অর্ক দে, কলকাতা: আগামী বছরও পাঁচদিন দুর্গাপুজো। দৃক্ সিদ্ধ বা বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা মতে আগামী বছর পড়বে দু’টি নবমী তিথি। এই মতে ৭ অক্টোবর অহোরাত্র অষ্টমী। সন্ধিপুজো ৮ অক্টোবর সকাল ৬টা ৪ মিনিট। ৮ অক্টোবর ও ৯ অক্টোবর নবমী। নবমীর পুজো সকাল ৯ টা দু’মিনিটের মধ্যে সেরে ফেলতে হবে। আর সূর্য বা প্রাচীন সিদ্ধান্ত অনুসারে, আগামী বছর রয়েছে দু’টি অষ্টমী তিথি।
তবে আরও চমক লুকিয়ে তার পরের বছর অর্থাৎ ২০২৮ সালে। সে বছর দুই পঞ্জিকার ভিন্ন মত। একমতে বলছে, পুজো হবে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে। অন্যমত বলছে, পুজো হবে অক্টোবরের মাঝামাঝি। অর্থাৎ দু’টি মতের ফারাকে পুজো প্রায় প্রায় তিন সপ্তাহ অন্তর। এই ঘটনাকে পঞ্জিকার পাতায় দুর্গোৎসবের এক বিরল অধ্যায় বলে ব্যাখ্যা করছেন শাস্ত্রজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দুর্গোৎসবের দিনক্ষণ ঠিক করার ক্ষেত্রে পঞ্জিকাভেদে কখনও এমন পার্থক্য চোখে পড়ে। তা মানুষের কাছে বিস্ময়কর। আর পঞ্জিকা, তিথিতত্ত্ব ও জ্যোতির্বিদ্যায় আগ্রহী মানুষের কাছে এ ঘটনা কৌতূহলের বিষয়। সর্বভারতীয় প্রাচ্যবিদ্যা আকাদেমির অধ্যক্ষ জয়ন্ত কুশারী বলেন, ‘যখন একটি পঞ্জিকায় তিথির মান সর্বোচ্চ পর্যায়ে বাড়ে ও অপর পঞ্জিকায় তিথির মান সর্বনিম্ন পর্যায়ে হ্রাস পায়, তখন পুজোর দিন এমন আগে-পিছে হয়। যেখানে আগে পুজোর হচ্ছে, সেখানে তাঁদের গণনা অনুসারে তিথির মান কমে যাচ্ছে। একটি দিনে তিনটি তিথি হলে তাকে ত্রহস্পর্শ বলে। সেখানে তিথির মান সর্বোচ্চ পর্যায়ে কমছে। আবার একটি তিথির মান বাড়লে একই তিথি দু’দিন ‘ভোগ’ করে। তাই এ বছর দুই পঞ্জিকার মতে কারও দু’দিন ষষ্ঠী বা কারও দু’দিন সপ্তমী ছিল। সামনের বছর প্রাচীন সিদ্ধান্ত মতে অষ্ঠমী দু’দিন ও সন্ধিপুজো সকাল ৭টা ৪ মিনিটে। আবার দৃক্ সিদ্ধ মতে নবমী তিথি দু’দিন ধরে চলার পূর্বাভাস আছে। দু’ক্ষেত্রেই পৃথক দিনে তিথির মান বাড়ছে।’
যদিও বিস্ময়কর বিষয়টি ঘটছে ২০২৮ সালে। ওই বছর এই দুই পঞ্জিকার দুর্গোৎসবের মধ্যে প্রায় তিন সপ্তাহের ব্যবধান। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বিশুদ্ধ মতের পুজো। অর্থাৎ বেলুড় মঠ, ভারত সেবাশ্রম সহ অধিকাংশ মঠ-মন্দিরের পুজো হবে এই সময় মেনে। অন্যদিকে প্রায় সমস্ত বনেদি বাড়ি এবং বারোয়ারির পুজো হবে অক্টোবরের মাঝামাঝি। অর্থাৎ বঙ্গে দুর্গার আরাধনাকে কেন্দ্র করে দুর্গোৎসব পালিত হবে দুই ভিন্ন সময়। একদিকে যখন মঠ-মন্দিরে দেবীর পুজো, চণ্ডীপাঠ, আরতি ও বিসর্জনের আচার সম্পন্ন হয়ে যাবে। অন্যদিকে তখন বনেদি বাড়ি ও বারোয়ারি পুজোমণ্ডপে চলবে দেবীর আগমনের প্রস্তুতি।
ইতিহাস বলছে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল আটের দশকে। সে বছর নজিরবিহীন ভাবে দুর্গার দু’বার পুজো হয়েছিল। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে আশ্বিনে দুর্গার আরাধনা হয়েছিল। আর সূর্য সিদ্ধান্ত মতে কার্তিক মাসে হয়েছিল পুজো। জয়ন্ত কুশারী বলেন, ‘যখন কোনো বছরে মল মাস পড়ে তখন আশ্বিনের পুজো কার্তিকে হয়। বিভিন্ন জায়গায় যা চর্চা শুনছি, তাতে ২০২৮ সালে সেই পরিস্থিতি তৈরি হতে চলেছে।’ মল মাসের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি জানান, একটি মল মাস হওয়ার ২ বছর ৩ মাস থেকে ২ বছর ৯ মাসের মধ্যে আরও একটি মল মাস হওয়ার কথা। যেভাবে গ্রেগ্রোরিয়ান ক্যালেন্ডার (ইংরেজি) অনুসারে প্রতি চার বছর অন্তর লিপ ইয়ার (ফেব্রুয়ারি ২৯ দিনের) হয়, তেমনভাবেই হয় মল মাসের হিসাব। চলতি বছর ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে (২০২৬ সাল) জ্যৈষ্ঠ ছিল মল মাস। সেই অনুসারে ১৪৩৫ (২০২৮) বঙ্গাব্দে আষাঢ় বা শ্রাবণ মল মাস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই দুই পঞ্জিকা মতে দুর্গাপুজোর এই বিরল ব্যবধান হতে পারে।



