হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত: আন্দামান আর সেলুলার জেল, এ দু’টি শব্দ প্রায় সমার্থক, অন্তত বাঙালিদের কাছে। পোর্ট ব্লেয়ারের নতুন নামকরণ করা হয়েছে ‘শ্রীবিজয়পুরম’ আর সেলুলার জেল এখন দর্শনার্থীদের জন্য ‘জাতীয় স্মারক স্থল’। দেশের অন্যান্য মানুষদের চেয়ে বাঙালিদের কাছে খানিক বেশি আবেগ শ্রদ্ধার জায়গা কালাপানির এই সেলুলার জেল। কারণ, স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালির আত্মবলিদানের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে কুখ্যাত এই জেল।
এককালে বাঙালি অধ্যুষিত ছিল আন্দামান, বিশেষত পোর্ট ব্লেয়ার। জীবিকা অর্জনের জন্য বহু বাঙালি এসেছে এখানে, দেশ বিভাগের পর ছিন্নমূল বাঙালিদেরও এ জায়গায় আশ্রয় দিয়েছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার। বর্তমানেও পোর্ট ব্লেয়ার সহ হ্যাভলক, নীল আইল্যান্ডে বাঙালির সংখ্যা যথেষ্ট।
সাধারণত সেলুলার জেল দর্শনের সব থেকে ভালো সময় শেষ দুপুর। কারণ, এ সময় গেলে সেলুলার জেল ঘুরে দেখার পর সন্ধ্যার ‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড’ শো দেখে ফেরা যায়। মাঝে অবশ্য এক ঘণ্টার জন্য বাইরে বেরিয়ে আসতে হয় শো শুরু হওয়ার আগে। কারণ, এই স্মারক স্থল পরিদর্শন আর লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো দেখার জন্য টিকিটের ব্যবস্থা আলাদা বলে। মাঝের এই এক ঘণ্টা সময় অনায়াসেই কাটিয়ে দেওয়া যায় সেলুলার জেলের প্রবেশ তোরণের সামনের রাস্তার ঠিক উল্টো দিকের পার্কে বসে বিশ্রাম নেওয়াই যায়।
হিসাব করে এবারও আমি ওই শেষ দুপুরেই গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম সেলুলারের প্রবেশ তোরণের কাছে। এখানে দর্শনার্থীদের আসা-যাওয়া সব সময়ই থাকে। রাস্তার যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও দর্শনার্থীদের পারাপার ইত্যাদি সুবিধা প্রদানের জন্য পুলিসকর্মীরাও থাকেন। তোরণের গায়ে বা সামনের অংশে টিকিট কাউন্টার দেখতে না পেয়ে তা কোথায় জানার জন্য সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক পুলিসকর্মীর দিকে এগিয়ে গেলাম। সেই তরুণ পুলিসকর্মীর বুকের ফলকে যে নাম-পদবি লেখা আছে তা নিখাদ বাঙালি। তাকে টিকিট কাউন্টার কোথায় জিজ্ঞাসা করাতে তিনি সে জায়গা কোথায় আমাকে দেখিয়ে দিলেন, আরও বেশ কিছু খবর দিলেন এ জায়গা সম্বন্ধে। জন্মসূত্রে বাঙালি হলেও সেই যুবক পুলিসকর্মী কিন্তু আমার প্রতিটা প্রশ্নের জবাবই দিলেন হিন্দিতে। এর পিছনে একটা কারণ আছে। আগেরবার যখন পোর্ট ব্লেয়ারে বইমেলায় এসেছিলাম, তখন স্থানীয় বাঙালি ক্লাবের প্রবীণ কর্তা ব্যক্তিদের আক্ষেপের স্বরে বলতে শুনেছিলাম, তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম বাংলার পরিবর্তে হিন্দি ভাষাকেই বেছে নিচ্ছেন পড়াশোনা থেকে শুরু করে কথাবার্তা বলার জন্য। নতুন প্রজন্মর একটা বড় অংশই বাংলা বুঝতে পারলেও পড়তে পারেন না, এমনকী অনেকে বলতেও পারেন না। যাইহোক, ওই পুলিসকর্মীর কথা মতো এগলাম টিকিট কাউন্টারের দিকে।
কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আন্দামান-নিকোবরের রাজধানী পোর্ট ব্লেয়ার বা বর্তমান শ্রীবিজয়পুরমে ব্রিটিশরা এসে থাকতে শুরু করে অষ্টাদশ শতকে। তাঁদের প্রথম প্রশাসনিক কর্মক্ষেত্র ছিল কাছেই রস আইল্যান্ডে। পরবর্তীতে যা স্থানান্তর করা হয় পোর্ট ব্লেয়ারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিরা ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপটি কিছুকালের জন্য দখল নিয়েছিল। সে সময়কালও এখানকার মানুষদের জন্য সুখকর ছিল না। কারণ, জাপানিরা বহু মানুষকে এখানে সে সময় ব্রিটিশ গুপ্তচর সন্দেহে হত্যা করে, জেল বন্দি করে। পরবর্তীকালে অবশ্য তারা বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হয় এই দ্বীপগুলি ব্রিটিশদের ফিরিয়ে দেয়। সেই সময়ের স্মৃতি চিহ্ন হিসাবে রস আইল্যান্ডে এখনও একটা জাপানি বাঙ্কার দেখতে পাওয়া যায়।
টিকিট সংগ্রহ করে এগলাম সেলুলার স্মৃতি স্মারকের প্রবেশ তোরণের দিকে।
সেলুলার জেল নির্মাণের প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে থেকেই রস আইল্যান্ড, ভাইপার আইল্যান্ড প্রভৃতি দ্বীপগুলোকে বন্দি শিবির, বলা ভালো নির্যাতন শিবির হিসাবে ব্যবহার করতে শুরু করেছিল ব্রিটিশরা। সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা সিদ্ধান্ত নেয় কিছু বন্দিকে এমন কোনও ভয়াবহ জায়গাতে নির্বাসিত করতে হবে, যা আতঙ্ক ছড়াবে ব্রিটিশ বিরোধী ভারতীয়দের মনে। তারা নির্বাচন করেন এই দ্বীপপুঞ্জকে! সিপাহি বিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত থাকা ও বাহাদুর শাহের সঙ্গে সংযোগ রক্ষার অপরাধে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ জেলার ডেভিড ব্যারির নেতৃত্বে দু’শোজন বন্দিকে নিয়ে প্রথম জাহাজ এসে নোঙর করে এই দ্বীপপুঞ্জে। রেভারেন্ট করবিনকে দিয়ে ‘আন্দামানিস হোম’ নামে এক দাতব্য প্রতিষ্ঠানও খোলা হয় এখানে। যা প্রকৃতপক্ষে ছিল ছদ্মবেশধারী এক পীড়ন প্রতিষ্ঠান। তখনও কিন্তু সেলুলার জেল তৈরি হয়নি। কিন্তু মূল ভূখণ্ডে যখন ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, তখন একটা বড় জেল তৈরির প্রয়োজন হয়ে পড়ে শাসকদের কাছে। কারণ, তাঁরা অনুমান করতে পারে আরও বিপ্লবীদের নিয়ে আসতে হবে এখানে। আরও কয়েকটি কারণ ছিল এক সুগঠিত জেল নির্মাণের পিছনে। প্রায়শই অন্য দ্বীপ থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত বন্দিরা। তাছাড়া, আরও একটা বড় ঘটনা ঘটেছিল সে সময়। ১৮৭২ সালে ভাইসরয় লর্ড মেয়ো যখন আন্দামান পরিদর্শনে আসেন তখন শের আলি আফ্রিদি নামের এক বন্দি তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন। এত বড় রাজপুরুষ হত্যা ব্রিটিশ শাসনকালে তার আগে বা পরে আর কোনওদিন ঘটেনি। ভাইপার আইল্যান্ডে আফ্রিদিকে ফাঁসি দেওয়া হয় ঠিকই, কিন্তু এ ঘটনা কাঁপন ধরায় ব্রিটিশদের মনে। ছোট জেলে বা উন্মুক্ত কলোনিতে বন্দিদের রাখতে আর সাহস পাননি তারা। ১৮৯০ সালে ব্রিটিশ রাজ কর্মচারী জেমস ল্যান ও চিকিৎসক ল্যাথব্রিজ আন্দামান পরিদর্শন করে পোর্ট ব্লেয়ারের এই স্থান নির্বাচন করেন নতুন জেল নির্মাণের জন্য। ১৮৯৬ সালে পোড়া মাটির ইট দিয়ে শুরু হয় জেল নির্মাণের কাজ, শেষ হয় ১৯০৬ সালে। জন্ম হয় ভারত উপমহাদেশের কুখ্যাততম জেল।
টিকিট কাটার পর প্রবেশ তোরণ অতিক্রম করে প্রবেশ করলাম সেলুলার জেলের অভ্যন্তরে। সামনেই একটা প্রশস্ত প্রাঙ্গণ। তার গায়ে দু’পাশে দাঁড়িয়ে আছে লোহার রেলিং আর টানা বারান্দা সমন্বিত তিনতলা কারাগারের দু’টি শাখা। এমন সাতটি শাখা দিয়ে নির্মিত হয়েছিল এই কুখ্যাত কারাগার। চল্লিশের দশকের ভূমিকম্পে নষ্ট হয় তার একটি, জাপানিরা দুটো শাখা ভেঙে দেয়, স্বাধীনতার পর দুটি শাখা ভেঙে দেওয়া হয় সে স্থানে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য। প্রবেশ তোরণ অতিক্রম করে যে প্রাঙ্গণ আছে, সেখানে বর্তমানে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো দেখার বসার আসন পাতা থাকে। বন্দিদের ব্যবহৃত জিনিস দিয়ে একটা ছোট মিউজিয়াম আছে যে জায়গা এক সময় ব্যবহৃত হতো বন্দিদের হাজিরার জায়গা হিসাবে। ওখানে একটা বেদিও আছে। লোহার কাঠামো যুক্ত সেই বেদিতে দাঁড় করিয়ে বেঁধে বন্দিদের চাবুক মারা হতো। যাতে সে দৃশ্য আশপাশের সেলের অন্য বন্দিরা দেখতে পান, তাঁরা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন সে জন্য।
এগলাম সেলগুলো ঘুরে দেখার জন্য। সেলের বারান্দায় ওঠার আগেই ডান হাতে একটা প্রাচীর ঘেরা ছোট জায়গা আছে। সেলুলার জেল এমন একটা জায়গা যেখানে প্রবেশ করলে বিপ্লবী, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কথা স্মরণ করে মন যেমন গর্বে ভরে ওঠে, ঠিক তেমনই তাদের ওপর নিদারুণ পৈশাচিক অত্যাচারের কথা ভাবলে বিষণ্ণতায় মন আচ্ছন্ন হয়ে যায়। প্রাচীন ঘেরা জায়গার ভিতর একটা কাঠের ছোট ঘর আছে। গ্যালোজ বা ফাঁসি ঘর। বাইরে থেকে উঁকি মেরে দেখা যায় ভিতরটা। ভিতরের দেওয়ালের রং সবুজ। কাঠের পাটাতন বিছানো মেঝে। তার ওপর পরপর তিনটে গোল চিহ্ন আঁকা মানুষকে দাঁড় করাবার জন্য। তাদের মাথার ওপর এখনও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ঝুলছে ফাঁসির দড়ি বা ম্যানিলা রোপ। ঘরের কোণে একটা লোহার হাতল আছে। ফাঁসির দড়ি গলায় পরিয়ে ওই লোহার হাতল বা লিভার টেনে দিলেই পায়ের নীচের কাঠের পাটাতন সরে যেত। ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান গেয়ে দেশ মাতৃকার জন্য শহিদ হতেন বিপ্লবীরা। অনেক সময় এখানে যাকে ফাঁসি দেওয়া হল তাঁর খবর বাইরের লোক বা জেলের অন্য বন্দিরাও জানতে পারতেন না। কারণ, বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নয়, জেলার বা ব্রিটিশ শাসকদের মৌখিক নির্দেশে ফাঁসি দেওয়া হতো। তারপর তাঁর দেহটা বস্তাবন্দি করে তাতে পাথর ভরে বোটে করে নিয়ে গিয়ে ফেলে আসা হতো গভীর সমুদ্রে। জেলের রেজিস্টার বুকে শুধু আইন রক্ষার জন্য লেখা হতো, একজন বন্দি নিখোঁজ হয়ে গেছেন। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম ফাঁসি ঘরের সামনে। অন্য যাঁরা দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁরাও আমারই মতো নিস্তব্ধ। কারও চোখ ছল ছল করছে। যাঁদের এখানে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল তাঁদের কাউকে আমরা কেউ কোনওদিন দেখিনি, হয়তো বা খুব বেশি হলে তাঁদের কারও নাম কখনও পড়ে থাকতে পারি ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু এ জায়গাতে এসে দাঁড়ালে কেমন যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক অনুভূত হয় সেই সব অজানা মানুষদের প্রতি।
ফাঁসি ঘর ছেড়ে উঠে এলাম এক তলার কারাকক্ষের বারান্দাতে। টানা বারান্দার একপাশ লোহার গরাদ দিয়ে ঘেরা। অন্য পাশে সার সার কক্ষ। আধো অন্ধকার সেই সব খোপ খোপ কক্ষগুলোতে কোনও জানলা নেই। শুধু পিছন দিকের দেওয়ালের মাথার ওপর একটা করে ছোট ঘুলঘুলি আছে। সামনে লোহার গরাদ বসানো এক ফালি দরজা। তার ভিতর দিয়েই যতটুকু আলো-বাতাস প্রবেশ করার তা করত। একটা সেলের ভিতরে ঢুকে কয়েক মিনিট দাঁড়াতেই কেমন যেন দমবন্ধ হয়ে আসতে লাগল। অথচ এ সব সেলে দিনের পর দিন বছরের পর বছর কাটিয়েছেন স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। জাহাজে যে সব চটের বস্তায় নুন, চিনি আসত। সে সব বস্তাতে আলকাতরার প্রলেপ লাগিয়ে পোশাক বানিয়ে সে পোশাক পরতে বাধ্য করা হতো বন্দিদের। হাওয়া-বাতাসহীন কক্ষে প্রচণ্ড গরমে সে পোশাক পরে কাটাতে হতো বিপ্লবী, দেশপ্রেমিকদের। প্রচণ্ড শারীরিক যন্ত্রণার সঙ্গে মানসিক যন্ত্রণাও দেওয়া হতো মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য। কেউ কেউ সেই অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য না করতে পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিতেন। যেমন নিয়েছিলেন বিপ্লবী ইন্দুভূষণ রায়। নিজের পরনের ইজের দিয়ে দড়ি বানিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়েছিলেন তিনি। কেউ কেউ আবার অত্যাচার সহ্য না করতে পেরে মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলতেন। যা ঘটেছিল বিখ্যাত বাঙালি বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের ক্ষেত্রে। চোদ্দো বছর সেলুলার জেলে প্রচণ্ড মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা পেয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন তিনি। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও আর তিনি সুস্থ হননি।
একতলার অলিন্দ থেকে সিঁড়ি দিয়ে দোতালা বা তিনতলায় উঠে আসা যায়। প্রতিটা তলের গঠনই একইরকম। গরাদ ঘেরা টানা বারান্দা আর গায়ে ছোট ছোট আলো-বাতাসহীন ঘর। এক জায়গায় একটা কক্ষের মধ্যে একটা লোহার কাঠামো আছে। যাকে ‘পিলারি’ বলা হয়। তাতে শিকল দিয়ে আটকে বন্দিদের বিবস্ত্র করে পিঠে চাবুক মারা হতো। আমি হিটলারের ডাচাউ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের ছবি ও বিবরণ পড়েছি, কম্বোডিয়ার নমপেনে গিয়ে নিজের চোখে দেখেছি স্বৈরচারী কমিউনিস্ট শাসক পল পটের কারাগার ও কিলিং ফিল্ড। কিন্তু তাদের চেয়ে বিভৎসতায় কোন অংশে কম যেত না এক সময় এই সেলুলার জেল।
ধূলি ধূসর অলিন্দ আর সেলগুলো দেখলে বুকের ভিতর এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ অনুভূত হয়। এই নির্জন সেলগুলির কোনও একটিতেই হয়তো থাকতেন, ওয়াড্রেনদের চাবুকের ঘা সহ্য করে এই অলিন্দে দাঁড়িয়েই একদিন ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনিতে সারা জেল কাঁপিয়ে তুলতেন বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্ত, বারীন ঘোষ, হেমচন্দ্র কানুনগোরা। জেলের প্রকোষ্ঠ, নির্জন অলিন্দে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে মনে পড়ে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের লেখা ‘ওরা, বীর, ওরা আকাশে জাগাত ঝড়/ ওদের কাহিনী বিদেশীর খুনে/ গুলি বন্দুক বোমার আগুনে, আজও রোমাঞ্চকর।’ ওপর তলায় এক বৃত্তাকার কক্ষের দেওয়ালে মর্মর ফলকে যারা এখানে বন্দি ছিলেন তাদের নামের তালিকা লেখা আছে। যার মধ্যে সত্তর শতাংশ নামই বাঙালির। উল্লাসকর দত্ত থেকে মুজফ্ফর আহমেদ সহ চেনা-অচেনা কত বিপ্লবীদের নাম! ইন্দুভূষণ রায়ের মতো কোনও কোনও নামের হয়তো আর কোনও দিন ঘরে ফেরা হয়নি। সে সব নাম আজ আমরা স্বাধীন ভারতের নাগরিকরা মনে রাখিনি।
হুইসেলের শব্দে সংবিত ফিরল এবার বাইরে বেরতে হবে। জেলের বাইরে বেরিয়ে কিছু সময় পর আবার ভিতরে প্রবেশ করে আসন গ্রহণ করা লাইট অ্যান্ড সাউন্ড দেখার উদ্দেশে। আলো আর ধ্বনির খেলায় ফুটে ওঠে কালাপানির ইতিহাস, দেওয়ালের গায়ে আর টাঙানো পর্দায় ভেসে ওঠে চলমান ছবি। ধারা বিবরণীর সঙ্গে সঙ্গে কখনও কোন কুঠুরি থেকে ভেসে আসা ভারী বুট আর চাবুকের শব্দ, বন্দিদের আর্তনাদ আর বন্দেমাতরম ধ্বনি। শো শেষ হয় জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে। উঠে দাঁড়িয়ে নত মস্তকে সবাই গলা মেলাই তার সঙ্গে।