখ্যাই বেশি। এসআইআর-এ ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে বর্তমান ভোটারদের নথি মিলিয়ে দেখে যুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। খসড়া তালিকা প্রকাশের পর দেখা গিয়েছে, এ রাজ্যে সংখ্যালঘু অনেকেই নথিভুক্ত। যে সীমান্ত জেলাগুলিতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা বেশি বলে এতদিন প্রচার করে এসেছে বিজেপি, এসআইআর-এর তথ্য বলছে, ওই জেলাগুলিতেই বৈধ নথি থাকা মানুষের সংখ্যা বেশি। বরং প্রয়োজনীয় কাগজ দেখাতে না পারার কারণে হিন্দু শরণার্থী ও শহুরে শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর নাম কাটা গিয়েছে বেশি খসড়া তালিকায়। শুধু এই নয়, বিজেপির প্রচারকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে দেখা যাচ্ছে, হাতে নথি নিয়ে প্রতিদিন যে লক্ষ লক্ষ মানুষ নাগরিক হিসেবে প্রমাণ দিতে শুনানির লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকছেন, তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই হিন্দু। যুক্তিগ্রাহ্য অসংগতির তালিকায় চ্যাটার্জি, ব্যানার্জি, মুখার্জি, ভট্টাচার্যিদের ভিড়। কমিশনের নোটিস পেয়ে এই হিন্দু বাঙালিরা শুনানির লাইনে নিষ্পেষিত হচ্ছেন। এতে পরিষ্কার, বিজেপির যাবতীয় অঙ্ক গুলিয়ে দিয়েছে পরোক্ষে নির্বাচন কমিশনই! আর এসআইআর-এর মূল লক্ষ্য স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরির কথা বলা হলেও এর উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এই বিতর্কে নবতম সংযোজন ‘ডেমোগ্রাফিক সিমিলার এন্ট্রিজ’ নামে একটি নতুন সফটওয়্যার। একটি সূত্রের খবর, এই সফটওয়্যার নাকি কাজই করছে না। এই ব্যর্থতার প্রশ্নে বঙ্গ বিজেপির নেতারা টুঁ শব্দটি করছেন না।

শেষপর্যন্ত কত নাম বাদ যাবে, তা জানা যাবে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরই। কিন্তু শুনানির নামে যে প্রায় দেড় কোটি মানুষের হেনস্তা হচ্ছে, বিধানসভা নির্বাচনে তাঁদের ভোট পাবে পদ্মফুল— এমনটা বোধহয় বিজেপিও আশা করবে না। যাঁদের নাম বাদ যাবে, তাঁদের পরিবারও নিশ্চয়ই বিজেপিকে জামাই আদর করবে না। আর বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির আশঙ্কা অনুযায়ী যদি গুচ্ছ গুচ্ছ প্রকৃত নাগরিকের নাম বাদ যায়— সে ক্ষেত্রে আদালতে মামলা হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যাবে। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, এ রাজ্যে ক্ষমতা দখলের জন্য ‘ম্যাচে’ তৃণমূলকে প্যাঁচে ফেলতে গিয়ে বিজেপির নিজেদেরই ঘর সামলানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে যেভাবে বাংলাভাষী শ্রমিকদের ‘বাংলাদেশি’ বলে আটক করা অথবা ওপারে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, তাতে এককথায় বিজেপি নিজেদের ‘কৃতিত্বে’ দলটিকে ‘বাংলা বিরোধী’ বলে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। বিভাজনের আদর্শগত লক্ষ্যপূরণে এসআইআরকে হাতিয়ার করে যে ফায়দা তুলতে চেয়েছিল তারা, সেটাও হয়তো ব্যুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে। সঙ্গে রয়েছে প্রত্যাশা মতো সংখ্যালঘু ভোটার বাদ না পড়ার সম্ভাবনা। তেমনটা হলে আর বিজেপির হাতে রইলো কী!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ