Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

কলিকাতায় বরফ

কলকাতায় যখন প্রথম বরফ এল, তখন সেই দুর্লভ বস্তুটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে হাজির হয়েছিল উত্তর কলকাতার সিমলা পাড়ার দত্ত বাড়িতে।

কলিকাতায় বরফ
  • ২৫ মে, ২০২৫ ১৬:০৫
Prefer us on Google

অনিরুদ্ধ সরকার: কলকাতায় যখন প্রথম বরফ এল, তখন সেই দুর্লভ বস্তুটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে হাজির হয়েছিল উত্তর কলকাতার সিমলা পাড়ার দত্ত বাড়িতে। দত্ত বাড়ি মানে স্বামীজির পৈতৃক বাড়ি। স্বামীজি আইসক্রিমের ভক্ত ছিলেন। বিভিন্ন গবেষকদের লেখালেখি এবং স্বামীজির চিঠিপত্র থেকে তেমনই জানা যাচ্ছে। কলকাতায় প্রথম দিকে বরফ এলে ডাবের খোলে চিনি সহযোগে ‘বরফ’ দিয়ে তা পান করতেন স্বামীজি। 
মার্কিন মুলুকে স্বামীজির আইসক্রিম খাওয়া নিয়ে হাজারো কাহিনি রয়েছে। গবেষকরা জানাচ্ছেন, স্বামীজি আমেরিকায় থাকাকালীন বেশিরভাগ সময় চকোলেট আইসক্রিম খেতেন। আমেরিকায় স্বামীজি তখন লেগেট পরিবারের অতিথি। রাতের আহার শেষে স্বামীজি প্রায়শই ধূমপান করতেন। যে কারণে আহার শেষ হতেই ডিনার টেবিল ত্যাগ করে তাড়াতাড়ি উঠে পড়তেন। ডিনার টেবিলে স্বামীজিকে আটকে রাখার একটি মোক্ষম উপায় বের করেছিলেন মিসেস লেগেট। উপায়টি ছিল, টেবিল ছেড়ে স্বামীজি ওঠার আগেই মিসেস লেগেট ঘোষণা করতেন, ‘আইসক্রিম আছে, আসছে একটু পরেই।’ আর এই ঘোষণা শুনে স্বামীজি বাচ্চাদের মতো ডাইনিং টেবিলে বসে থাকতেন। যথারীতি আইসক্রিম এলে তৃপ্তি সহকারে তা খেতেন।
একবার ক্যালিফোর্নিয়ায় এক সান্ধ্য সভায় বক্তৃতা দিয়ে স্বামীজি ভক্ত-সমর্থকদের নিয়ে সদলবলে রাস্তায় বের হয়েছেন। সেদিন তিনি বক্তৃতা দিয়েছেন ‘নরক’ নিয়ে। তা নিয়েই সকলে আলোচনায় মত্ত। বাইরে হাড়কাঁপানো শীত। এমন সময় কী খেয়াল হল, স্বামীজি সবাইকে নিয়ে কাছের একটা রেস্তরাঁয় ঢুকলেন খাবার খেতে। ঢুকেই সঙ্গীদের কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ‘এই ঠান্ডা যদি নরক না-হয় তাহলে নরক কাকে বলে ভাই আমি জানি না!’ ঠান্ডায় সবাই প্রায় জমে যাওয়ার দশা। স্বামীজি হঠাৎ খেয়াল করলেন রেস্তরাঁয় আইসক্রিম রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই স্বামীজি আইসক্রিম অর্ডার দিলেন আর অর্ডার সার্ভ করতে দেরি হতে পারে ভেবে মালিকের কাছে গিয়ে মজা করে বললেন, ‘বেশি দেরি করবেন না, তাহলে এখানে এসে দেখবেন ঠান্ডার চোটে একতাল চকোলেট আইসক্রিম আপনার অপেক্ষায় রয়েছে!’ প্রচন্ড ঠান্ডায় স্বামীজি যে জমে আইসক্রিম হয়ে যেতে পারেন, একথা শুনে রেস্তরাঁর মালিক হেসে ফেললেন। এই প্রসঙ্গে আরও এক রেস্তরাঁয় স্বামীজির আইসক্রিম খাওয়ার কাহিনি মনে পড়ছে। সান ফ্রান্সিসকোর পাওয়েল স্ট্রিট। স্বামীজি হাঁটছেন বন্ধুবান্ধব নিয়ে। স্বামীজির ইচ্ছে হল আইসক্রিম খাবেন। ইচ্ছে যখন হয়েছে, তখন উপায় কী। রাস্তার ধারের একটা রেস্তরাঁয় সবাই মিলে প্রবেশ করলেন। খাবার অর্ডার নিতে এল একটি কমবয়সি মেয়ে। স্বামীজি বললেন, ‘সবাই আইসক্রিম খাবে’। কিছুক্ষণ পরে সেই ওয়েটার মেয়েটি আইসক্রিমের জায়গায় নিয়ে এল ‘আইসক্রিম সোডা’। ব্যস! সবাই তো বেজায় খাপ্পা। ম্যানেজারকে ডেকে বিষয়টি বলা হল। ম্যানেজার সব শুনে মেয়েটিকে বকাবকি শুরু করলেন। মেয়েটিকে কাঁদতে দেখে স্বামীজি মনে মনে খুব দুঃখ পেলেন। বললেন, ‘ওকে আর একেবারে বকবে না। ও না বুঝে ভুল করে ফেলেছে। আর তোমরা যদি ফের ওকে বকো তাহলে আমি একাই এই সব সোডা-আইসক্রিমগুলি খেয়ে নেব। সেটা ভালো হবে কী!’ এতে সবাই শান্ত হল। তারপর যথারীতি এল আইসক্রিম। স্বামীজির আনন্দ দেখে কে! 
আরেকবার এক রেস্তরাঁয় এক মহিলা ওয়েটার আইসক্রিম সার্ভ করছিলেন। স্বামীজি এক চামচ আইসক্রিম মুখে নিয়ে বললেন, ‘ম্যাডাম, ফুড ফর গড।’ আইসক্রিমের স্বাদ সত্যিই স্বর্গীয়। 
এবার লন্ডনের গল্প। স্বামীজি তখন মিস হেনরিয়েটা মুলারের অতিথি। খাদ্যরসিক স্বামীজির জন্য ভারত থেকে কোনও ভক্ত আম পাঠিয়েছেন। মিস মুলার আমগুলি স্বামীজির কাছে নিয়ে এলে তিনি বললেন, ‘জাহাজে করে মাসখানেক ধরে আমগুলো এসেছে। এর স্বাদ পুনরুদ্ধার করতে হবে। আর তা হবে যদি তুমি একে বরফে ভিজিয়ে রাখো।’ বরফে ভিজিয়ে রেখে পরে সেই আম যত্ন করে খেলেন স্বামীজি। 
দেশে ফিরেও স্বামীজির আইসক্রিম প্রেম কমেনি। উল্টে বেড়েছিল। সেবার শীতে মায়াবতী গিয়েছেন। হিমালয়ের কোলে সুন্দর মায়াবতী আশ্রম। স্বামীজি সেখানে গুরুভাই আর ভক্তদের নিয়ে বেদান্ত চর্চা করছেন। একদিন স্বামীজি স্বামী বিরজানন্দকে বললেন, ‘জীবনের শেষ ভাগে সব কাজকম্মো ছেড়ে প্রকৃতির মাঝে এখানে এসেছি। শান্তিতে দু’দণ্ড থাকব বলে। বই লিখব আর প্রাণ খুলে গান গাইব। সবই ঠিক আছে। কিন্তু অনেকদিন আইসক্রিম খাওয়া হয়নি।’ স্বামীজির আইসক্রিম প্রেমের কথা বিরজানন্দ জানতেন। শীতে মায়াবতী বরফে ঢেকেছে। চারপাশে হিমালয়ের এক অনন্য রূপ। নদী, হ্ব্রদ সব বরফে বরফময়। বরফের অভাব নেই। বিরজাজন্দ একদিন বের হলেন বরফ সংগ্রহ করতে। একতাল ভালো বরফ জোগাড় করে বানিয়ে ফেললেন আইসক্রিম। স্বামীজিকে দিলেন। স্বামীজি কি খুশি আইসক্রিম পেয়ে! 
একাধিক রোগ ধরা পড়ার পরেও স্বামীজির ছিল ডোন্টকেয়ার ভাব। যে কারণে তিনি আজও দেড়শো নট আউট। ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। তাও নিবেদিতার কাছে সমানে আব্দার করেছেন আইসক্রিমের। হাজারো নিষেধ সত্ত্বেও নিবেদিতা তার প্রিয় ‘রাজা’, স্বামীজিকে এনে দিয়েছেন আইসক্রিম। নিবেদিতার পত্রাবলী থেকে জানা যায়, স্বামীজি এতটাই আইসক্রিম ভালোবাসতেন যে বেলুড়ে তিনি আমেরিকা থেকে আইসক্রিম বানানোর যন্ত্র অবধি আনাতে চেয়েছিলেন কিন্তু বেলুড়ে তখনও বিদ্যুৎ আসেনি। সেই কারণে এই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
স্বামীজির মধ্যম ভ্রাতা মহেন্দ্রনাথ দত্ত ‘কলকাতার পুরাতন কাহিনী ও প্রথা’ বইয়ে আইসক্রিম নিয়ে কিছু না লিখলেও ‘বরফ’ প্রসঙ্গে লিখছেন, ‘আমাদের পাড়ার বৃদ্ধ মধু মুখুজ্যের নিকট শুনিতাম যে হুগলীতে গুঁড়িগুঁড়ি বরফ পড়িত। খড়ের চালার উপর সকালবেলা যেন চুন ছড়াইয়া দিয়া গিয়াছে, এই রূপ তিনি বাল্যকালে দেখিয়াছিলেন এবং খড় বিছিয়ে সরাতে জল দিয়া ফাঁকে রাখিলে তাহা বরফ হইয়া যাইত। তবে আমাদের বাল্যকালে বরফ পড়া দেখি নাই।’ 
হুগলির এই বরফ কিংবা এই গুঁড়ি গুঁড়ি বরফ পড়ার কাহিনি প্রসঙ্গে ‘কলকাতা গেজেট’ লিখছে, হুগলি থেকে যে বরফ পাওয়া যেত, তা ছিল থকথকে এক রকম অর্ধকঠিন মিশ্রণ। সেই জন্য সাহেবরা একে বলত ‘হুগলি স্লাশ’। আর এই ‘হুগলির বরফ’ তখন কলকাতা অবধি সাপ্লাই হতো। এই সাপ্লাইয়ের সঙ্গেই জন্ম নিয়েছিল এক শ্রেণির কর্মচারী, যাঁরা ‘আবদার’ নামে পরিচিত ছিল। এই ‘আবদার’রা শ্রমিকের সাহায্যে অগভীর পাত্রে জল জমিয়ে তৈরি করতেন এক ধরনের দেশি বরফ, যার স্থানীয় নাম ছিল ‘হুগলি আইস’। 
বিখ্যাত কলকাতা গবেষক ফ্যানি পার্কস তাঁর বইয়ে লিখেছেন, বরফ পাওয়ার পর আবদার তা ওজন করে বাজারে পাঠাতেন। কুলিরা তার কিছু বিক্রি করে দিতেন ‘নেটিভ’দের কাছে। এদেশীয়রা কিছু নিজেদের ব্যবহারের জন্য রেখে বাকিটুকু দেড় কেজি দু’আনা দরে আবার বিক্রি করে দিতেন।
যদিও গবেষকদের মতে এই ‘আবদার’ পদটির জন্ম মুঘল আমলে। সম্রাট আকবরের হাত ধরে। আকবর গঙ্গাজলকে খুবই পবিত্র মনে করতেন এবং নিয়মিত গঙ্গাজল পান করতেন। এই জল বহনকারী নির্দিষ্ট একদল কর্মচারীকে বলা হত ‘আবদার’। আকবরের সাময়িক রাজধানী ফতেপুর সিক্রিতে ছিল ‘আবদারখানা’। যেখানে আকবরের প্রিয় পানীয় গঙ্গাজল রাখা থাকত। আকবর সেই গঙ্গাজল বরফে মিশিয়ে পান করতেন। মুঘল আমলে বরফ আসত কাশ্মীর থেকে। আবদারদের হাত ধরে বাঙালি হিন্দুরাও গঙ্গাজলের সঙ্গে বরফ মিশিয়ে খেতে শুরু করেছিলেন।
এবার চলে আসি রবি ঠাকুরের আইসক্রিম প্রেমের কাহিনিতে। রবি ঠাকুরেরও বেশ পছন্দের ছিল বরফের শরবত আর আইসক্রিম। 
রবি ঠাকুর তখন শান্তিনিকেতনে। ছাত্রছাত্রীদের সামনে গাইছেন, ‘হে মাধবী, দ্বিধা কেন?’ হঠাৎ করে সেসময় হাজির ভৃত্য বনমালী। বনমালী আইসক্রিমের প্লেট হাতে নিয়ে ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বনমালী ভাবছে ঘরে ঢুকবে, কি ঢুকবে না। কারণ রবি ঠাকুর আপন খেয়ালে চোখ বুজে মগ্ন হয়ে গান ধরেছেন। পাছে তাল কেটে যায়... রবি ঠাকুর বিরক্ত হন... এসব হাজার বিষয় নিয়ে ভাবতে ভাবতে সে দাঁড়িয়ে রইল। এদিকে আইসক্রিম গলে গেলে রবি ঠাকুর বিরক্ত হবেন, বকা দিতে পারেন। এসব সাতপাঁচ যখন ভেবেই চলেছেন, তখন হঠাৎ গুরুদেব গান থামালেন। চোখ খুলে বনমালীর দিকে একবার তাকালেন। তারপর মৃদু হেসে আবার গাইলেন, ‘হে মাধবী, দ্বিধা কেন?’
রবি ঠাকুর বনমালীর দিকে তাকিয়ে গান গাইতেই বনমালীর মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে আর কিছু না বলে আইসক্রিমের প্লেট গুরুদেবের সামনে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রবি ঠাকুর ছিলেন বেশ রসিক মানুষ। তিনি বললেন, ‘বনমালীকে যদিও মাধবী বলা চলে না। তবে তার দ্বিধা মাধবীর মতোই ছিল। আর আইসক্রিমের প্লেট নিয়ে দ্বিধা করা মোটেই ভালো নয়।’
ঠাকুরবাড়ির প্রিন্স দ্বারকানাথ ছিলেন বেশ শৌখিন ও বিলাসী। মহারানি ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে ছিল তাঁর ওঠাবসা। ইংরেজরা তাঁর কাছ থেকে টাকা ধার নিতেন। দ্বারকানাথও ছিলেন খাদ্যরসিক। তিনি মোটেই গরম সহ্য করতে পারতেন না। আর সেকারণে তিনি বরফ পছন্দ করতেন। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, বরফ দিয়ে অনেক ধরনের পানীয় প্রস্তুত করাতেন তিনি। 
কলকাতায় বরফের জোগান ঠিকমতো আসছে কি না, তা দেখার জন্য ইংরেজরা একটি কমিটি তৈরি করে। দ্বারকানাথ ছিলেন কলকাতার এই ‘বরফ কমিটি’র মেম্বার। এই কমিটিতে থাকতে থাকতে একদিন তিনি বরফ ব্যবসায় নামার ইচ্ছেপ্রকাশ করলে ইংরেজরা সে প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। ঠিক যেভাবে রেলপথের বিস্তারের কাজেও দ্বারকানাথকে বরাত দেয়নি ইংরেজরা। ব্রিটিশরা ছিল ‘জাত ব্যবসায়ী’। তারাও পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি করেছেন। আর এই পাইয়ে দেওয়ার তালিকায় একচেটিয়া বরফের ব্যবসা করে ‘আইস কিং’ উপাধি লাভ করেছিলেন ফ্রেডরিক টিউডর। আমেরিকার বস্টনে তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল ‘টিউডর আইস কোম্পানি’। 
১৮৩৩ সালে প্রথম ফ্রেডরিক টিউডর আমেরিকা থেকে ‘টাস্কানি’ নামের জাহাজে বরফ ভর্তি করে হাজির হয়েছিলেন কলকাতায়। কলকাতা বন্দরে বহু মানুষ সেদিন জড়ো হয়েছিলেন আমদানি করা বরফ দেখতে। উপস্থিত প্রত্যেকে ওই বিশাল বিশাল বরফের চাঙড় দেখে অবাক হয়েছিলেন। উৎসুক দর্শকদের মনে প্রশ্নের শেষ ছিল না। কেউ বলেন, ওই বরফ স্পর্শ করে তাঁর হাত পুড়ে গিয়েছে, তো কেউ বলেন, বরফের কাছে দাঁড়িয়ে তার ঠান্ডা লেগেছে। একজন তো সরল মনে জাহাজের ক্যাপ্টেনকে জিজ্ঞেসই করে বসেন, আমেরিকায় বরফ কি গাছে ধরে? এমন হাজারো প্রশ্নের কাহিনি প্রকাশিত হল সংবাদপত্রে! আর সে-বছরই কলকাতার মানুষ প্রথম আইসক্রিমেরও স্বাদ পেল। শহর কলকাতায় প্রথম বরফ এসেছিল যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস থেকে।
স্বচ্ছ সুস্বাদু মার্কিন বরফ কলকাতায় এসে পৌঁছলে, তার চাহিদা হয় আকাশছোঁয়া। টিউডর  ছিলেন জাত ব্যবসায়ী। তিনি প্রথম দিকে বরফের দাম কম রেখে বাজারে ‘চাহিদা’ তৈরি করেন আর তারপরই চড়া দামে বিক্রি করে ‘ডাবল মুনাফা’ কামান। দেখতে দেখতে কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হয় আইস হাউস। কলকাতার প্রথম আইস হাউসটি তৈরি হয় গঙ্গার ধারে। তারপর স্ট্র্যান্ড রোডে, ব্যাঙ্কশাল কোর্টের পশ্চিম দিকে, চার্চ লেনের দিকে দ্রুতগতিতে একে একে গড়ে উঠতে শুরু করে আইস হাউস।
কে ছিলেন এই ‘আইস কিং’ টিউডর? ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, টিউডরের জন্ম বস্টনের এক বনেদি পরিবারে। প্রথম জীবনে কোনও কাজেই তাঁর কপাল খুলছিল না। বরফ ব্যবসার শুরুতেও তিনি খুব একটা লাভের মুখ দেখেননি। প্রথমে বরফ চালান দিতেনআমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের কিছু রাজ্য ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে। কিন্তু সেখানে বিপুল লোকসান হয়। পরে কফি ব্যবসায় লগ্নি করেন। সেখানে ঋণখেলাপির জন্য জেল হয় টিউডরের।
ঋণখেলাপির দায়ে তিন-তিনবার জেল হয় তাঁর। টিউডর এবার মরিয়া হয়ে ব্রিটিশ ভারতে বরফ ব্যবসায় নামার ঝুঁকি নেন। আর কলকাতায় বরফ পরিবহণের ব্যবসায় কপাল খুলে যায় তাঁর। টিউডরের তরফে এজেন্ট হিসেবে জাহাজের সঙ্গে কলকাতায় আসেন উইলিয়াম রজার্স। তিনি ছিলেন বরফ সাপ্লাই ব্যবসার এক-তৃতীয়াংশের অংশীদার। টিউডরের আরেক অংশীদার ছিলেন স্যামুয়েল অস্টিন। টিউডরের পার্টনার রজার্সকে বরফ ব্যবসার জন্য সংবর্ধনা দেন গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক। বেন্টিঙ্ক ছিলেন টিউডরের বন্ধুসম। একবার টিউডরের কলকাতাগামী জাহাজে ৩৫০ ব্যারেল আপেলের সব আপেল পচে গেলে  কলকাতার ‘আমেরিকান আইস কমিটি’ ও লর্ড বেন্টিঙ্ক টিউডরকে কোর্টের হাত থেকে রক্ষা করেন।
টিউডরের জাহাজ প্রথম দিকে কলকাতায় শুধুমাত্র বরফ পাঠাত। পরে মার্কিন মুলুক থেকে আপেল, স্প্যানিশ আঙুর, মাখন সহ আরও সামগ্রী পাঠাতে শুরু করে। টিউডরের ব্যবসা জমে ওঠে। 
টিউডরের পার্টনার বরফ এজেন্ট উইলিয়াম রজার্সকে কাস্টমস হাউসের আনুষ্ঠানিকতা কিংবা নিয়মনীতির জন্য বরফ নিয়ে বন্দরে কখনই আটকে থাকতে হতো না। আমদানি করা বরফের চালান তিনি সোজা গুদামে তোলার অনুমতি পেয়েছিলেন। এমনকী তিনি রাতে বরফ নামানোর অনুমতিও পান। শুধু তাই নয়, নিজের পছন্দমতো জায়গায় জাহাজ ভিড়ানোর সুযোগ অবধি ছিল। ইংরেজদের সাহায্য পেয়ে টিউডর একচেটিয়া বরফ ব্যবসা চালিয়ে ফুলেফেঁপে ওঠেন। কারণ সেসময় বরফের যে পরিমাণ চাহিদা ছিল, তার জোগান একমাত্র টিউডরই দিতে পারতেন। তখন চিকিৎসাবিদ্যা থেকে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বরফের ব্যবহার অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছিল। 
কলকাতার পাশাপাশি সেসময় বম্বেতেও (অধুনা মুম্বই) বরফ নিয়ে উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল। বম্বের বিখ্যাত ব্যবসায়ী ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত জামসেদজি জিজিবয় সেখানে বরফ ব্যবসার সূচনা করেন। তাঁর ডিনার পার্টিতে প্রথম আইসক্রিম খেয়ে কয়েকজন অতিথি সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হন। ‘বম্বে সমাচার’ এবিষয় নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। একইভাবে মাদ্রাজেও শুরু হয় রমরমিয়ে বরফ ব্যবসা। দেখতে দেখতে ভারতজুড়ে গড়ে উঠতে থাকে ‘আইস কোম্পানি’। 
বরফ ব্যবসা যখন সর্বোচ্চ শিখরে, তখন হঠাৎ করে মারা যান ‘আইস কিং’ টিউডর। তাঁর মৃত্যুর পর ১৮৬৪ সাল থেকে আইস ব্যবসায় ভাটা  পড়তে শুরু করে। টিউডরের ব্যবসা হাতবদল হয়। কিন্তু লোকসানের বহর বাড়তে থাকে। এদিকে কলকাতায় ততদিনে গড়ে উঠেছে বাংলার নিজস্ব আইস কোম্পানি, ‘বেঙ্গল আইস কোম্পানি’। ভারতে তখন ব্যবসায়িক কারণে রেলপথ   বিস্তারের কাজ চলছে জোরকদমে। আর রেলপথের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন জায়গায় বরফ রপ্তানি শুরু হল। ফলে বরফ মজুত রাখার প্রয়োজনীয়তাও কমে এল। আইস হাউসগুলি ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাল। তার জেরে একটা সময়ের পর দেশের বিভিন্ন এলাকার আইস হাউসগুলি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। কলকাতার পাশাপাশি হারিয়ে গেল ‘বম্বে আইস হাউস’ ও ‘মাদ্রাজ আইস হাউস’! ইতিহাস বলছে, দক্ষিণ ভারত ভ্রমণের সময় এই মাদ্রাজ আইস হাউসে ন’দিন ছিলেন আইসক্রিমপ্রেমী ভারতীয় সন্ন্যাসী, স্বামী বিবেকানন্দ। এখন এটি ‘বিবেকানন্দ ইলম’ বা ‘বিবেকানন্দ হাউস’ নামে পরিচিত।

Advertisement

 গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
 সহযোগিতায় : উজ্জ্বল দাস

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ