শান্তনু দত্তগুপ্ত: সেনগুপ্ত বাবুর নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় ছিল। কিন্তু এখন আর নেই। কেন? সেটা রহস্যজনক। তিনি ভোটও দেন। এই তো গত লোকসভা ভোটেও দিয়েছেন। তারপর কোনও এক অজ্ঞাত কারণে ২০২৫ সালের তালিকায় তাঁর নাম ছিল না। তাই স্বাভাবিকভাবে তিনি ইনিউমারেশন ফর্মও পাননি। আজ প্রকাশ পেতে যাওয়া খসড়া তালিকায় তাঁর নামও থাকবে না। এই ৬২ বছর বয়সে এসে নতুন ভোটার হিসেবে নাম তুলতে হবে তাঁকে। ৬ নম্বর ফর্ম ফিল আপ করতে হবে। ‘মুচলেকা’ দিতে হবে। তারপর সেনগুপ্ত বাবু আবার ভোটার হবেন। ‘নতুন ভোটার’ হলেও। এবং অবশ্যই হবেন। কোনওমতেই তাঁর নাগরিকত্ব প্রশ্নের মুখে পড়বে না। কারণ যতই আতঙ্ক ছড়ানো হোক না কেন, ভোটার তালিকায় নাম থাকা বা না থাকার উপর কোনও ভারতীয়ের নাগরিকত্ব নির্ভর করে না।
শুধু সেনগুপ্ত বাবু নন। তাঁর মতো বাংলার এমন ১ কোটি ৮৬ লক্ষ নাগরিকের জন্যই এই কথাটা প্রযোজ্য। অথচ, এই মুহূর্তে তাঁরা প্রত্যেকেই কমবেশি আতঙ্কে ভুগছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ জেনে গিয়েছেন যে, তাঁরা ‘নোটিশ’ পেতে চলেছেন। কেউ জানতে পারেননি। তাঁরাও জানবেন। নোটিশ পাওয়ার পর। ফোনে এবং এসএমএসে। তাঁদের বলা হবে, শুনানি আছে। অমুক জায়গায়। এসে দেখা করুন। সঙ্গে নথিও আনুন। কী সেই নথি? নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ১১টির মধ্যে যে কোনও একটি। আধার কার্ড আনতে পারেন। কিন্তু সেটা গ্রহণযোগ্য তখনই হবে, যদি সঙ্গে ওই ১১টির মধ্যে একটি আপনি সঙ্গে আনেন। শুনানি হবে। কমিশনের যদি মনে হয়, ‘আপনি থাকছেন স্যার’... একমাত্র তাহলেই ভোটার তালিকায় আপনার নাম উঠবে। আপনি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দেবেন। কিন্তু যদি নাম না থাকে? তাহলেও আপনি অ-নাগরিক হয়ে যাবেন না।
সেই অধিকার নির্বাচন কমিশনের নেই। কেন্দ্রীয়
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তাও নানাবিধ নথি যাচাই এবং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। কাজেই এসআইআরের পর তালিকায় নাম না উঠলে সেই ব্যক্তি খুব বেশি হলে এবার ভোটটুকু দিতে পারবেন না। এর বেশি কিছুই হবে না।
তাহলে প্রশ্ন হল, এই এসআইআর নিয়ে নাগরিকত্বের ধুয়ো উঠল কেন? এখানেও ক্রোনোলজি বুঝতে হবে। এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ভাষণ। বেশ কয়েক মাস ধরেই তিনি হুংকার ছেড়ে এসেছেন, একজনও ‘ঘুসপেটিও’কে ভোট দিতে দেওয়া হবে না। অর্থাৎ, অনুপ্রবেশকারী। শাহি বক্তব্য, তারপর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘোষণা, একের পর এক বিজেপি নেতার দাবি এবং ‘বাংলাদেশি-রোহিঙ্গায় পশ্চিমবঙ্গ ভরে গিয়েছে’ জাতীয় প্রচারে গেরুয়া আইটি সেল। এই পুরো ঘটনাক্রমের পরই প্রথমে বিহারে এসআইআরের ঘোষণা, আর তারপর বাংলায়। এই এসআইআরের পর লাভক্ষতির হিসেব-নিকেশ যদি কাউকে করতে হয়, তাহলে সে আম আদমি নয়। স্রেফ রাজনৈতিক দল। কোন কেন্দ্রে কত ভোটার বাদ গেল, মৃত ভোটার কতজন ছিল, ভুয়ো ভোটার ছিল কি না, কত ভোটার স্থানান্তরিত হয়ে গিয়েছে... এইসব প্রশ্নে ভোটব্যাংক নির্ভর করে। সাধারণ মানুষের নাগরিকত্ব নয়।
নাগরিক শব্দের আড়ালে জমা থাকে বহু যন্ত্রণা, স্ট্রাগল, মানিয়ে নেওয়া। পরিবারের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে, রাজনীতির সঙ্গে, আবার রাষ্ট্রের সঙ্গেও। শখে নয়... দেশভাগের পর কাতারে কাতারে মানুষ এপার বাংলায় চলে এসেছিল প্রাণের তাড়নায়, পেটের জ্বালায়, ইজ্জত খোওয়া যাওয়ার আতঙ্কে। ঋত্বিক ঘটকের ‘নাগরিক’ ছবিতে রামু যখন কাজের খোঁজে পথে বেরয়, প্রতি পদক্ষেপে ফেটে বেরয় তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। পিঠের বোঝা হয়ে সঙ্গে চলে তার অতীতের স্বচ্ছলতা, মায়ের কষ্ট, বাবার অসুখ। নগরের রাজপথে রামু নামটা স্রেফ একটা প্রতীক হয়ে থেকে যায়। তার মতো লাখো লাখো মুখের লড়াইটাই হয়ে যায় মুখ্য। বেঁচে থাকার লড়াই। সে কি নাগরিক নয়? সে কি রাষ্ট্রবিরোধী? তা তো নয়। উদ্বাস্তু সমস্যা সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলির ভাতের সঙ্গে ডালের মতো। আগেও ছিল। আজও আছে। দেশভাগ বা মুক্তিযুদ্ধের পর হয়তো বেশি ছিল, এখন কম। কিন্তু আজও বহু মানুষ পেটের টানে এদেশে চলে আসেন। রাষ্ট্র যদি তাদের এই ‘পারাপারে’র স্বার্থ খুঁজে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে অসুবিধা নেই। আইন যদি যুক্তিসংগতভাবে কাজে লাগানো হয়, তাহলেও না। কিন্তু তার জন্য যদি শুধু ধর্মই নাগরিকত্ব বিচারের একমাত্র মাপকাঠি হয়, তাহলে নাগরিক হিসেব আপত্তি আছে মশাই। আজ তিন প্রজন্ম এদেশে
বাস করার পরও যদি কোনও এক শেখ হবিবুরকে বলা হয়, এসআইআরে তোমার নাম থাকবে না।
আর তারপরই তোমাকে পুশব্যাক করা হবে।
তাহলে কি তার পক্ষে এ কথা মেনে নেওয়া সম্ভব? একটা মাত্র তালিকার সঙ্গে তার ভোটার কার্ড লিঙ্ক করা গেল না মানেই কি সে অ-নাগরিক হয়ে গেল? না, হল না। হতে পারে না। সংবিধান কোনও সরকারকে সেই ক্ষমতা দেয়নি।
আসলে গোটা বিষয়টাই নির্বাচন নির্ভর। ভোটার কাটছাঁট করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার ‘যন্ত্র’ ছাড়া এসআইআর অন্য কিচ্ছু নয়। কোনও দল এতে বেশি সুবিধা পাবে। কোনও দল কম। কিন্তু এর নামে সাধারণ মানুষের মধ্যে যেভাবে আতঙ্কের বীজ রোপণ করা হয়েছে, তা মেনে নেওয়া যায় না। হাতের পাঁচটা আঙুল সমান হয় না। তেমনই প্রত্যেক নাগরিকের মানসিকতাও এক হয় না। মননের দুর্বলতা তাড়া করে তাদের সর্বত্র। তারই ফল, একের পর এক মৃত্যু। আত্মহত্যা। এটা কী বলবে রাজনৈতিক দলগুলি? কী বলবে কেন্দ্র? কী বলবে কমিশন? কো-ল্যাটেরাল ড্যামেজ? ব্যাস! তারপরই কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ?
মৃত, স্থানান্তরিত কিংবা ভুয়ো ভোটার তালিকা থেকে আলবাৎ বাদ যাওয়া উচিত। কিন্তু সেটাও তো অটোমেটিক প্রসেস! তা কেন হয়নি এখনও? নতুন ভারত, ডিজিটাল ভারত... অথচ, মৃত্যুর পর কেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাবে না? কেন সেই নজরদারি থাকবে না? একই ভোটারের নাম দু’-তিন রাজ্যে থাকবে কেন? কীভাবে একই ব্যক্তি হরিয়ানায় ভোট দেওয়ার পর দিল্লিতেও দেবেন? এইসব প্রশ্নের উত্তর কেন্দ্রীয় সরকার দেবে না। তাহলে কে দেবে? আম আদমি। কারণ তারা প্রতিবাদ করবে না। আর করলেও সেই প্রতিবাদ দিল্লির দরবারে পৌঁছোবে না। তারা ছুটবে সরকারি দপ্তরের দরজায় দরজায়। কাঁদবে। তারপর হয়তো কোনও এক ট্রেন লাইনের সামনে ঝাঁপ দেবে। সরকার কী দেখবে? ভোটার তালিকা থেকে একটা নাম বাদ গেল। আর সঙ্গে ছোট্ট একটা হিসেব—কার ভোটার ছিল? বিজেপির? সিপিএমের? নাকি তৃণমূলের? তার পরিবারটা ভেসে কোথায় গেল, সেই খোঁজ কিন্তু শাসক রাখবে না। তারা ভুলে যাবে, ওই লোকটাও এদেশের নাগরিকই ছিল। ঠিক কোনও রাজনৈতিক দলের সভাপতির মতো। সিনেমাওয়ালার মতো। ভারতের জাতীয় দলের অধিনায়কের মতো। কিংবা ছ’জন কমান্ডো পরিবৃত মন্ত্রীর মতো। সাম্যবাদের দেশে অসাম্য মাথাচাড়া দেবে। কিন্তু গোপনে। সাধারণের হতাশায়। আক্ষেপে।
এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, এসআইআর এবং বিধানসভা নির্বাচন শেষ হয়ে গেলেই এনআরসি নিয়ে তোড়জোড় শুরু হবে। সেই অঙ্ক দিল্লির উপরতলায় কষা শুরুও হয়ে গিয়েছে। সেই উপায় কেন্দ্রের হাতে আছেও। ২০০৩ সালের আইন। যদি সেটা কার্যকর হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে নাগরিকত্ব রক্ষার। নিজেকে আরও একবার রাষ্ট্রের সামনে প্রমাণ করার। কিন্তু এসআইআর? সেই অঙ্কে আসে না। আসবেও না। এর মাধ্যমে শুধু আম জনতার করের কোটি কোটি টাকা খরচ হবে। জনবিন্যাস বদলাবে। ভোটার কমবে। নিরন্তর প্রক্রিয়ায় যা ‘অটো পাইলট’ মোডেই সম্ভব ছিল, তার জন্য চূড়ান্ত ভোগান্তির মুখে পড়বে মানুষ। কিন্তু নাগরিকত্ব যাবে না। যারা সত্যিই অনুপ্রবেশকারী... তারা তো এদেশের নাগরিক কখনও ছিলই না! তাই তাদের জন্য কান্নাকাটির প্রশ্নই নেই। কিন্তু প্রায় যে দু’কোটি মানুষকে চরম হেনস্তার মুখে আজ থেকে পড়তে হবে, তাদের ৯৯ শতাংশই কিন্তু এদেশের নাগরিক। ওই রাজনৈতিক দলকেই ভোট দিয়ে দিল্লির সরকারে পাঠিয়েছে। আশা করেছে, এবার আচ্ছে দিন আসবে। বেকারত্ব দূর হবে। মূল্যবৃদ্ধির জ্বালা থেকে মুক্তি মিলবে। খেয়াল রাখবেন, তাদের হতাশা যেন ক্ষোভের বিস্ফোরণ হয়ে আঘাত না হানে। ‘নাগরিক’ কোনও জেলা-রাজ্য থেকে আমদানি হয় না। নাগরিকের জন্ম হয় মাটিতে, কর্তব্যে, অধিকারে, সম্মানে। তার সেই সম্মান কেড়ে নেওয়ার প্রচারটাও অপরাধ। দণ্ডনীয় অপরাধ।