


তেহরান: আশঙ্কার কারণ ছিলই। যতটা ভূ-রাজনৈতিক, ততটাই অর্থনৈতিক। আর ইজরায়েল-ইরান যুদ্ধে আমেরিকার ‘যোগদান’ মাত্র এই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা আরব দুনিয়াতেই। তার কারণ, ভৌগোলিক অবস্থান। ইরান সীমান্তকে রক্ষা করছে পারস্য উপসাগর এবং স্ট্র্যাটেজিক হরমুজ প্রণালী। আর এই ফালি জলপথের ঠিক বিপরীতের উপকূল ধরে একে একে অবস্থান কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং ওমানের। একদিকে ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে হামলা। আর অন্যদিকে ইরানের হুমকি, ‘এবার প্রত্যেক মার্কিন নাগরিক আমাদের নিশানায়।’ যুদ্ধের মোড় ঘোরার সূত্রপাত এখান থেকেই। কারণ, পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিতে সবমিলিয়ে মোট ১৯টি ঘাঁটি রয়েছে আমেরিকার। আর সবক’টাই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার মধ্যে। সোমবার রাতেই তার নমুনা দেখিয়ে দিয়েছিল ইরান। প্রথমে সিরিয়া, আর তারপর কাতারের মার্কিন সেনাঘাঁটিতে আছড়ে পড়েছিল মিসাইল। কাতারে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানায় ছিল মার্কিন আল উদেইদ এয়ারবেস। সেন্টকম, অর্থাৎ মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের হেডকোয়ার্টার। দোহার ঠিক পাশেই মরুভূমিতে অবস্থিত। এই বায়ুসেনা ঘাঁটি ধ্বংস হয়ে গেলে ক্ষতি শুধু আমেরিকার নয়। কাতারেরও। আরব দুনিয়ার বাকি দেশও তখন নড়েচড়ে বসে। শুরু হয় পাল্টা ‘প্রেশার পলিটিক্স’। থামাতে হবে ইরানকে। সেটা বেশ কঠিন। আর তাই সবার আগে থামাতে হবে আমেরিকাকে। যেভাবে হোক ‘স্থিতাবস্থা’য় ফেরাতে হবে পশ্চিম এশিয়াকে।
বিরোধিতা করলে ইরাক, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং আমিরশাহির তেল ও গ্যাসের ভাণ্ডার ধ্বংস করে দেব—এই হুঁশিয়ারি ইরান দিয়েই রেখেছে। এই দেশগুলির যাবতীয় ভাণ্ডার পারস্য উপসাগর লাগোয়া হওয়ায়, ইরানের পক্ষে এই পদক্ষেপ মোটেও অসম্ভব নয়। সবটাই তাদের পাল্লার মধ্যে। প্রত্যেকটা দেশই বুঝে গিয়েছিল যে, প্রথম লক্ষ্য মার্কিন সেনাঘাঁটি হতে পারে। পরবর্তী নিশানা হবে তেল-গ্যাসই। তাহলে এই সবক’টি দেশই অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাবে। অথচ, ইরানের এতটুকু ক্ষতিও তারা করতে পারবে না। আর এই ধ্বংসলীলা শুরু হলে গোটা বিশ্বের জ্বালানি অর্থনীতি ধসে যাবে। আরব দুনিয়া থেকে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেল রপ্তানি হয় বিশ্বজুড়ে। তাই নড়েচড়ে বসেছিল আন্তর্জাতিক মহলও।
সূত্রের খবর, ইরান প্রথমেই চাপ দেয় কাতার, সৌদি এবং ওমানকে। সাফ জানিয়ে দেয়, মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আপনারা বোঝান। আমেরিকাকে পিছু হটতে হবে। আর সেইসঙ্গে ইজরায়েলের উপরও যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ দিতে হবে। সেটা উনিই পারবেন। পশ্চিম এশিয়ার প্রত্যেক রাষ্ট্রনেতা এবং কূটনীতিকদের কাছে বিকল্প পথ ছিল না। শীর্ষ রাষ্ট্রীয় স্তরে শুরু হয়ে যায় ফোন। তাঁরা বলেন, পরমাণু ক্ষেত্রে সমঝোতার রাস্তায় হাঁটতে ইরান রাজি। কিন্তু যুদ্ধ থামাতে হবে। মূলত কাতার এবং ওমানকেই মধ্যস্থতার দায়িত্ব দিয়েছিল তেহরান। কয়েকটি ফ্যাক্টর এক্ষেত্রে ইরানকে চরম আগ্রাসী অবস্থানে নিয়ে গিয়েছে। প্রথমত, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার তোড়জোড়। দ্বিতীয়ত, সৌদি আরবের মতো দেশগুলির মধ্যে আশঙ্কার বাতাবরণ তৈরি করা। যাতে তারা ট্রাম্পকে চাপ দিতে পারে যে, এখনই ব্যবস্থা না নিলে আমেরিকার সঙ্গে সব সম্পর্ক তারা ছিন্ন করবে। তৃতীয়ত, আরব দুনিয়ার দেশগুলিতে হিজবুল্লা, হুথির মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিদের সক্রিয় করে তোলা। ইরানের পাশে দাঁড়ানো ছাড়া গতি ছিল না আরব দুনিয়ার। এখানেই শেষ নয়। চাপ বেড়েছে আমেরিকার অন্দরেও। একে মার্কিন নাগরিকদের বিক্ষোভ—সাধারণের করের টাকায় ইরানে যুদ্ধ চলবে না। তার উপর ক্ষুব্ধ মার্কিন কংগ্রেস। কেন কংগ্রেসের অনুমোদন না নিয়ে হামলা চালিয়ে দিলেন প্রেসিডেন্ট! এটা অসাংবিধানিক। আমেরিকার অন্তর্বর্তী নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বহু রিপাবলিকানও। ঘরে-বাইরে এই চাপের ফলেই কি তড়িঘড়ি ব্যাকফুটে চলে গেলেন ট্রাম্প? এই প্রশ্ন কিন্তু আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। তাহলে এই যুদ্ধের আপাত বিরতির মুহূর্তে দাঁড়িয়ে জয়ী কিন্তু একটি দেশকে মনে হচ্ছে—ইরান!