Bartaman Logo
৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

সবার উপরে উত্তম

সেপ্টেম্বর এলেই শুরু হয় ‘উত্তম উৎসব’। এবছর আবার একশো বছর পূর্তি। জন্মশতবর্ষেও তিনি অম্লান। অরুণ বা অরূপ নন, উত্তমেই তিনি সর্বোত্তম। অভিনয় ছিল তাঁর কাছে ঈশ্বরসাধনা।

সবার উপরে উত্তম
  • ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৬:২৪
Prefer us on Google

সুখেন বিশ্বাস: সেপ্টেম্বর এলেই শুরু হয় ‘উত্তম উৎসব’। এবছর আবার একশো বছর পূর্তি। জন্মশতবর্ষেও তিনি অম্লান। অরুণ বা অরূপ নন, উত্তমেই তিনি সর্বোত্তম। অভিনয় ছিল তাঁর কাছে ঈশ্বরসাধনা। নায়ক থেকে মহানায়ককে পৌঁছাতে তাঁকে অনেক কাঁটা বিছানো পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। শুরুর দিকে একের পর এক ছবি ফ্লপ হওয়ায় স্টুডিয়োর লোকেরা বলত ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’। কিন্তু আজকের সুপারস্টার প্রসেনজিতের কথায়, ‘সেই তাচ্ছিল্য আমল না দিয়ে, মানুষটি অবিচল সাধনার মধ্যে দিয়ে তাঁর অভিনয় শিল্পকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেলেন যে, নিজেই হয়ে উঠলেন এক ‘টেক্সট বুক’।’

Advertisement

বাংলা-হিন্দি মিলিয়ে উত্তম অভিনীত ২১২টি ছবি মুক্তি পেয়েছে। কিছু ছবিতে অভিনয় করলেও সেগুলি আজও পৃথিবীর আলো দেখেনি। শিল্পী-টেকনিশিয়ান—ইন্ডাস্ট্রির সকলের কথা ভেবে তৈরি করেছিলেন শিল্পী সংসদ। মহানায়ক হয়েও কখনও মানুষের থেকে দূরে সরে যাননি। পড়াশোনা, বিবাহ, অসুস্থতা—যে কোনো সমস্যায় পড়লেই স্টুডিয়োর লোকজন ছুটে আসত মহানায়কের কাছে। কিন্তু শর্ত একটাই, বাইরের কেউ যেন জানতে না পারে। বলতেন, ‘ডান হাতে দেব, বাঁ হাতও যেন জানতে না পারে।’ উত্তমকুমারের ভাইঝি মৌসুমী দত্ত (বরুণ চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা) জানালেন, ‘লোডশেডিং হলে জ্যাজান (উত্তমকুমার) ছাদে উঠে গল্প করতে ভালোবাসতেন। ওঁর সঙ্গে আমরা বাড়ির প্রায় সকলেই ছাদে উঠে যেতাম। জ্যোৎস্নার আলোয় ছাদে বসে বিভিন্ন গল্প হত। মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতেন, সব সময় আকাশ দেখবি। আকাশের মতো বড়ো করে রাখবি মনটাকে। দুঃখটাকে ‘ইনহেল’ করবি আর আনন্দটাকে ‘গারগেল’। মানুষকে যত আনন্দ দিতে পারবি ততই ভালো থাকবি।’
পুজো-আচ্চায় খুবই বিশ্বাসী ছিলেন মহানায়ক। লক্ষ্মীপুজো তাঁর কাছে ছিল জাতীয় উৎসবের মতো। গৌরীদেবীর মুখের আদলে ওঁদের বাড়ির লক্ষ্মীপ্রতিমা তৈরি করেছিলেন প্রতিবেশী শিল্পী নিরঞ্জন পাল। সেই ধারা এখনও অব্যাহত। উত্তম-পরিবারের বউ মহুয়া চট্টোপাধ্যায় জানালেন, ‘লক্ষ্মীপুজোর সময় গিরিশ মুখার্জি রোডে নরনারায়ণ সেবা করতেন। খিচুড়ির সঙ্গে পাঁচমিশালি তরকারি, বেগুনি, আলুর দম, চাটনি, পায়েস, মিষ্টি—পেট পুরে খাওয়ানো হত। মাটিতে শতরঞ্চি বিছিয়ে এক একটা ব্যাচে চারশো-পাঁচশো লোক খেতে বসত। প্রথম পাতের পরিবেশন শুরু করতেন মহানায়ক স্বয়ং। আর পরের দিন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে গরিব মানুষদের নতুন জামাকাপড় দিতেন।
লক্ষ্মীপুজোর সময় পূর্ণ সিনেমা থেকে উত্তমকুমারের বাড়ি পর্যন্ত বাঁশের ব্যারিকেড দিয়ে রাস্তা আলাদা করে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে হত। একবার বাড়ি থেকে কাজে বেরোনোর সময় তাঁর গাড়িতে ঘটে দুর্ঘটনা। অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে মহানায়কের গাড়ির দরজা বন্ধ করতে গিয়ে সুরেশ সিং নামে একজনের আঙুল কেটে গিয়েছিল। বলরাম বসু ঘাটে প্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রার সময়ও ঘটেছিল অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। মিত্র ইনস্টিটিউশনের পাশের রাস্তায় উন্মত্ত ভক্তরা গাড়ি ঘিরে ফেলে গাড়িটি পিছনের দিক থেকে শূন্যে তুলে ধরেছিল। মহুয়া জানালেন, তখন মনু ছিল ড্রাইভার। বাবি  মনুকে বলেছিল, ‘মনু, গাড়ি চালাও।’ উত্তরে মনু বলেছিল, ‘গাড়ি কোথায় চালাব? চাকা তো রয়েছে আকাশে, দাদা! দেখুন পিছনের চাকা ঘুরে যাচ্ছে।’ সেই বছরই বাবি শেষবারের মতো লক্ষ্মীর বিসর্জনে গিয়েছিলেন।’ মনামী বলেন, লক্ষ্মীপুজোর সময় বাড়িতে নতুন জামাকাপড় কিনে নিয়ে আসতেন জ্যাজান। পুজোর দিন সন্ধ্যায় জেঠিমা ওগুলো সকলের হাতে তুলে দিতেন। পারিবারিক রীতি অনুসারে সন্ধ্যাবেলায় পুজোর সময় ওইসব নতুন জামাকাপড় সকলকে পরতে হত। জ্যাজান শুধু লক্ষ্মীপুজোই করতেন না, শ্যুটিংয়ে যাওয়ার আগে প্রতিদিন গণেশ পুজোও করতেন। তাছাড়া গণেশ চতুর্থীতে বাড়িতে বড়ো করে গণেশ পুজো হত। আর বিজয়া দশমীতে জেঠিমাকে সঙ্গে নিয়ে আত্মীয় বাড়িতে বিজয়ার প্রণাম করতে যেতেন।
মহানায়কের দুর্গাপুজোর দিনগুলো কেমন ছিল? পরিবারের সদস্যদের কথায়, ষষ্ঠীর দিন পর্যন্ত শ্যুটিং করতেন। সপ্তমীতে বিশ্রাম ও আড্ডার পর অষ্টমীর দিন সকালে বাড়ির কাছের গিরিশ ভবন ও লেডিস পার্কে গিয়ে সস্ত্রীক অঞ্জলি দিয়ে ভোগ খেতেন। অষ্টমীর দিন সম্পূর্ণ নিরামিষ আহার। ভোগ খেয়ে সন্ধ্যাবেলা বাড়িতে বসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা। নবমীর দিন জমিয়ে মাংস খাওয়া, আড্ডা। দশমীর সন্ধ্যায় গিরিশ ভবনের ঠাকুর বিসর্জনের পর পারিবারিক বিজয়া সম্মেলন। গুরুজনদের প্রণাম, কোলাকুলি এবং সিদ্ধি খাওয়ার পর ঘরে তৈরি জিবেগজা, ঘুগনি ও কুচো নিমকি দিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করা হত। প্রথানুসারে গিরিশ ভবনের ঠাকুর বিসর্জনের পর পাড়ায় বিজয়া হত। উত্তমকুমার আগে মা’কে প্রণাম করতেন। তারপর গুরুজন ও বাড়ির বউদিদের প্রণাম সেরে জলসায় যোগ দিতেন। 
শত ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবারের কথা ভুলতেন না মহানায়ক। কারও জন্মদিন থাকলে রাতে শ্যুটিং ফেরার পথেও উপহার কিনতেন। বৈষয়িক দিকেও ছিল তাঁর কড়া নজর। তিন-চার বছর পর পর বাড়ি রং করাতেন। কারণ, নোংরা একেবারেই পছন্দ করতেন না।
আদর্শ ‘ভদ্রলোক’ ইমেজের ধারক ছিলেন উত্তমকুমার। বাঙালির গুরু। প্রথম ম্যাটিনি আইডল। প্রেমে রোমিও, বীরত্বে আলেকজান্ডার। সাদাকালোর ম্যাজিকে আজও নস্টালজিক।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ