Bartaman Logo
১১ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

কল্যাণী রূপে সুভদ্রা

সুভদ্রা কীভাবে পাণ্ডব বংশকে রক্ষা করেছিলেন? অর্জুনের বনবাসের গল্পে সুভদ্রার গুরুত্ব। বিস্তারিত পড়ুন।

কল্যাণী রূপে সুভদ্রা
  • ১১ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বলরাম ও জগন্নাথের আদরের ভগিনী সুভদ্রা কীভাবে পাণ্ডব বংশকে রক্ষা করেছিলেন? লিখছেন অনিন্দিতা মণ্ডল।

Advertisement

খাণ্ডবপ্রস্থে নতুন রাজ্য স্থাপন চলছে। সবে যুধিষ্ঠির রাজা হয়েছেন। এখনও খাণ্ডবপ্রস্থ ‘ইন্দ্রপ্রস্থ’ হতে দেরি আছে। বাসস্থান ইতস্তত নির্মাণ হচ্ছে। নারদ মুনির বিধান অনুসারে, পাঞ্চালি তখন এক বছরের জন্য যুধিষ্ঠিরের ঘরনি। এসময় অন্য চার ভাইয়ের সেই নির্জন দাম্পত্যে ভুল করেও ঢুকে পড়া বারণ। অন্যথায় শাস্তি বারো বছরের বনবাস। ওদিকে এক ব্রাহ্মণের গোরু হারিয়েছে। মহাভারত জুড়ে পাণ্ডবদের সঙ্গে ব্রাহ্মণদের সখ্য লেখা হয়েছে। এখন এই গোরু খুঁজতেই অর্জুন গেলেন অস্ত্রাগারে। কে জানত যে সেই ঘরটিকেই সবচেয়ে নির্জন ও একান্ত মনে করেছেন যুধিষ্ঠির! কৃষ্ণা প্রথম স্বামীর সাক্ষাতে। অর্জুনের বীর্যশুল্কা হয়েও তাঁকে মেনে নিতে হয়েছে পঞ্চস্বামীকে। অখণ্ড অধিকার অর্জুন তো পাননি বটেই, উপরন্তু তিনি একবারও কৃষ্ণাকে একান্তে পেলেন না। হতাশ অর্জুন বারো বছরের জন্য বনে চললেন। যুধিষ্ঠির মৃদুস্বরে বাধা দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু অর্জুন যেন প্রিয়নারীকে ভ্রাতৃঅঙ্কে দেখে গভীর বিষাদেই খাণ্ডবপ্রস্থ ছেড়ে বনে চলে গেলেন। 
বনবাসে থাকাকালে তিনি উলুপী ও চিত্রাঙ্গদার সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হলেন কিন্তু তাঁদেরকে খাণ্ডবপ্রস্থে আনতে পারলেন না। বনবাসে তাঁর ব্রহ্মচর্যে থাকার কথা। দু’বার তিনি সেই ব্রত ভঙ্গ করলেন। যদিও অর্জুন দ্রৌপদীকেই কামনা করেছিলেন কিন্তু তাঁর দুর্ভাগ্য যে বারোটি বছর তিনি নির্বাসনে গেলেন, এই বারো বছরে কৃষ্ণার সঙ্গে তাঁর মিলন ঘটল না। 
বনবাস প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, এমন সময় অর্জুন গেলেন প্রভাস তীর্থে। মনোরম সেই স্থান। পশ্চিম সাগরের তীরে এই তীর্থ যেমন পুণ্যার্থীদের আকর্ষণ করে, তেমনই বহু মানুষ স্থানটির সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়েও সেখানে বিহার করেন। প্রভাসে এসে ভালো লাগল তাঁর। দীর্ঘদিনের বনবাস ও ব্রহ্মচর্য তাঁকে ক্লান্ত করেছিল। কিন্তু প্রভাসে এসে তিনি যেন মনের মাঝে আবার বাঁশির হৃদয়হরণ সুর শুনতে পেলেন। এ সুর তো চেনা! দ্বারকা থেকে ভেসে আসছে যে! 
অর্জুনের প্রভাসে আসার সংবাদ ততক্ষণে এসে পড়েছে দ্বারকায়। চারদিকে কানাকানি ফিসফিস। সুদর্শন পুরুষশ্রেষ্ঠ বীর অর্জুন এসেছেন দ্বারকায়! সেখানে ভোজ বৃষ্ণি যাদবদের মধ্যে অর্জুনের দারুণ যশ। খানিকটা কৃষ্ণের কারণেই। কৃষ্ণের অভিন্নহৃদয় সখা অর্জুন। সুতরাং কৃষ্ণ সঙ্গে সঙ্গে প্রভাসে পৌঁছালেন। এবং সাদর আলিঙ্গনে অর্জুনকে দ্বারকায় আহ্বান জানালেন। 
দ্বারকায় এসে অর্জুন কৃষ্ণের সঙ্গেই কিছুদিন রইলেন। আনন্দে কাটল সেই সব দিন। তারপর একদিন অর্জুন বললেন, বনবাসে থাকা উচিত, এমন করে বিলাসে থাকার তো কথা নয় কৃষ্ণ। 
কৃষ্ণ হাসলেন। বললেন, চল রৈবতকে। সে পর্বতে যে শৈল আবাস আছে, তা তোমার ভালো লাগবে। সব ব্যবস্থাই আছে সেখানে। অতএব থাকতে কষ্ট হবে না একটুও। তারপর আবার সামনেই উৎসব। দ্বারকার যত লোক সব যাবে সেখানে। খুব আমোদ হবে। উৎসবে আনন্দে গীত ও নৃত্যে তোমার বনবাসের সব দুঃখ হরণ করে নেবে রৈবতক। আমাদের কুলদেবতা আছেন সেখানে। তোমার ব্রহ্মচর্য পূর্ণ হোক। 
কৃষ্ণ যেহেতু ভবিষ্যৎ বুঝতে পারতেন তাই শেষের কথাটির মধ্যে একটু রসিকতা ছিল। কারণ তিনি লক্ষ করেছিলেন, দ্বারকার কয়েকটি দিনের মাঝে ভগিনী সুভদ্রা সত্যভামার আঁচল মোটে ছাড়ছেন না। অতিথিসেবার কারণে সত্যভামা যখনই কৃষ্ণের কক্ষে আসছেন, পিছনে দাঁড়িয়ে থাকছেন সুভদ্রা। কথিত আছে, চাঁপা ফুলের মতো রং সুভদ্রার। মুখের চারদিক ঘিরে এক বিনম্র লাবণ্য ও স্নিগ্ধ বিভা যেন চাঁদের আলোর মতো মায়া ছড়ায়। বৈমাত্রেয় ভগিনী হলেও কৃষ্ণ তাঁকে অপর্যাপ্ত স্নেহ করেন। ভগিনীটি তাঁর বড়োই মুখচোরা। নিজের কথা বলতেই জানেন না। এতই মধুর স্বভাব যে কাউকে এতটুকু কটুকথা শোনাননি। সেই সুভদ্রা এমন করে সত্যভামার আঁচল ধরে কেন বারবার আসছেন? ওদিকে সখা অর্জুনও তো স্থানকালপাত্র ভুলে হাঁ করে সুভদ্রাকে দেখছেন! অর্থাৎ দু’পক্ষেই নীরব একটি প্রেমের সূত্রপাত হয়েছে। 
কৃষ্ণ ভারী খুশি। আহা! অর্জুনের মতো কে আছে আর! 
রৈবতকে উৎসব শুরু হয়ে গিয়েছে। যাদব বৃষ্ণি পুরুষরা বাদ্য ও গীত সহযোগে পর্বতে আসছেন। সঙ্গে বহু লোক। পূজার উপচার ফুল মালা দীপ নিয়ে মানুষের সারি। এর সঙ্গেই আসছে অপূর্ব সজ্জায় সজ্জিত যাদব রমণীরা। তাদের পায়ের নূপুর কী সুন্দর ধ্বনি তুলছে! অর্জুন ইতিউতি চাইছেন। রৈবতকের দিকে দিকে এত মানুষ যে এখানে নির্জনতা খুঁজে পাওয়া ভার। তবু অর্জুন যেন শরবিদ্ধ হরিণ। কৃষ্ণ এখনও দর্শক। 
রৈবতকে সেদিন প্রভাস থেকে আসা নোনামিঠে হাওয়া প্রবল বেগে বইছিল। উত্তরীয় উড়ে যাচ্ছিল, কোথাও বা অবগুণ্ঠন সরে গিয়ে ব্রীড়ানম্র সচকিত হাসিতে ভরে উঠছিল প্রান্তর। হঠাৎ অর্জুন দেখতে পেলেন সুভদ্রাকে। একটি পুষ্পিত তরুতলে দাঁড়িয়ে আছেন সুভদ্রা। মুখখানি বালিকার মতো। কৌতূহল ভরে তাকিয়ে আছেন। কোথাও এতটুকু অহং নেই। ব্যক্তিত্বের ভারে গম্ভীর পাঞ্চালি নন। বরং স্নিগ্ধ ও প্রস্ফুটিত পদ্মের মতো কোমল। সুভদ্রার দানধ্যান দেখে তাঁর হৃদয়ের উদারতা টের পেয়েছেন অর্জুন। তাহলে কি আর একজন প্রার্থীকে তিনি ফেরাবেন? অর্জুন সুভদ্রার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। না, তাঁকে কিছু বলতে হল না। অবনত চোখ আর সলাজ হাসিমুখ অর্জুনকে কিছু বলতে দিল না। যেন নীরবে চোখে চোখে মনে মনে হৃদয়ের আদানপ্রদান ঘটেই গিয়েছে। অর্জুন মুখটি নামিয়ে সুভদ্রার গালে ঠোঁট ছোঁয়ালেন। আর তারপরই দু’জনে সরে গেলেন। 
আহ্লাদিত অর্জুনকে দেখে কৃষ্ণ ঠিক বুঝেছেন। ভবিতব্য কে খণ্ডাবে! পাঞ্চালির প্রখর ব্যক্তিত্ব ও খণ্ডিত অধিকার যে অর্জুনকে আঘাত করেছে সে তাঁর চেয়ে ভালো কে জানে? সুভদ্রা সেখানে সকালের নরম রোদ, খরার দিনে ঘন শ্রাবণের বর্ষণ। উলুপী ও চিত্রাঙ্গদা অর্জুনের সুখস্মৃতি। তাঁর ঘরনি চাই যে! রণে সভায় বনে ও কক্ষে তাঁর সহচরী কই? সুভদ্রা সত্যিই উপযুক্ত। তবু কৃষ্ণ চুপ করে রইলেন। কিন্তু বড়োই উতলা অর্জুন ও সুভদ্রা। 
অবশেষে সত্যভামা এলেন কৃষ্ণের কাছে। বলি, ভগিনীর অবস্থাটা কি বিবেচনা করেছ? কৃষ্ণর সপ্রশ্ন দৃষ্টি। 
সত্যভামা মুখ বাঁকালেন, আহা! রসিকচূড়ামণি, গোপীমনোহরণ, ভগিনী যে প্রেমে উন্মাদ! খবর রাখ? কৃষ্ণ যেন চমকে উঠলেন, কে সে? 
কেন? সখা অর্জুন? অমন বীরপুরুষ দ্বারকা প্রভাস রৈবতক সর্বস্থানে যথেচ্ছ ভ্রমণ করছেন, সঙ্গে আমার কপাল স্বয়ং রয়েছেন, তিনি নাকি বুঝতেই পারছেন না! এও আমাকে বিশ্বাস করতে হবে? সুভদ্রা যে আমাকে পাগল করে দিল!
কৃষ্ণ চিন্তিত মুখে বললেন, অগ্রজ বলরাম তো এ বিয়ে মানবেন না! 
কেন? সত্যভামা অবাক। তোমাদের মধ্যে তো আত্মীয়দের মাঝে সম্বন্ধ হয়! কৃষ্ণ থামালেন, সেজন্য নয়। অগ্রজ অন্যত্র বিবাহ স্থির করেছেন যে! মনে মনে। 
কার সঙ্গে? 
দুর্যোধন। 
সত্যভামা ধৈর্য রাখতে পারলেন না। বললেন, ওসব জানি না। গান্ধর্বমতে বিবাহ দিয়ে দু’জনকে রওনা করিয়ে দাও। তারপর যা হবে তুমি সামলাবে।  
শেষরাতে অর্জুন ও সুভদ্রার মিলন হল। গান্ধর্বমতে বিবাহ হল। কৃষ্ণ নিজের রথ ও সারথি দারুককে দিয়ে সুভদ্রা ও অর্জুনের যাত্রা করিয়ে দিলেন। 
ওদিকে দ্বারকায় ছড়িয়ে গিয়েছে সংবাদ। অর্জুন সুভদ্রাকে হরণ করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে কাদম্বরী পানরত মত্ত বলরাম আদেশ দিলেন, রথ অনুসরণ কর। তাঁর আদেশে যাদব ও বৃষ্ণি পুরুষরা রথের পিছনে ছুটলেন। তাঁদের রথের চাকায়, অশ্বের খুরে ধুলো ঢেকে দিচ্ছে চারদিক। এমন সময় অর্জুন তাঁর বাহুলগ্না সুভদ্রাকে বসিয়ে উঠে এলেন। সারথি দারুককে বললেন, রথের মুখ ঘোরাও। কে যেন যুদ্ধে আহ্বান করছে! যুদ্ধে আহ্বান ফেরানো ক্ষাত্রধর্ম নয় মোটেই। 
সুভদ্রাই বা কী মনে করবেন? স্বামী এমনই বীরপুরুষ যে যুদ্ধে আহ্বান উপেক্ষা করেন! এ হতে পারে না। কিন্তু বেঁকে বসলেন দারুক। তিনি জানেন অর্জুনের বাণ অপ্রতিরোধ্য। যুদ্ধ হলে হতাহত হবেই। দারুক বললেন, তা হবে না। তুমি আমারই পরিবারের লোকজনকে মারবে, তা হতে দেব না। অর্জুন তখন দারুককে রথ থেকে নামিয়ে এক পায়ে অশ্বচালনা অন্যদিকে অস্ত্র হাতে রথের মুখ ঘুরিয়েছেন। এমন সময় নম্র স্নিগ্ধ কোমল সুভদ্রা, প্রেয়সী সুভদ্রা, অর্জুনের পাশে এলেন। তারপর রথের রশিটি হাতে নিয়ে অশ্বচালনা করতে শুরু করলেন। তীব্রবেগে রথ চলছে। বিপরীতে যাঁরা আসছেন তাঁরা অবাক হয়ে দেখছেন এ যে কৃষ্ণের রথ! সোনার চূড়া! সারথি তো দারুক নন! কে রথ চালনা করছেন? সকলে সবিস্ময়ে দেখলেন, তাঁদের পরানপুতলি, স্নেহের কন্যা ও ভগিনী, সুভদ্রা রথ ছুটিয়ে আসছেন। তাঁর পিছনে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে উদ্যত অর্জুন, যদিও তিনি একটি বাণও নিক্ষেপ করছেন না। সামনে সুভদ্রা কল্যাণী মুখে একটি লজ্জিত ও স্মিত হাসি নিয়ে এগিয়ে আসছেন তাঁর পিতা পিতৃব্য ও অগ্রজদের দিকে। সাদর আলিঙ্গন বিনা এঁদের আর কী দিয়েই বা অভ্যর্থনা করা যায়! 
অতঃপর বিবাহ সম্পন্ন হল এবং অর্জুন বনবাসের শেষ একটি বছর সুভদ্রার সঙ্গে দ্বারকাতেই সুখে অখণ্ড দাম্পত্য ও প্রেমে কাটালেন। মহাভারত শেষ পর্যন্ত সুভদ্রার এই কল্যাণী মূর্তিটি এঁকে গিয়েছে। কোথাও তিনি উদ্ধত, প্রতিহিংসাপরায়ণা, বা ঈর্ষাপরায়ণা নন। তাঁর একটি কল্যাণমূর্তি পাণ্ডব বংশকে রক্ষা করেছিল। সেই রথের রশি তাঁর সংসারের হতে পারে বা জগতের মঙ্গলে প্রতিষ্ঠিত ধর্মরাজ্যেরও হতে পারে।  

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ