এ কী কথা শুনি এখন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নরের মুখে! দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা যাই হোক, গত বুধবার পরিসংখ্যান হাতে নিয়ে আরবিআইয়ের গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা দাবি করেছেন, মূল্যবৃদ্ধির হার কমতে কমতে এখন ‘নামমাত্র’। খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দাম নাকি সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যেই চলে এসেছে। এমনকী জুন মাসে সব্জি থেকে নিত্যপণ্যের দাম কমেছে ০.২ শতাংশ। আর মূল্যবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন (৩.১ শতাংশ)। গভর্নর মহাশয়ের কোনও দোষ নেই। তিনি পরিসংখ্যান হাতে নিয়ে এই দাবি করেছেন। কিন্তু তাঁর এই দাবির মধ্য দিয়ে যেটা বারবার প্রমাণিত তা হল, এ দেশে সরকারি কর্তা অনেকের সঙ্গেই মাটির কোনও যোগাযোগের প্রমাণ মেলে না। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা যে দাবি করেন, সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা হয় ঠিক তার উল্টো। ধরা যাক, এই আগস্ট মাসের কথা। সাধারণ বিবেচনায় মূল্যবৃদ্ধি কমলে বা নিয়ন্ত্রণে থাকলে খুচরো বাজারে প্রায় সব পণ্যের দাম কমার কথা। প্রভাব পড়ার কথা পাইকারি বাজারেও। কিন্তু এই ভরা শ্রাবণে কলকাতার প্রায় সব বাজারে করলা, বেগুন, ঝিঙে, লঙ্কা, শসা থেকে শাকসব্জি, ফলের দাম আগের যে কোনও সময়কে লজ্জায় ফেলে দিতে পারে। আর ভোজ্য তেলের দাম ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছে। শুধু কলকাতা নয়, নিত্যপণ্যের গনগনে আঁচে পুড়ছে দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরুর মতো অপেক্ষাকৃত আর্থিকভাবে সচ্ছল শহরের বাসিন্দারাও। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের শুকনো পরিসংখ্যানকে রীতিমতো বিদ্রুপ করে সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় জানানো হয়েছে, ভারতবাসীর একটি বড় অংশের মানুষকে খাবার জোগাড় করতেই গড়ে ৩৯ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে মহারাষ্ট্রে ঘরে রান্না করা নিরামিষ থালির গড় খরচ ৭১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের দিকে আঙুল তোলা হয়। কারণ খরা অথবা বন্যার মতো বিপর্যয় এদেশে প্রায় সারা বছরের নিত্যসঙ্গী। প্রশ্ন ওঠে, যা অবশ্যম্ভাবী তার মোকাবিলায় কেন আগাম ব্যবস্থা নেয় না কোনও সরকার? তাহলে তো ফি-বছর বিপর্যয়ের কারণে মূল্যবৃদ্ধি, তার জেরে অনাহার, অর্ধাহারের নিদারুণ ছবিটা দেখতে হয় না। মূল্যবৃদ্ধির অন্যান্য কারণগুলির মধ্যে রয়েছে পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি, সরবরাহে সঙ্কট, মুদ্রাস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে উদ্ভূত কোনও পরিস্থিতি। এর সঙ্গেই আছে ‘মধ্যস্বত্বভোগী’ দালালরাজের খেলা। মূল্যবৃদ্ধির এই অনিবার্য কারণগুলিকে সময়োচিত ও সঠিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দূর করা বা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু এদেশের গরিব-মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত মানুষের দুর্ভাগ্য যে, কেন্দ্র অথবা রাজ্য কোনও সরকারই বোধহয় সব্জি সহকারে দু’বেলা, দু’মুঠো অন্ন নিশ্চিত করার জন্য মূল্যবৃদ্ধি আটকাতে ‘যুদ্ধ’ করতে রাজি নয়। তাই সংসার চালাতে আম জনতার যতই নাভিশ্বাস উঠুক, তাদের ভাবতে বাধ্য করা হবে ‘মূল্যবৃদ্ধি’ বলে কিছু নেই! খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দাম নাকি সামর্থ্যের মধ্যেই! অথচ রেপো রেট না কমালেও রিজার্ভ ব্যাঙ্কের দাবি, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে, দাবির বাস্তবতা নিয়ে। সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা কী বলছে? আর সবই যদি ‘নিয়ন্ত্রণে’ আছে তাহলে কেনই-বা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ঘোষণার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকার শঙ্কা প্রকাশ করল যে, কিছু নিত্যব্যবহার্য সব্জির উপর নজরদারি প্রয়োজন। কারণ এগুলির দামবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্র জানিয়েছে, আলু, পেঁয়াজ, টম্যাটোর উপর সরকার নজর রাখছে।
এদেশে সারা বছরই ঘটনার ঘনঘটা। কেন্দ্র বা কোনও না কোনও রাজ্যে নির্বাচন লেগেই থাকে। কয়েক মাস আগেই পহেলগাঁওয়ে নৃশংস হত্যালীলার প্রেক্ষিতে ক্ষোভে তেতে উঠেছিল গোটা দেশ। তারপর একে একে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি ও শুল্ক-যুদ্ধ, ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন, অনুপ্রবেশের অভিযোগে প্রকৃত বাঙালিদের হেনস্তা, এনআরসির জুজু, হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের শোরগোলে সামাজিক রাজনৈতিক পরিসর মেঘাচ্ছন্ন। ভোট-সর্বস্ব রাজনীতিতে এখন যত হাতেগরম ইস্যু তৈরি হয় ততই লাভ হয় রাজনৈতিক দলগুলির। অথচ সেই স্বাধীনতার পর থেকে সাধারণ মানুষের ন্যূনতম রোটি-কাপড়া-মকানের অধিকারের ন্যায্যতা সকলে মেনে নিলেও ভোটের অঙ্কে তার কোনও নম্বর নেই! দেশের সিংহভাগ মানুষ ন্যায্য জীবনধারণের জন্য সব সামগ্রী কিনতে পারবেন, প্রত্যেক পরিবারে দু’বেলা পেটভরা খাবার নিশ্চিত করতে সরকার ঢাল হয়ে দাঁড়াবে, ‘ডোল’ বিলির পরিবর্তে স্থায়ী সমাধানের ব্যবস্থা হবে—গত আট দশকে এমনটা কল্পনাই থেকে গিয়েছে! কারণ, মূল্যবৃদ্ধির ইস্যুতে, খাবারের ইস্যুতে, পাকা বাসস্থানের ইস্যুতে, সক্ষম হাতে কাজের (চাকরি) ইস্যুতে ভোট নেওয়া কি হবে? এসব নিয়ে সাফল্য ও ব্যর্থতার দাবিতে দড়ি টানাটানি চলবে। কিন্তু নিত্যপণ্যের দাম, খাবারের অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে বছরের পর বছর। সাধারণ মানুষও থেকে যাবে সেই তিমিরেই।