সংবাদদাতা, কাটোয়া: ট্রেনে বাংলায় কথা বলছিলেন। হিন্দি ভাষা জানতেন না। সেই ‘অপরাধে’ই পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রামের তিন যুবক ও মুর্শিদাবাদের দু’জনকে ছত্তিশগড়ে ট্রেন থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে হেনস্তা ও আটকে রাখার অভিযোগ উঠল। ওই পরিযায়ী শ্রমিকরা দু’দিন ধরে বিজেপিশাসিত ছত্তিশগড়ে লকআপে রয়েছেন। কার্তিক দাস, রতন দাস ও রাকেশ দাস নামে কেতুগ্রামের ওই তিন যুবকের পরিবার ঘটনার খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁদের সঙ্গে মুর্শিদাবাদ জেলার সালারের মাখালতোড়ের বাপ্পা দাস ও দত্তবরুটিয়া গ্রামের অভিজিৎ দাসও আটকে রয়েছেন। বাঙালি হলেই ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্তায় জেলা তথা রাজ্যজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে।
কেতুগ্রামের বিধায়ক শেখ শাহনেওয়াজ বলেন, পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছি। ওই তিন শ্রমিককে ফেরানোর চেষ্টা করছি। বিজেপিশাসিত রাজ্যে বাংলায় কথা বললেই হেনস্তা ও মারধর করা হচ্ছে। আমাদের রাজ্যেও তো অনেক অবাঙালি মানুষ রয়েছেন। আমরা তো তাঁদের সম্মান দিই। বিজেপি বাংলা দখল করতে না পেরে বাঙালিদের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে।
জেলার ওই তিন পরিযায়ী শ্রমিক কেতুগ্রাম-২ ব্লকের গঙ্গাটিকুরি পঞ্চায়েতের ঝামটপুর গ্রামের বাসিন্দা। মুর্শিদাবাদের সালারের দুই যুবকের সঙ্গে ট্রেন ধরে সুরাটে কাজে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। তাঁরা সেখানে রুটির ভাটিতে কাজ করেন। অভিযোগ, বাংলায় কথা বলায় ছত্তিশগড়ের রায়পুর স্টেশনে আরপিএফ তাঁদের ট্রেন থেকে নামিয়ে দেয়। তাঁদের দু’দিন ধরে লকআপে আটকে রাখা হয়েছে। কার্তিক কোনওমতে বিষয়টি বাড়িতে জানানোর পর তাঁদের মোবাইলও কেড়ে নেওয়া হয়।
ঝামটপুরের দাসপাড়ার বাসিন্দা পূর্ণ দাস ও সুখীদেবীর একমাত্র ছেলে কার্তিক দাস। পূর্ণবাবু বলেন, আমি সাইকেল সারানোর দোকানে কাজ করি। ছেলেটা গ্রামের দু’জনের সঙ্গে কাজে যাচ্ছিল। এর আগেও আমার ছেলে রুটির ভাটিতে কাজ করেছে। কিন্তু ট্রেনে বাংলায় কথা বলায় ছত্তিশগড়ের পুলিশ আটকে রেখে দিয়েছে। একই পাড়ার বাসিন্দা মিঠুন দাস ও অর্পিতা দাসের ছেলে রতন দাস। অর্পিতাদেবী বলেন, ছেলেটা ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। তারপর টাকার অভাবে আর পড়াতে পারিনি। আমরা গরিব, খেটে খাওয়া মানুষ। ট্রেনে বাংলায় কথা বলা কি অপরাধ? ছেলেকে ফেরত চাই। রাকেশের বাবা বাণেশ্বর দাস ও মা কল্যাণীদেবীও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না।
ঝামটপুর গ্রামের বাসিন্দা জ্যোৎস্না দাস, মালতি দাস বলেন, আমরা দিনমজুরি করে সংসার চালাই। ছেলেরা দু’টো পয়সার জন্যই অন্য রাজ্যে শ্রমিকের কাজে যাচ্ছে। তাদের বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে হেনস্তা করলে আমাদের সংসার কীভাবে চলবে?
গঙ্গাটিকুরি পঞ্চায়েতের প্রধান গোপাল হাজরা বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার বাংলায় ১০০দিনের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। তাই গ্রামের গরিব ছেলেরা ভিনরাজ্যে কাজে যাচ্ছে। কিন্তু বাঙালি বলে তাঁদের জেলে পুরে রাখা হচ্ছে। সংবিধানে কি লেখা আছে, বাংলায় কথা বলা অপরাধ? আমরা ওদের ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছি।