ইন্দ্রজিৎ কর্মকার, কান্দি: পরাধীন ভারতে সুভাষচন্দ্র বসুর জনপ্রিয়তা তখন বেড়েই চলেছে। গ্রামে গ্রামে কংগ্রেসের সংগঠন গড়ে তুলতে সেসময় মুর্শিদাবাদের বড়ঞা ব্লকের পাঁচথুপীর মতো জায়গাতেও পা রেখেছিলেন নেতাজী। কিন্তু নেতাজীর গ্রামে আসা ও সভায় বক্তৃতার খবর গোপনে পুলিসের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল গ্রামেরই কয়েকজন। তাই মাঝপথে কর্মসূচি ছেড়ে রাতেই গ্রাম ছাড়তে হয়েছিল সুভাষচন্দ্রকে। যে ঘটনা এখনও পাঁচথুপীর বাসিন্দাদের বিবেকে নাড়া দেয়।
সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে পাঁচথুপী গ্রামের ঘোষ মৌলিক পরিবারের নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এই গ্রামেরই স্বাধীনতা সংগ্রামী সুনীলমোহন ঘোষ মৌলিকের সঙ্গে নেতাজীর নিয়মিত চিঠি আদানপ্রদান হতো। সেই সূত্রেই গ্রামীণ সংগঠনের কাজে জোর দিতে সুভাষচন্দ্র পাঁচথুপী আসেন। সময়টা সম্ভবত ১৯৩৫-৩৭সাল। কলকাতায় সুনীলমোহনবাবুর সঙ্গে নেতাজীর সাক্ষাতে পাঁচথুপি আসার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। মূলত স্থানীয় যুবকদের স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদানে উদ্বুদ্ধ করতেই নেতাজীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন সুনীলমোহনবাবু।
সেইমতো নির্দিষ্ট দিনে নেতাজী পাঁচথুপী গ্রামে পা রাখেন। সুনীলমোহনবাবুর বাড়ির দোতলার ঘরেই তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। রাতে ওই বাড়িতেই খাবার খেয়েছিলেন তিনি। সেদিন সন্ধ্যায় পাঁচথুপী কালীবাজারে নেতাজীর সমর্থনে একটি গ্রামীণ সভা আয়োজিত হয়। প্রয়াত সুনীলমোহনবাবুর ছেলে সুদীপমোহন ঘোষ মৌলিক বলেন, ওই সভায় খুব বেশি লোক হয়েছিল বলা যাবে না। আবার খুব কম লোক হয়েছিল, সেটাও নয়। নেতাজীর সভার কথা আগেরদিনই বাবা আশপাশের গ্রামেও বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছিলেন। নেতাজী ওই সভায় বক্তব্য পেশ করেন। তাতে এলাকার যুবসমাজ স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত হয়েছিল। কিন্তু এখানেও বিশ্বাসঘাতকতা কাজ করেছিল। পাঁচথুপী গ্রামের কয়েকজন ব্রিটিশ পুলিসের কাছে নেতাজীর আসা ও সভার কথা জানিয়ে দিয়েছিল। যার জেরে নেতাজীকে কর্মসূচি অসমাপ্ত রেখেই এলাকা ছাড়তে হয়েছিল। যা এখনও আমাদের বিবেকে দংশন করে। নেতাজীর ওই সভার কথা আগেরদিনই ব্রিটিশ পুলিসের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। সেইমতো ব্রিটিশ পুলিস নির্দিষ্ট সময়ে সভাস্থলের দিকে রওনা দেয়। রাতের মধ্যেই নেতাজীকে গ্রেপ্তারের পরিকল্পনা করেছিল তারা। কিন্তু নেতাজী সেই পরিকল্পনার কথা জানতে পেরে ভোরের আলো ফোটার আগেই পাঁচথুপী ছেড়ে চলে যান।
পাঁচথুপী নাগরিক মঞ্চের সম্পাদক অজিতকুমার লাহা বলেন, নেতাজীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনাটি এখনও আমাদের কাছে লজ্জার বিষয়। স্থানীয় বাসিন্দা আলফাজ আতাহার আলি বলেন, নেতাজীকে নিয়ে আমরা গর্ব করলেও বিবেকের কাছে এখনও লজ্জিত।