বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: জিএসটি আদায়ে বরাবরই প্রথম সারির রাজ্যগুলির তালিকায় আছে পশ্চিমবঙ্গ। ফি বছর এই পণ্য ও পরিষেবা কর বাবদ রাজস্ব আদায় বাড়লেও কর আদায়ে ঢিলেমি দিতে নারাজ রাজ্য প্রশাসন। জিএসটি আইন সুষ্ঠুভাবে বলবৎ করার লক্ষ্যে বছরভর বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হানাদারি বাড়াচ্ছে রাজ্য অর্থদপ্তর। তাতে ফলও ফলছে হাতেনাতে, দাবি করছেন বাণিজ্য কর সংক্রান্ত ডিরেক্টরেটের কর্তারা। তাঁদের দাবি, গত অর্থবর্ষ, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে প্রায় ৭,৩০০টি জায়গায় হানা দিয়েছেন রাজ্য সরকারি কর্তারা। তার জেরে রাজ্যের ভাঁড়ারে এসেছে ২,৪০০ কোটি টাকারও বেশি।
আইনের ফাঁকফোঁকরকে কাজে লাগিয়ে জিএসটি প্রতারণা নতুন নয়। নিত্যনতুন কায়দায় রাজস্ব লুটের জাল বিছোচ্ছে প্রতারকরা। জিএসটি ফাঁকির হারও বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। সেই কারণেই প্রতারণা ও ফাঁকি রুখতে গত অর্থবর্ষের গোড়া থেকেই কোমর বেঁধে নেমেছিলেন রাজ্যের জিএসটি কর্তারা। তাঁদের কথায়, গত দু’বছর ধরেই রাজ্যে এই সংক্রান্ত নজরদাড়ি অনেকটাই বাড়ানো হয়েছে। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষের তুলনায় সেই নজরদারি আরও বেশি ছিল। কখনও নথির উপর নজর রেখে, আবার কখনও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের দরজায় হাজির হয়ে জিএসটি ফাঁকি রুখেছেন কর্তারা। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে রাজ্যজুড়ে মোট জিএসটি হানাদারি চলেছিল প্রায় ৬,৯০০টি। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে সেই সংখ্যা প্রায় ৭,৩০০। এর মধ্যে ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বিভাগের তরফে হানাদারি হয় প্রায় তিন হাজার জায়গায়। আদায় হয় প্রায় ৮৪৫ কোটি টাকা। এছাড়া দপ্তরের আঞ্চলিক স্তরে ছড়িয়ে থাকা অফিসগুলি থেকে আলাদা আলাদাভাবে প্রায় ৪,৩০০ জায়গায় হানা দেন কর্তারা। এখান থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় হয় সাড়ে পাঁচশো কোটি টাকার বেশি।
জিএসটি প্রতরণার একটি সাধারণ কৌশল হল ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট প্রতারণা। কাগুজে সংস্থায় ভুয়ো লেনদেন দেখিয়ে সরকারের ভাঁড়ার থেকে ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট বাবদ টাকা আদায় করে নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে প্রায় গোটা দেশজুড়েই। দপ্তরের কর্তরা জানিয়েছেন, বিভিন্ন সূত্র থেকে গত অর্থবর্ষে এই ধরনের জালিয়াতি ধরা পড়েছে প্রায় ৯৯০টি। সেখান থেকে সরকারের রাজস্ব ফেরানো গিয়েছে প্রায় ২৩০ কোটি টাকা।
জিএসটিতে ভুয়ো রেজিস্ট্রেশন রুখতে গত অর্থবর্ষ থেকেই আধার যাচাইকরণ শুরু করে সরকার। অর্থাৎ কাগুজে নথি নিয়ে যে সংস্থাগুলি জিএসটি রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন করছে, তারা বাস্তবে আদৌ আছে কি না, তা জানার জন্য সংস্থার কর্তাদের আধার যাচাই শুরু হয়। তাতে যে ফলও মিলেছে হাতেনাতে, সে-কথা জানাচ্ছেন বাণিজ্য কর বিভাগের কর্তারা। তাঁদের কথায়, আগে যেখানে প্রতিমাসে গড়ে আট হাজার সংস্থা জিএসটি রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন করত, এখন তা গড়ে পাঁচ হাজারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ অসৎ উদ্দেশ্যে যে সংস্থাগুলি রেজিস্ট্রেশন নিতে চাইত, তাদের অনেকটাই বাগে আনা গিয়েছে, দাবি করেছেন কর্তারা। যারা রেজিস্ট্রেশন পাচ্ছে, তারাও সব নিয়ম মেনে যথাযথভাবে জিএসটি প্রদান করছে কি না, সেই ব্যাপারেও নজরদারিতে আরও কঠোর হচ্ছে সরকার। আর তাতেই লক্ষ্মী আসছে প্রশাসনের ঘরে।