সমৃদ্ধ দত্ত: তিনি কিন্তু শুধু ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে কলকাতার এলগিন রোডের বাড়ি থেকে পালিয়ে আফগানিস্তান, সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে বার্লিন যাত্রার মতো এক দুঃসাহসিক কাহিনির মহানায়ক হয়েই থেমে থাকেননি।
সমৃদ্ধ দত্ত: তিনি কিন্তু শুধু ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে কলকাতার এলগিন রোডের বাড়ি থেকে পালিয়ে আফগানিস্তান, সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে বার্লিন যাত্রার মতো এক দুঃসাহসিক কাহিনির মহানায়ক হয়েই থেমে থাকেননি।
তিনি কিন্তু ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট সেই তাইহোকুর বিমান দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন কিংবা সেরকম কিছুই ঘটেনি জাতীয় এক অন্তহীন রহস্য জল্পনার কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়েই থেকে যেতে চাননি। সাবমেরিন, আটলান্টিক, জাপান, আজাদ হিন্দ ফৌজ, ইম্ফল পর্যন্ত সেনাবাহিনী নিয়ে ঢুকে পড়া, বিস্ময়কর এক যুদ্ধ কিংবা ভারতজুড়ে জাতীয়তাবাদের ঝড় সৃষ্টি করার অবিসংবাদিত এক চিরকালীন বীরত্বের রোলমডেলের ভাবমূর্তির মধ্যে বিরাজ করে ইতিহাসে স্থান পাওয়ায় সন্তুষ্ট হওয়ার মতো সামান্য চরিত্র তিনি ছিলেন না।
তিনি থাকলে কী হয় সেটা ব্রিটিশ সরকার প্রত্যক্ষ করেছে। তিনি অদৃশ্য থেকেও যে কতটা সর্বশক্তিমান হতে পারেন সেটাও ব্রিটিশ জেনেছে আজাদ হিন্দ সেনানিদের লালকেল্লায় বিচার করতে গিয়ে। ভারতজুড়ে আবেগের বিস্ফোরণ ঘটেছিল। কিন্তু না, তিনি এই জনজাগরণের এক এক অগ্নিশিখা পরিচয়েই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে নিশ্চিত পছন্দ করতেন না।
স্বাধীন ভারত কেমন হওয়া উচিত? স্বাধীনতার পর স্বাধীন সরকারের কী কাজ করা দরকার। ভারত নির্মাণের প্রধান পথগুলি কী? ভারত ও বাঙালি জাতির আদর্শ কোনদিকে ধাবিত হওয়া প্রয়োজন? এই প্রতিটি দিশানির্দেশও কিন্তু নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু করে গিয়েছেন। সুতরাং এমন নয় যে, তাঁর প্রিয় বাঙালি জাতি, তাঁর প্রাণাধিক স্বদেশ ভারতবর্ষ কীভাবে এক উন্নত স্বপ্নের রাষ্ট্রে পরিণত হবে, সেই রূপরেখা তিনি দেননি।
কিন্তু আমরা কি সেই দিশা, নির্দেশিকা এবং পরামর্শগুলি বিগত ৮০ বছরে কখনো সূক্ষ্মভাবে অনুসরণ করেছি? আমাদের তাবৎ সরকারগুলি কি নেতাজির পথ অনুসরণ করেছে? দুর্ভাগ্যজনক হল, নেতাজির নীতি ও আদর্শের কোনোরকম বিচ্যুতি ঘটতে দেখলে ভারতবাসী গর্জে ওঠেনি। কেন? কারণ, নাগরিকরা যতটা নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য উদঘাটন, তাঁর ফিরে আসা অথবা না আসা, সোভিয়েত ইউনিয়নে তাঁর যাত্রার সত্যতা অথবা রহস্য, কোন সাধু নেতাজি হলেও হতে পারেন, ইত্যাদি বিষয়ে প্রবল আগ্রহী ও কৌতূহলী, ঠিক সেই তুলনায় নেতাজির নীতি আদর্শ অনুসরণ করে তাঁর রচিত স্বপ্নের রাষ্ট্র গঠনে নিজেদের এবং সরকারকে গড়ে তোলায় উদ্যমী নয়।
আমরা ক্রমেই ভুলে গিয়েছি যে, নেতাজির বিমান দুর্ঘটনা, অন্তর্ধান রহস্যের কুয়াশা ভেদ করে সত্যের উন্মোচন যেমন জরুরি, ঠিক সেরকমই প্রয়োজনীয় হল, নেতাজির চরিত্রই আমাদের কাছে মডেল, নেতাজির নীতি, আদর্শকে জীবনের সর্বস্তরে গ্রহণ করা। প্রতিটি ২৩ জানুয়ারি যতটা উৎসাহ নিয়ে প্রভাত-ফেরি ও ভাষণ হয়, সেই উৎসাহে কি ৩৬৫ দিনই জীবনে নেতাজির ভাবধারা অনুকরণ করে ভারতবাসী নিজেদের তৈরি করেছে? নেতাজিকে নিয়ে স্বাধীনতার পর থেকে যত বই জনপ্রিয় হয়েছে, যত বই মানুষ আগ্রহ সহকারে পাঠ করেছে, সেই তুলনায় তাঁর নিজের লেখা বই, চিঠি, ভাষণের গ্রন্থ কতজন পাঠ করে?
কতটা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু? দেখা যাক। ১৯৪৪ সালের নভেম্বর মাসে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বলেছেন, ‘‘স্বাধীন ভারতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার কথা আমি উল্লেখ করেছি: জাতীয় প্রতিরক্ষা, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং জনগণকে শিক্ষাদান। এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার যদি সমাধান করতে হয়, তাহলে আমাদের কী করা উচিত?’’ এই প্রশ্ন করে নেতাজি স্পষ্ট বলেছেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগ নয়, অর্থাৎ বেসরকারি হাতে নয়, রাষ্ট্রের উচিত এই সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব গ্রহণ করা। নেতাজি ওই ভাষণে বলেছিলেন, যে বিষয়ে সরকারকে সবথেকে বেশি দায়িত্ব নিতে হবে, সেটি হল লক্ষ লক্ষ বেকারের চাকরি দেওয়া। কারণ ওটাই সবথেকে বৃহৎ সমস্যা হতে চলেছে।
স্বাধীন ভারতের একটি উন্নত ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হয়ে ওঠার জন্য কী কী করার দরকার বলে নেতাজি মনে করতেন? ১৯৪২ সালে জার্মান পত্রিকা willeund macht -এর আগস্ট সংখ্যায় তিনি একটি প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। যেটি পরে আজাদ হিন্দ পত্রিকায় পুনরায় মুদ্রিত হয়। নেতাজি সবথেকে বেশি জোর দিয়েছিলেন জাতীয় ঐক্যের উপর। তিনি লিখেছিলেন, ‘‘ভারতে এখনও যেসব ব্রিটিশের দালাল গোপনে রয়েছে, তাদের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয়তাবাদী বিরোধী এবং ঐক্যনাশক শক্তিগুলিকে কঠোরভাবে দমন করতে হবে…উদ্দেশ্যমূলক ব্রিটিশ প্রচারের ফলে এমন একটি ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে, ভারতীয় মুসলমানরা স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধী। কিন্তু এটা সর্বৈব মিথ্যা। আসল ঘটনা হল, জাতীয় আন্দোলনে মুসলমানদের একটি বড় অংশ যোগ দিয়েছে।’’ নেতাজি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘ এতে কোনও সন্দেহ নেই যে, মুসলমান ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্রিটিশ অনুরাগী দলগুলি ধর্মীয় দল হিসেবে গড়ে উঠেছে। কিন্তু তাদেরকে দেশের প্রতিনিধিরূপে স্বীকার করা উচিত হবে না।’ অর্থাৎ ধর্মীয় মৌলবাদকে পুঁজি করে হিন্দু অথবা মুসলিম কোনও দলকেই নেতাজি ভারতের প্রতিনিধি মনেই করেননি।
আজ এতকাল পর দেখা যায় সমস্ত রাজনৈতিক দল নারী, দলিত এবং শ্রমিক শ্রেণিকে সন্তুষ্ট করার জন্য তাদের একটি পৃথক ভোটব্যাংক হিসেবে কৌশলে ব্যবহার করছে। নানাবিধ প্রকল্প কিংবা তুষ্ট করা হয় তাদের। নেতাজি কিন্তু অনেক আগেই এই তিন শ্রেণির জাগরণের জয়গান গেয়েছিলেন। ১৯২৯ সালের ২২ জুলাই হুগলি জেলা ছাত্রসম্মেলনের ভাষণে সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশে তিনটি বৃহৎ সম্প্রদায় এখনও সুপ্ত। এরা হলেন নারী, তথাকথিত অনুন্নত সম্প্রদায় এবং শ্রমিক সম্প্রদায়। চলুন, তাঁদের কাছে গিয়ে বলি, আপনারাও মানুষ এবং মানুষের সম্পূর্ণ অধিকার আপনারা পাবেন। অতএব উঠে দাঁড়ান, জেগে উঠুন এবং জড়ের মনোভাব পরিত্যাগ করে আপনাদের বৈধ দাবি ছিনিয়ে নিন’।
১৯৩৮ সালে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়ে সুভাষচন্দ্র বসু জাতীয় প্ল্যানিং কমিটি গঠন করেছিলেন। সেই কমিটি অর্থনীতি, শিল্প, গ্রামোন্নয়ন নিয়ে একঝাঁক রিপোর্ট তৈরি করেছিল। নেতাজি প্রদর্শিত সেই প্ল্যানিং কমিটিকেই কাঠামো হিসেবে ভিত্তি করে স্বাধীন ভারতে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু প্ল্যানিং কমিশন গঠন করেছিলেন। যে কমিশন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাগুলি রচনা করেছিল ভারত নির্মাণের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে।
জেলবন্দি অবস্থায় বার্মায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। তাঁর সুস্থতার জন্য পূর্ণ বিশ্রাম ও চিকিৎসা প্রয়োজন। মান্দালয় থেকে ইনসেইন। একের পর এক জেলে ঘোরানো হচ্ছে। ১৯২৬ সাল থেকেই তাঁকে ব্রিটিশ সরকার শর্ত দিচ্ছে যে, তাঁকে মুক্তি দেওয়া হবে, কিন্তু তিনি বাংলা, বার্মা, সিলোনে থাকতে পারবেন না। তাঁকে বিদেশে পাঠানো হবে। এবং অন্তত তিন বছরের আগে তাঁকে ফেরানো হবে না। সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর দাদা শরৎ চন্দ্র বসুকে জেল থেকে একের পর এক চিঠি লিখেছিলেন। সেইসব চিঠিপত্র থেকে জানা যায়, সুভাষচন্দ্র এতটাই আত্মসম্মানসম্পন্ন ছিলেন যে, ব্রিটিশ আধিকারিকদের স্পষ্ট বলেন, ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে সম্পূর্ণ বিনা কারণে গ্রেপ্তার করে জেলে রেখেছে। ব্রিটিশ সরকারের শর্ত তিনি মানবেন কেন? তিনি শর্ত দেবেন! তাঁর শর্তাবলি ব্রিটিশ সরকারকে মানতে হবে। যদি মেনে নেয়, তাহলেই যেন তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। বিদেশে চিকিৎসার জন্য তিনি যাবেন। কিন্তু তাঁর দেশে ফেরা নিজের ইচ্ছার উপর। ব্রিটিশকে কোনো মুচলেকা দেবেন না তিনি। আর তাঁর যে অর্থ ও শারীরিক ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতিপূরণ ব্রিটিশকে দিতে হবে।
প্রসঙ্গত ইনসেইন জেল বার্মার এক কুখ্যাত কারাগার। সেখান থেকে মুক্তি পেতে সব বন্দিই উন্মুখ থাকত। কিন্তু সুভাষচন্দ্রকে নিজেদের শর্তে মুক্তি দেওয়ার চাপে নত করতে ব্যর্থ হয় ব্রিটিশ। সুভাষচন্দ্র ঘৃণাভরে জানিয়ে দেন, ব্রিটিশের শর্তে রাজি হওয়ার তুলনায় আজীবন জেলবন্দি থাকা শ্রেয় তাঁর কাছে।
একটি আশ্চর্য সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং দেখিয়েছিলেন ভারতবাসীকে। ১৯২৯ সালে লাহোরে তিনি এক ছাত্র সম্মেলনের অধিবশেনে যা বলেছিলেন, সেটি যেন কোনও ভাষণ ছিল না। সেটি ছিল যেন এক মন্ত্র। সেই মন্ত্র আজও সমান অগ্নিপ্রজ্জ্বলক।
সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতা বলতে আমি বুঝি সার্বিক স্বাধীনতা। অর্থাৎ ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং সেই সঙ্গে সমাজের স্বাধীনতা, পুরুষের এবং নারীর স্বাধীনতা। ধনীর স্বাধীনতা, দরিদ্রের স্বাধীনতা। শুধু রাজনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্তি নয়, সেই সঙ্গে সম্পদের সমবণ্টন, জাতিভেদ এবং সামাজিক অবিচার দূরীকরণ। সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ধ্বংস করা। কঠোর হৃদয় পুরুষ ও নারীর কাছে এই আদর্শ অবাস্তব মনে হতে পারে, কিন্তু একমাত্র এই আদর্শই আত্মার ক্ষুধা তৃপ্ত করতে পারে’।
আজ ২০২৬ সালে এসে আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে যে, এই কয়েকটি বাক্যের অগ্নিশিখাসম নীতি ও আদর্শ আমরা অনুসরণ করতে পারছি? যদি না পারি, তাহলে কিন্তু সুভাষচন্দ্র নামক ঈশ্বরের পূজারি হওয়ার যোগ্যতা আমাদের নেই!