Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

বন্ধ হোক ধান্দার রাজনীতি

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু তাঁদের ফাঁকা কলসির বাজনায় গুরুত্ব দেননি। ঠান্ডা মাথায় চাকরিহারাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন

বন্ধ হোক ধান্দার রাজনীতি
  • ১৮ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: কী বলা যায় একে? রাজনৈতিক ধান্দাবাজদের গালে চপেটাঘাত? ২৬ হাজার যুবক-যুবতীর চাকরি চলে যাওয়ায় উল্লাস তো কম ছিল না তাঁদের। কারণ, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ওই ধান্দাবাজরা স্রেফ রাজনৈতিক স্বার্থ দেখেছিলেন। পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মতো এই রায়কে আঁকড়ে ধরে ভোটের ইস্যু তৈরি করতে চেয়েছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু তাঁদের ফাঁকা কলসির বাজনায় গুরুত্ব দেননি। ঠান্ডা মাথায় চাকরিহারাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। শীর্ষ আদালতে আবেদন করেছেন। এবং হাজার হাজার যোগ্য শিক্ষকদের জন্য ন্যায়বিচার নিয়েও এসেছেন। এতে শুধু যে ওই চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষিকারা স্বস্তি পেয়েছেন, এমনটা নয়। অগুনতি স্কুলপড়ুয়ারও ধড়ে প্রাণ এসেছে। কয়েকজন মার্কামারা ধান্দাবাজের রাজনৈতিক ধ্যাষ্টামোয় তাদের পঠনপাঠনই নয়, রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাটাই যে লাটে উঠতে বসেছিল! আজকের রায় সেই ধান্দাবাজদের থোঁতা মুখ ভোঁতা করে দিয়েছে। যাঁরা ভেবেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পেড়ে ফেলেছি। এই ইস্যু দিয়েই ভোটে বাজিমাত করব... তাঁদের কিন্তু আজ ল্যাজ গুটিয়ে পালানোর মতো অবস্থাও নেই। 
আঁতে খুব লাগছে? এতদিন তো আপনাদের ভাবটা এমন ছিল যে, চাকরি গিয়েছে, তো কী! ওদের জন্য না হয় একটু আহা-উঁহুঁ করে দেব। রাজনৈতিক মশলার জোগান থাকলেই হবে। এদিনের রায়ে একটা বিষয় স্পষ্ট—ভোটের ধান্দাবাজিটাও এইসব বালখিল্য, সস্তার রাজনীতিবিদদের দিয়ে হয় না। কী যেন নাম? কী একটা গঙ্গোপাধ্যায় বোধহয়। ডায়ালগেই শিরোনাম— ‘ঢাকিসুদ্ধ বিসর্জন দেব।’ সে এক দারুণ হিট ডায়ালগ। ঘরে বাইরে আলোচনা। কথাও রেখেছিলেন। গোটা প্যানেল বাতিলের। কারা যেন সব আপনাকে ‘ভগবান’ ভেবে নিয়ে মাথায় বসিয়েছিল? তারা কি সেদিন বুঝেছে, আপনি আসলে রাজনীতি করছিলেন? বীজটা বপন করেছিলেন আপনি সেদিনই? কীসের বীজ? ঘৃণার। রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার। বিচারপতির আসনে বসার আগে শপথ নিয়েছিলেন না আপনি? তার প্রধান প্রতিপাদ্য কী ছিল? নিরপেক্ষতার ঊর্ধ্বে কিচ্ছু নয়। একজন নির্দোষও যেন শাস্তি না পায়। আর আমরা কী দেখলাম? আপনি রাজ্যের ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকাকে পথে বসিয়ে দিলেন। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা আপনাদের মতো ভণ্ডামির চাদর গায়ে দেওয়া নেতাদেরই তেল দিয়ে থাকি। ভুলে যাই, বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস বা তৃণমূল—দলের নাম যা খুশি হতে পারে। সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার আপনাদের কেউ দেয়নি। মানুষকে ঘুঁটি বানিয়ে স্বার্থসিদ্ধির থলে ভরাটা আসলে ‘ভদ্রলোকের চুরি’। আমরা সেটা দেখেও দেখি না। অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো আপামর রাজনৈতিক স্বার্থজীবী তাই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করতে পারেন, ‘যাঁরা অযোগ্য তাঁদের চাকরি আমি খেয়েছিলাম। আপাতত তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের সামান্য অর্ডারে বেঁচে আছেন। আশা করছি, খুব শীঘ্রই তাঁরা মারা যাবেন।’ 

Advertisement

তারপরও তিনি এমপি! আমরা তাঁকেই ভোট দিই! আইনজীবীর শামলা গায়ে জড়িয়ে ন্যায় বিচারের আশ্বাস দেন সিপিএমের ধ্বজাধারী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। কিন্তু তিনিও দাঁড়ান ঢাকিসুদ্ধ বিসর্জনের দলে। হাজার হাজার চাকরি খেয়ে আমোদ পান। পরামর্শ দেন, ‘রায় রিভিউয়ের আবেদন করবেন না। লাভ হবে না।’ আবার বিরোধী দলনেতার চেয়ারে বসে নিজেকে কেউকেটা ভেবে নেন একজন। প্রকাশ্যে বলেন, ‘ওদের মুসলিম বিধায়কদের চ্যাংদোলা করে রাস্তায় ফেলব’... তারপরও তাঁর অনুগামীর নাকি শেষ নেই!
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হওয়াটাই সুনাগরিকের কর্তব্য। কিন্তু আপনাদের তো সাধারণ মানুষের ক্ষতিতে ফূর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ! আপনাদের মতো বাঙালিরাই বাংলাকেই পদে পদে হেনস্তা করে আদিম সুখ পেয়ে থাকেন। আর এ রাজ্যেরই কিছু মানুষ আগুপিছু না ভেবে আপনাদের স্বার্থসিদ্ধির ডিমে তা দেয়। সেই সারজলে আপনারা আরও ফুলেফেঁপে ওঠেন। একবারও ভেবে দেখেন না, এভাবে বাংলার কতবড় সর্বনাশ করছেন আপনারা। সুপ্রিম কোর্ট যখন বলেছে, গোটা প্যানেল বাতিল করব, তখন একজোট হয়ে দাঁড়িয়ে একবারও বলেন না, ‘হুজুর দয়া করে এমনটা করবেন না। এতে একজন হলেও নির্দোষের চাকরি যাবে। শিক্ষা ব্যবস্থা ধসে যাবে!’ কারণ, আপনারা রাজনীতি খুঁজেছিলেন। আজ যখন স্রেফ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচার বের করে আনা ভদ্রমহিলার নীল-সাদা হাওয়াই চটি আপনাদের গালে সপাটে পড়ে, তখন কি একবারের জন্যও কাতর চাকরিহারা মুখগুলো মনে আসে? আপনারা শিক্ষকদের রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভেবেছেন তাঁদের পরিবারের কথা। ভবিষ্যতের কথা। তফাৎটা বোঝার জন্য আইনস্টাইন হতে হয় না। আর সাধারণ মানুষও সেটা বোঝে। তাই আজ অন্তত ভুলটা স্বীকার করুন। মাথা নিচু করুন ওই শিক্ষকদের সামনে, যাঁদের আপনারা ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধিতে অনুঘটক হিসেবে ঢেলে গিয়েছেন। বিরোধীরা গণতন্ত্রের শক্তি, যতক্ষণ না তাদের রাজনীতি নোংরামোর পর্যায়ে নেমে আসে। জেনে রাখবেন, সস্তার রাজনীতি দিয়ে ভোটে জেতা যায় না। আগে মানুষের আস্থা অর্জন করুন। আর সেটা সম্ভব মানুষের জন্য কাজ করলে। বাঙালিকে ভাতে মারলে কখনও বাংলার সমর্থন পাবেন না। রাজনীতির ধুয়ো তুলে শুধু খোল-করতালই বাজাতে হবে। কেষ্ট মিলবে না।     

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ