সংবাদদাতা, রামপুরহাট: বীরভূম জেলার অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি পাথর শিল্পে এখন চরম মন্দা দেখা দিয়েছে। প্রশাসনের কড়াকড়িতে জেলাজুড়ে একের পর এক খাদান ও ক্র্যাশার বন্ধ। তার উপর বেহাল রাস্তাঘাট ও পরিবহণ-সংক্রান্ত নানা সমস্যায় পাথরশিল্পে একরকম অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্পাঞ্চলের অন্যতম উৎসব বিশ্বকর্মা পুজোয়। উৎসবের মরশুমে আনন্দের বদলে এখন রামপুরহাট, নলহাটি, পাঁচামি, শালবাদরা ও মুরারইয়ের পাথর শিল্পাঞ্চলে এক গভীর হতাশা নেমে এসেছে।
একসময় বিশ্বকর্মাপুজোর অনেক আগে থেকেই শিল্পাঞ্চলে তোড়জোড় শুরু হয়ে যেত। বড় বড় মণ্ডপ, সাউন্ড সিস্টেম, মালিক ও শ্রমিকদের একসঙ্গে ভূরিভোজ, গানবাজনা ও ঘুড়ি ওড়ানোর ছবি দেখা যেত শিল্পাঞ্চলের আনাচেকানাচে। এখন সেই ছবিটা অতীত।
রামপুরহাট পাথর ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক মুস্তাক আহমেদ বলেন, খাদান বন্ধ থাকায় প্রায় ৯০শতাংশ পাথর ভাঙার কল অচল হয়ে পড়েছে। হাতে গোনা কয়েকটি কারখানায় ঝাড়খণ্ড থেকে পাথর এনে কাজ চালানো হচ্ছে। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। বাইরের লরি না আসা, তার উপর ওভারলোড, আন্ডারলোডের কারণে বিক্রি হচ্ছে না। যাঁরা জমিজমা বিক্রি করে বা চালকের কাজ করে এখন লরির মালিক হয়েছেন, তাঁদের অবস্থা সঙ্গীন। বহু পাথর ভাঙার কল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তার জেরেই বিশ্বকর্মা পুজোর আগের মতো জৌলুস নেই।
কাঁচামালের অভাবের সঙ্গে শিল্পাঞ্চলের রাস্তার বেহাল দশাও এই পরিস্থিতির কারণ। রাস্তার দশা শোচনীয় হওয়ায় যন্ত্রাংশ খারাপ হওয়ার ভয়ে বাইরের লরি ঢুকতে চাইছে না। ফলে উৎপাদিত পাথর বিক্রি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। নলহাটি পাথর ব্যবসায়ী সমিতির প্রতিনিধি তথা বিজেপি নেতা বিপ্লব ওঝা বলেন, বাংলার খাদান বন্ধ। কয়েকটি ক্র্যাশারে ঝাড়খণ্ড থেকে পাথর নিয়ে আসা হচ্ছে। কিন্তু লরি বা ডাম্পার না ঢোকায় বিক্রিবাটা তলানিতে। তাই এবার বেশিরভাগ কারখানায় প্রতিমা ছাড়া শুধু ঘটপুজো হতে চলেছে। কোথাও কোথাও শুধু যন্ত্রের পুজো করে শ্রমিকদের কিছু অতিরিক্ত টাকা দেওয়া হবে।
মুরারইয়ের রাজগ্রাম পাথর ব্যবসায়ী মালিক সমিতির তরফে আসগার আলি বলেন, খাদান বন্ধ হওয়ায় বহু ক্রাশারও বন্ধ। শ্রমিকরা পেটের তাগিদে ভিনরাজ্যে চলে গিয়েছেন। তাই স্থানীয় হিন্দু ক্রাশার মালিকদেরও বিশ্বকর্মা পুজোয় তেমন তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে না। এই মন্দার ঢেউ আছড়ে পড়েছে মৃৎশিল্পেও। রামপুরহাটের মৃৎশিল্পী তন্ময় দাস বলেন, এবার অনেক কম সংখ্যক প্রতিমা তৈরির অর্ডার পেয়েছি। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে পাথর শিল্পাঞ্চল এলাকা থেকে। সেখান থেকে এবার একটাও প্রতিমার অর্ডার পাইনি। পাথর শিল্পাঞ্চলে কবে এই অনিশ্চয়তার মেঘ কাটবে, বিশ্বকর্মা পুজোয় আগের মতো জৌলুস ফিরবে-তারই অপেক্ষায় দিন গুণছেন অর্থসংকটে পড়া পাথর ব্যবসায়ী ও কর্মহীন শ্রমিকরা।