শ্রীকান্ত পড়্যা, তমলুক: ৮৭বছর আগে সুভাষচন্দ্র বসুর তমলুক আগমনের স্মৃতি এখনও আঁকড়ে রেখেছে রামকৃষ্ণ মিশন থেকে শুরু করে তমলুক পুরসভা। দেশবরেণ্য ওই নেতা কলকাতা থেকে ট্রেনে পাঁশকুড়ায় পৌঁছেছিলেন। সেখান থেকে খোলা জিপে চড়ে তমলুক পৌঁছন। পাঁশকুড়ার জোড়াপুকুরে তাঁকে সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল।
১৯০৫সাল থেকেই ব্রিটিশবিরোধী সভার জন্য তমলুক রাজবাড়ি ময়দানকে বেছে নিতেন দেশপ্রেমিকরা। ১৯৩৮সালের ১১এপ্রিল রাজবাড়ি ময়দানকেই সুভাষচন্দ্র বসুর সভাস্থল বাছা হয়েছিল। শহরজুড়ে মাইকিং করে বলা হয়, ‘ক্যালকাটা কর্পোরেশনের পূর্বতন মেয়র ও বর্তমান অল্ডারম্যান সুভাষচন্দ্র বসু তমলুকে আসবেন। তাঁকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হবে।’
ওই সভার কথা জেনে ইংরেজ প্রশাসনের ঘুম ছুটে যায়। হ্যামিল্টন স্কুলের সম্পাদক শরৎচন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে(প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়ের পিতা) মেদিনীপুরের তৎকালীন জেলাশাসক চিঠি পাঠিয়ে সতর্ক করেন। রাজ ময়দানে ওই সভা হলে হ্যামিল্টন স্কুলের অনুমোদন বাতিল ও তমলুকের মানুষের অভাবনীয় ক্ষতি হবে বলে জানিয়ে দেন। এতে তমলুক মহকুমার কংগ্রেস নেতৃত্ব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। অবশেষে তাম্রলিপ্তের রাজা সুরেন্দ্রনারায়ণ রায়ের তৎপরতায় রাজবাড়ির আমবাগান কেটে সেখানেই সভা হয়। ব্রিটিশ পুলিসের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই সেদিন সুভাষচন্দ্র বসুর সভায় স্বদেশি ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ মানুষ ভিড় জমিয়েছিলেন।
তমলুক শহরে বৈকুণ্ঠধামে সতীশ চক্রবর্তীর বাড়িতে উঠেছিলেন সুভাষচন্দ্র। নিজেই রান্না করতে উদ্যোগী হলে আপত্তি জানান সতীশবাবুর স্ত্রী ইন্দুপ্রভাদেবী। তিনি সুস্বাদু নানা পদ বানিয়ে নেতাজিকে খাইয়েছিলেন। তমলুকে থাকাকালীন সুভাষচন্দ্র বর্গভীমা মন্দিরে গিয়ে দেশমাতৃকাকে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত করার শপথ নেন। রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমে গিয়ে ভিজিটর্স বুকে নিজের মন্তব্য লেখেন। মিশন কর্তৃপক্ষ সেই মন্তব্য বাঁধিয়ে রেখেছে সবার দেখার ব্যবস্থা করেছে।
তমলুক পুরসভা আগেই বোর্ড মিটিং করে সুভাষচন্দ্রকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সেই সংবর্ধনার খরচ পুরসভার তহবিল নয়, বরং চাঁদা তুলে জোগাড় করা হয়েছিল। স্বদেশি ভাবধারায় জাগ্রত তমলুকবাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে চাঁদা দিতে এগিয়ে এসেছিলেন।
১১এপ্রিল সভার পর ১২এপ্রিল সুভাষচন্দ্র বসু মুগবেড়িয়ার উদ্দেশে রওনা দেন। পথে চণ্ডীপুরে অসংখ্য মানুষ রাস্তার ধারে তাঁর অপেক্ষায় ছিলেন। সেখানে নেমে তিনি রামকৃষ্ণ মিশনে যান। স্বদেশিদের আবদার মেনে চণ্ডীপুরে বক্তৃতাও দেন। শ্রীকৃষ্ণপুরেও তাঁকে সংবর্ধনা জানানো হয়। পরে গন্তব্যে পৌঁছে মুগবেড়িয়া হাইস্কুলের তৎকালীন সম্পাদক বীরজাচরণ নন্দের কাছে জানতে চান, শহিদ ক্ষুদিরাম মুগবেড়িয়ায় কোথায় ছিলেন? ওই স্কুলের কাছেই নেতাজিকে সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল। এখন সেই জায়গা সুভাষপল্লি নামে পরিচিত। সেখানে নেতাজির পূর্ণাবয়ব মূর্তিও রয়েছে।
উল্লেখ্য, ক্ষুদিরাম বসু প্রায় ছ’মাস মুগবেড়িয়ায় নন্দালয়ে ছিলেন। মুগবেড়িয়া, বায়েন্দা, ইক্ষুপত্রিকা, ঠাকুরনগর, বলাগেড়িয়ায় বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর সহযোগীরা ছিলেন বীরজাচরণ নন্দ, রাজনী প্রধান ও ক্ষীরোদ ভুঁইয়া। বিপ্লবীদের এমন শক্ত ঘাঁটিতে স্বদেশী চেতনাকে আরও জাগ্রত করতে নেতাজি পৌঁছে গিয়েছিলেন।
শিক্ষাবিদ তথা প্রাক্তন বিধায়ক ব্রহ্মময় নন্দ বলেন, সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৮সালের ১১এপ্রিল রাতে বৈকুণ্ঠধামের কাছে কংগ্রেসের মহকুমা সভাপতি মহেন্দ্রনাথ মাইতির বাড়িতে বৈঠক করেছিলেন। সেই বৈঠকে সতীশচন্দ্র সামন্ত, অজয় মুখোপাধ্যায়, কুমারচন্দ্র জানার মতো কংগ্রেসের বিশিষ্ট নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
ইতিহাসবিদ রাজর্ষি মহাপাত্র বলেন, ৮৭বছর আগে সুভষচন্দ্র বসু তমলুকে এসেছিলেন। তমলুক পুরসভায় যিনি যে চেয়ারে বসেছিলেন সেটি এখনও সংরক্ষিত রয়েছে। তাঁর ঐতিহাসিক আগমন এখনও তমলুকবাসী গর্বের সঙ্গে স্মরণ করেন।