নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: শুক্রবার গভীর রাত। তখনও ঘরের মধ্যে তারস্বরে বাজছে হোম থিয়েটার। কিছুক্ষণ পর সব শান্ত। কয়েক ঘণ্টা পর শনিবার সকালে শুরু তোলপাড়। কারণ, দোতলার সেই ঘর থেকেই উদ্ধার হল গৃহকর্ত্রীর রক্তাক্ত দেহ। নাক, মুখ থেকে বেরনো রক্তে ভেসে যাচ্ছে গোটা ঘর। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে বেলেঘাটা থানা এলাকার কবি সুকান্ত সরণিতে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিস। বৃদ্ধার দেহ উদ্ধার করে পাঠানো হয় হাসপাতালে। সেখানেই তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। তাঁদের দাবি, বৃদ্ধাকে নৃশংসভাবে মারধর করা হয়েছে। পুলিস জানিয়েছে, মৃতার নাম নন্দিতা বসু (৬৫)। মৃতদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন লালবাজারের হোমিসাইড শাখা ও সায়েন্টিফিক উইংয়ের সদস্যরা।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিস জেনেছে, শুক্রবার রাতে মায়ের সঙ্গে তুমুল বচসা হয় ছেলে মৈনাক বসুর (৩৫)। বচসা চলাকালীন তিনি মাকে বেধড়ক মারধর ও নির্যাতন করেন। তার জেরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয় গৃহকর্ত্রীর। মানসিকভাবে কিছুটা অসুস্থ মৈনাক। তার জেরে প্রথমে অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলা রুজু হয়। অবশ্য দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতে গ্রেপ্তার করা হয় মৈনাককে। লালবাজারের দাবি, সবদিক খোলা রেখেই তদন্ত চলছে।
কবি সুকান্ত সরণিতে দীর্ঘদিনের বাসিন্দা বসু পরিবার। অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত। নন্দিতা দেবীর স্বামী কমল বসু ব্যবসায়ী ছিলেন। ট্যাংরা অঞ্চলে তাঁর গেঞ্জি কারখানা ছিল। বছর সাতেক আগে তাঁর মৃত্যু হয়। বন্ধ হয়ে যায় সেই কারখানা। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, এরপর সংসার চালানোর জন্য দু’টি গাড়ি কিনে অ্যাপ ক্যাব সংস্থায় ভাড়া খাটাতেন মৈনাক। কিন্তু মানসিক সমস্যার কারণে ব্যবসা চালাতে পারছিলেন না তিনি। গাড়ি বিক্রি করে দেন। সংসার চালাতে এরপর দোতলা বাড়ির একতলার অংশে দু’টি পরিবারকে ভাড়া রাখেন মৈনাক। আরতি নামে এক ভাড়াটের দাবি, মা-ছেলের মধ্যে অশান্তি লেগেই থাকত। সেই বচসা চলাকালীন উঠে আসত টাকাপয়সার প্রসঙ্গ। বৃদ্ধার ছেলেকে অসুস্থ বলে মনে হতো না।
পুলিস সূত্রে খবর, বাড়িটির দু’টি অংশ রয়েছে। সামনের দিকে থাকেন নন্দিতা দেবীর বড় জা। পিছনের দিকে ছেলেকে নিয়ে থাকতেন নন্দিতাদেবী। বাড়ির দেওয়ালের ওপারেই পাশের একটি আবাসনের নিরাপত্তারক্ষীর ঘর। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কেয়ারটেকার বলেন, ‘শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে বৃদ্ধার ঘর থেকে উচ্চস্বরে গান বাজতে শোনা যায়। অন্যান্য দিনও ঘরে গান বাজতো। কিন্তু, এত জোরে না। সেদিনের অস্বাভাবিক শব্দে মেয়ে পর্যন্ত ঘুম থেকে উঠে পড়ে। এরপর ঘরে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ পাই। তারপর গান বন্ধ। তখন কিছু বুঝিনি। আজ সকালে দেখি বাড়ির সামনে পুলিসে পুলিসে ছয়লাপ। তখন জানতে পারলাম ওই বৃদ্ধার ঘটনা।’ বসু বাড়ির ভাড়াটে আরতি দেবীও কেয়ারটেকারের কথার সঙ্গে একমত। তিনিও জানিয়েছেন, বৃদ্ধার ঘরে মাঝেমধ্যেই গান বাজত। কিন্তু শুক্রবার রাতে সেই শব্দ ছিল অস্বাভাবিক।
মাকে মারধরের শব্দ ‘লুকোতেই’ কি এত জোরে গান বাজানোর পরিকল্পনা করে মৈনাক? বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।