তন্ময় মল্লিক: শিলিগুড়ির রেগুলেটেড মার্কেটের ভিতরে কমলালেবু বিক্রি করছিলেন মনোজ ভাগত। বাড়ি কোথায় জিজ্ঞাসা করায় মনোজের উত্তর, বাড়ি যেখানেই হোক না কেন, আমরা এখন ‘বাংলাদেশি’। এমন হেঁয়ালি করে উত্তর দেওয়ার কারণ জানতে চাইতেই উগরে দিলেন একরাশ ক্ষোভ। বললেন, নিজেকে বাংলাদেশি ছাড়া কী আর বলব বলুন? কমিশন হিয়ারিংয়ে ডেকেছিল। আমার জন্ম এখানে। নয়াবস্তির ভোটার। সিরিয়াল নম্বর ৪৩৩। অপরাধ, ২০০২ সালের ভোটার লিস্টে নাম নেই। কিন্তু, ১৯৮৮ সালে খোলা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে। ২০০৩ সালে এসজেডিএ মার্কেটে নেওয়া দোকানের প্রমাণও আছে। সমস্ত কাগজ দেখিয়েছি। কিন্তু বলছে, কমিশন নির্দিষ্ট নথি দেখাতে হবে। তা না হলে নাম কাটা যাবে। কমিশনের চোখে আমরা ‘বাংলাদেশি’। আমাদের নিয়ে ছেলেখেলা হচ্ছে।
জলপাইগুড়ি শহরের কদমতলা মোড়। জমজমাট বাজার। দিনের শেষে কয়েকজন যুবক ভ্যানরিকশয় বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। সকলেরই আদি বাড়ি ছিল বিহারে। এখন প্রত্যেকেই এরাজ্যের বাসিন্দা। ভোটও দেন। তবে, এবার ভোটার থাকবেন কি না, বলা কঠিন। কারণ প্রত্যেকেই শুনানিতে ডাক পেয়েছেন। রাম পাশোয়ান নামে বছর তিরিশের এক যুবক বলেন, আমরা এখন না বিহারি, না বাঙালি। আমাদের এখন ‘না ঘর কা না ঘাট কা’ অবস্থা।
কথায় আছে, হাঁড়ির একটা ভাত টিপলেই বোঝা যায়, চাল সিদ্ধ হয়েছে কি না! এটা সত্যি হলে এই সিদ্ধান্তে আসাই যায়, কমিশনের ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ নির্ভরতার জেরে হিন্দিভাষী ভোটারদের উপর বিজেপির একচেটিয়া প্রভাব খর্ব হতে চলেছে। এরাজ্যের হিন্দিভাষীরা ধীরে ধীরে হয়ে উঠছিলেন ‘বিজেপির লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’। জয় শ্রীরাম স্লোগান তাঁদের মুখেই সবচেয়ে বেশি শোনা যেত। শুনানির হয়রানি বিজেপির হিন্দুত্বের পালের হাওয়া কিছুটা হলেও এবার কাড়বে।
এসআইআর শুরুর আগে থেকেই বঙ্গ বিজেপি এক থেকে দেড় কোটি নাম বাদ যাবে বলে হুংকার ছেড়েছিল। কিন্তু, প্রাথমিকভাবে বাদ পড়েছিল ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম। তার মধ্যে অধিকাংশই ছিল মৃত এবং স্থানান্তরিত ভোটার। এছাড়া ‘নো ম্যাপিং’ ভোটারের সংখ্যা ৩০ লক্ষ। সব মিলেও সংখ্যাটা বিজেপির বেঁধে দেওয়া টার্গেটের ধারেকাছে পৌঁছয়নি। তাই কমিশন বের করছে নিত্যনতুন কৌশল। টার্গেট হিট করতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আধার কার্ডকে মান্যতা দেওয়ার বিষয়টিও কি হচ্ছে উপেক্ষিত? কারণ আধার নম্বর দেওয়ার লিঙ্কটি রাতারাতি উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকী, বয়সের প্রমাণ হিসেবে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট বৈধ নয় বলে জানানো হল। আর সেটাও হল শুনানি বেশ কিছুদিন চলার পর। ফলে যাঁরা মাধ্যমিকের অ্যাডমিটকে বয়সের প্রমাণ হিসেবে দিয়েছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ আপাতত অন্ধকারে।
পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও উত্তরপ্রদেশ সহ ১১টি রাজ্যে এসআইআর শুরু হয়েছে। সর্বত্র এসআইআর নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তবে উত্তরপ্রদেশে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে কেউটের মুখে পড়েছে বিজেপি। খসড়া তালিকা অনুযায়ী,
যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যে বাদ গিয়েছে ২কোটি
৮৯ লক্ষ ভোটারের নাম। তারমধ্যে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৪৬ লক্ষ, স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে যাওয়া ভোটার ২ কোটি ১৭ লক্ষ। দু’জায়গায় নাম আছে প্রায় সাড়ে
২৫ লক্ষ। এসব দেখে কেউ বলতেই পারেন, চালুনি সূচের বিচার করছে।
এসআইআর আমাদের একটি নতুন শব্দবন্ধ উপহার দিয়েছে। ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’। যুক্তিসঙ্গত অসঙ্গতি। এই যুক্তিসঙ্গত অসঙ্গতির দোহাই দিয়েই কমিশন সবচেয়ে বেশি ‘অযৌক্তিক কাজ’ করছে বলে অভিযোগ। লক্ষ লক্ষ ভোটারকে শুনানিতে ডেকে পাঠাচ্ছে। সেই তালিকায় ভারতরত্ন অমর্ত্য সেন, বিশিষ্ট কবি জয় গোস্বামী, সাংসদ দীপক অধিকারী(দেব), বিজ্ঞানী, প্রাক্তন বিদেশ সচিব, প্রাক্তন মন্ত্রী যেমন আছেন, তেমনি রয়েছেন রিকশওলা, ঠেলাওলা, দিনমজুর। ডাক পেয়ে প্রতিদিন শুনানি কেন্দ্রে হাজির হচ্ছে শত শত মানুষ। পড়ছে লম্বা লাইন।
‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ আসলে নির্বাচন কমিশনের নাম বাদ দেওয়ার ‘ফাঁদ’। এরাজ্যের ভোটার তালিকা হয় বাংলা ভাষায়। ভোটারদের নাম বাংলা থেকে ইংরাজিতে ‘কনর্ভাট’ করতে গিয়েই ঘটেছে বিপত্তি। কারও নামের, কারওবা পদবির বানান ভুল হয়েছে। কেমন সেই ভুল? কয়েকটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। মঙ্গলি সর্দারের বাবার নাম তপন সর্দার। ২০০২ সালের ভোটার তালিকা এবং ইনিউমারেশন ফরমে সঠিক নাম রয়েছে। কিন্তু বিএলও অ্যাপে পদবি এসেছে সদার(Sadar)। অ্যাপের ভুলের জন্য ভোটারকে হয়রান করা হচ্ছে। একইভাবে রবিলোচন বাগদির
নাম দু’টি জায়গাতেই ঠিক আছে। কিন্তু অ্যাপে
বাগদির বদলে এসেছে বাদি(Badi)। তাই তিনিও শুনানিতে ডাক পেয়েছেন। সুকুমার মুর্মুর নাম
দু’টি জায়গায় ঠিক আছে। কিন্তু অ্যাপে মুর্মু
পদবিটাই উড়ে গিয়েছে। রয়েছে শুধু সুকুমার। তাই তিনিও ডাক পেয়েছেন। এঁরা যদি কমিশন নির্দিষ্ট
১৩টি প্রমাণের একটি দেখাতে না পারেন, তাহলে তাঁদের নাম বাদ যাবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কমিশনের অ্যাপের ভুলের দায় ভোটারদের উপর চাপানো হচ্ছে কেন? কমিশন ভুল সংশোধন না করে মানুষকে লাইনে দাঁড় করাচ্ছে। কারণ যে কোনও মূল্যে নাম
বাদ দেওয়াই উদ্দেশ্য।
ম্যাপিংয়ের পর্বে বিপুল সংখ্যক মতুয়া এবং হিন্দু ভোটার ‘সন্দেহজনক’ হওয়ায় হইচই হয়। বিজেপির মতুয়া নেতারাও এসআইআর নিয়ে তোপ দাগেন। তারপরই শুরু হয় সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার কৌশল খোঁজা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এমন সব ডেটা দিতে থাকে যাতে ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে সংখ্যালঘুদের বিশেষভাবে চিহ্নিত করা যায়। কী সেই ডেটা? নামের ও পদবির বানানে ভুল, বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের ও দাদুর সঙ্গে নাতির বয়সের ফারাক কত, সন্তান সংখ্যা ইত্যাদি। সেই সূত্রেই লক্ষ লক্ষ ভোটারকে শুনানিতে ডাকা হচ্ছে। তাতে সংখ্যালঘুরাই বেশি ডাক পাচ্ছেন। বহু বুথের ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ ভোটারকে ডাকা হয়েছে। তাতে ক্ষোভ চরমে উঠছে।
শুধু ভোটারাই নয়, বিএলওরাও প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। কমিশনের নিত্যনতুন ফরমান পালন করতে গিয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন বিএলওরা। তাঁদের সহ্যের বাঁধ ভেঙেছে। তাই বিদ্রোহী বিএলওরা কোথাও ইস্তফা দিচ্ছেন, কোথাও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ঘরে আটকে রাখছেন। কারণ শুনানির নোটিস ধরাতে গেলে রোষের মুখে পড়ছেন তাঁরাই। কাজ করছেন, আবার মারও খাচ্ছেন।
এসআইআরকে ঘিরে রাজ্যে অশান্তি বাড়ছে। বিডিও অফিস ভাঙচুর, শুনানি কেন্দ্রে আগুন লাগানো, বিএলওকে মারধর, কিছুই বাদ যাচ্ছে না।
৬ ও ৭ নম্বর ফরম জমা দেওয়া নিয়েও বিজেপি-তৃণমূলের সংঘাত বাধছে। কৌশলে বিজেপি ভিনরাজ্যের লোকজনের নাম তুলতে চাইছে। এই অভিযোগকে ঘিরে হাতাহাতি হয়েছে। নির্বাচনী
প্রচার ও ভোটের দিন মারামারি, খুনোখুনি এরাজ্যে নতুন কিছু নয়। কিন্তু, ভোটার তালিকা সংশোধন
পর্বে এমন অশান্তি বাংলা আগে কখনও দেখেনি। নির্বাচন কমিশনের তুঘলকি সিদ্ধান্তে রাজ্যে গৃহযুদ্ধ বাধার উপক্রম!
কমিশন তলে তলে ঘোঁট পাকাচ্ছে কি না, সেটা চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হলেই বোঝা যাবে। কিন্তু, বিজেপির উদ্দেশ্য পরিষ্কার। তারা চাইছে, এসআইআরের খাঁড়া সরাসরি নেমে আসুক সংখ্যালঘুদের উপর। বিজেপি এক ঢিলে দু’টি পাখি মারতে চাইছে। এক, সংখ্যালঘুদের বাদ দিলে এরাজ্যে তৃণমূলের ভোট কমবে। দুই, অন্যায়ভাবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিলেই ক্ষোভ আছড়ে পড়বে জেলায়-জেলায়। ভাঙচুর, আগুন, অবরোধ হবে। ফিরবে এনআরসি পরিস্থিতি। তখন গণ্ডগোল পাকানোর দায় সংখ্যালঘুদের উপর চাপিয়ে বিভাজনের রাজনীতির ভিত পাকা করবে। সেই উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন কমিশনকে সামনে রেখে বাংলাকে অশান্ত করতে চাইছে বিজেপি।
একুশের নির্বাচনে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়েও গোহারা হয়েছে বিজেপি। তাই দিল্লি বিজেপি এবার আঙুল বাঁকিয়ে ‘ঘি’এর স্বাদ পেতে চাইছে। নির্বাচনের মুখে তৃণমূলের সহযোগী সংস্থা আইপ্যাকের অফিসে ইডি হানা ছিল তারই অঙ্গ। রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রতিবাদে সুপ্রিম কোর্ট গিয়েছিল কেন্দ্রীয় এজেন্সি। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ‘দুর্নীতির তদন্তের নামে কোনও রাজনৈতিক দলের কাজকর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারে না ইডি। কোনও কেন্দ্রীয় এজেন্সির সেই অধিকার নেই।’ এখন এসআইআরই বিজেপির একমাত্র ভরসা। কিন্তু এসআইআর নিয়ে ক্ষোভে ফুটছে বাংলা। এই অবস্থায় ঘি খেতে গিয়ে শেষপর্যন্ত বিজেপির আঙুলটাই না পুড়ে যায়।