নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: একমাত্র ছেলের মৃতদেহ দেখেই তিনতলা থেকে মরণঝাঁপ দিলেন মা। শনিবার রাতে হৃদয়স্পর্শী এই ঘটনার সাক্ষী থাকল কোলাঘাট থানার রাইন গ্রাম। মৃত যুবকের নাম শুভার্থী বৈদ্য (২১)। শনিবার তমলুক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ দেহ বাড়িতে আনা হয়। একমাত্র সন্তানের মৃত্যু সহ্য করতে না পেরে রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ মানসী বৈদ্য (৪১) বাড়ির ছাদ থেকে ঝাঁপ দেন। সংকটজনক অবস্থায় মেচেদার একটি নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসরা মৃত ঘোষণা করেন। রবিবার তমলুক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃতার ময়নাতদন্ত হয়। মা-ছেলের এই মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রতিবেশীরা এদিন বৈদ্যবাড়িতে এসে মানসীদেবীকে শেষশ্রদ্ধা জানান।
রাইন গ্রামের বাসিন্দা রমেশ বৈদ্য পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশ সুপার অফিসে ডিইবি বিভাগের করণিক পদে কর্মরত। তাঁর একমাত্র ছেলে শুভার্থী কলকাতার একটি কলেজ থেকে এবছরই বি.কম পাশ করেছেন। শনিবার বেলা ১২টা ৪৫মিনিট পর্যন্ত শুভার্থী বাড়িতে পড়াশোনা করছিলেন। তারপর বাথরুমে স্নান করতে যান। বাথরুমের ভিতর থেকে আচমকা গোঁ গোঁ আওয়াজ শুনতে পেয়ে জেঠিমা ও মা শুভার্থীকে বাইরে বের করে আনেন। মুহূর্তে তাঁর ঠোঁট সাদা হয়ে যায়। দ্রুত কোলাঘাট ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আনা হলে চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, শুভার্থী মারা গিয়েছেন। এরপর তমলুক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর দেহের ময়নাতদন্ত হয়। জানা যায়, হার্ট অ্যাটাকে ওই যুবকের মৃত্যু হয়েছে।
ছেলের মৃত্যুর খবর মাকে জানানো হয়নি। ময়নাতদন্তের পর দেহ বাড়িতে এলে মানসীদেবী জানতে পারেন, ছেলে বেঁচে নেই। এরপর প্রলাপ বকার মতো চিৎকার করে কথা বলতে শুরু করেন। মুহুর্মুহু মাথা ঠুকছিলেন। আশপাশের এলাকা থেকে প্রচুর লোকজন জড়ো হয়েছিলেন। অনেকেই মানসীদেবীকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। আচমকা তিনি সকলকে ঠেলে সরিয়ে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠে যান। সেখান থেকে ঝাঁপ দেন। সোজা ঢালাই রাস্তার উপর পড়ে যান। তড়িঘড়ি নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পুত্রশোকে পাথর রমেশবাবুকে বলা হয়, মানসীদেবীর হাত ভেঙেছে। এভাবেই স্ত্রীর মৃত্যু গোপন রেখে সন্তানের দেহ দাহ করা হয়।
রমেশবাবুদের তিন ভাইয়ের যৌথ পরিবার। মালদহ কলেজের অধ্যাপক ছোটভাই মানসবাবু বলেন, ভাইপো বাথরুমে পড়ে যাওয়ার পর সংজ্ঞাহীন অবস্থায় গাড়িতে কোলাঘাট ব্লক প্রাথমিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ওর মা সঙ্গে ছিলেন। বউদি ঘূণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি, ছেলে বেঁচে নেই। মৃত্যুর কথা তাঁকে জানানো হয়নি। ময়নাতদন্তের পর দেহ আসতেই ওঁকে কোনওভাবেই থামানো যাচ্ছিল না। পুত্রশোকে মা এভাবে নিজেকে শেষ করে দেবে, ভাবতেও পারিনি।
তমলুকের বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অলোক পাত্র বলেন, সন্তানের মৃত্যু যেকোনও মায়ের কাছে মেনে নেওয়া খুব কষ্টের। দেহ দেখার পর মা কান্নাকাটি করেন, মাথা ও কপাল ঠুকতে থাকেন। কেউ কেউ তিন-চারদিন কান্নাকাটি করেন। এরকম ঘটনায় মাকে আগলে রাখতে হয়। কোলাঘাটের ঘটনায় মাকে ঠিকমতো আগলে রাখা হয়নি। তাই এরকম মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গিয়েছে।