Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

কৃষ্ণনগরে হেমন্তকুমারের সখ্যতায় সুভাষচন্দ্রের মনে জাগে দেশপ্রেম

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে কৃষ্ণনগরের নাম যতটা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত, ততটাই গৌরবময় রাজনৈতিক চেতনার জন্যও

কৃষ্ণনগরে হেমন্তকুমারের সখ্যতায় সুভাষচন্দ্রের মনে জাগে দেশপ্রেম
  • ১৫ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে কৃষ্ণনগরের নাম যতটা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত, ততটাই গৌরবময় রাজনৈতিক চেতনার জন্যও। শোনা যায়, এই শহরের মাটিতেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর দেশপ্রেমের অঙ্কুরোদ্‌গম ঘটেছিল। আর সেই প্রেরণার নেপথ্যে ছিলেন শহরেরই স্বাধীনতা সংগ্রামী হেমন্তকুমার সরকার। তাঁর আহ্বানেই তরুণ সুভাষ প্রথম কৃষ্ণনগরে পদার্পণ করেন। যুক্ত হন স্বাধীনতার কর্মযজ্ঞে। যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি গড়ে দেয়।

Advertisement

দেশকে স্বাধীন করতে নেতাজিকে অতিক্রম করতে হয়েছিল দীর্ঘ প্রতিকূল রাস্তা। বিদেশে গিয়েছিলেন সমর্থন ও সংগঠন গড়তে।‌ কিন্তু, এই দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের প্রেরণা শুরু হয়েছিল এখানেই, এই অঞ্জনা পাড়ের কৃষ্ণনগরে। নেতাজি নিজেও তাঁর আত্মজীবনী ‘ভারত পথিক’ গ্রন্থে হেমন্তকুমার সরকারের অবদান উল্লেখ করেছেন।
সুভাষের প্রিয় গুরু, কটকের র‌্যাভেনশ কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক বেণীমাধব দাস ১৯১০ সালের দিকে বদলি হয়ে কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলে আসেন। তিনিই হেমন্তকুমার ও সুভাষচন্দ্রের মধ্যে প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন। প্রথম আলাপ থেকেই দুই তরুণের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। যা পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করার পর হেমন্তের আহ্বানেই সুভাষ কৃষ্ণনগরে আসেন। হেমন্ত তখন জেলার বিভিন্ন প্রান্তে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রচার চালাচ্ছেন। সুভাষও তাঁর সঙ্গে গুরুদাস গুপ্ত, অমূল্য উকিল প্রমুখ স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গ পেতে শুরু করেন। স্বাধীনতার কথা, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পরিকল্পনা, ও দেশমুক্তির স্বপ্ন—সবকিছুরই কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে কৃষ্ণনগরের গোলাপট্টি এলাকা। হেমন্তকুমারের বাড়িটি একদিকে ছিল বন্ধুত্বের ঠিকানা, অন্যদিকে আন্দোলনের কৌশল তৈরির কেন্দ্র। সুভাষ কৃষ্ণনগরে এলে এখানেই উঠতেন। খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা, সভা, পরিকল্পনা—সবই চলত এই বাড়িতে। অঞ্জনা খালের তীরে বসে বহুবার দেশমুক্তির ভবিষ্যৎ রূপরেখা তৈরি করেছেন দুই বন্ধু। হেমন্ত শ্রমজীবী মানুষের জন্য একটি অবৈতনিক নৈশ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সদ্য ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করা সুভাষ সেখানে শিক্ষকতা করতেন। পড়াশোনার পাশাপাশি এই বিদ্যালয় স্বাধীনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছিল। দরিদ্র ও শ্রমজীবী পরিবারগুলির সন্তানদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলতে এই প্রচেষ্টা ছিল এক বড় পদক্ষেপ।
আজও কৃষ্ণনগরে ‘হেমন্ত সরকার লেন’ নামে রাস্তা রয়েছে। গোলাপট্টির সেই ঐতিহাসিক বাড়িটি এখনও টিকে আছে। যদিও তা আজ ভগ্নদশায় এবং অনেকটাই বিস্মৃত। আত্মীয়স্বজনের বসতি থাকলেও এর অতীত গৌরবের পরিচয় খুব কম মানুষই জানেন। অথচ একসময় এখান থেকেই তরুণ নেতাজির রাজনৈতিক জীবনের প্রথম অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল।
শহরের প্রবীণ বাসিন্দা সঞ্জিত দত্ত বলেন, হেমন্ত আর সুভাষ ছিলেন অবিচ্ছেদ্য বন্ধু। কৃষ্ণনগরে এলেই সুভাষ হেমন্তের বাড়িতে উঠতেন। তাঁকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে হেমন্তকুমারের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তাঁদের বন্ধুত্ব ও যৌথ কাজের মাধ্যমে কৃষ্ণনগর স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। কৃষ্ণনগরের এই ইতিহাস শুধু নেতাজির জীবনগাথার একটি অধ্যায় নয়, বরং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অমূল্য অংশ। মৃৎশিল্পের জন্য বিখ্যাত এই শহর একইসঙ্গে দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক চেতনারও এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। যেখানে হেমন্তকুমার সরকারের ডাকেই সূচিত হয়েছিল নেতাজির রাজনৈতিক যাত্রাপথ।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ