নিজস্ব প্রতিনিধি, রানাঘাট: ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে বাঁচতে কেউ বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন দু’দশক আগে, কেউ আবার তারও আগে। ভিটেমাটি ছেড়ে আশ্রয়ের খোঁজে ভারতে এসে গড়ে তুলেছিলেন জীবনের নতুন ঠিকানা। কিন্তু, আজ জীবনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে সেই মানুষজনকেই ফের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সীমান্তঘেঁষা রানাঘাট-২ ব্লক অফিসে এসআইআর শুনানির প্রথম দিনেই যেন ভেসে উঠল দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে আত্মপরিচয় হারানো উদ্বাস্তু জীবনের করুণ ছবি। অধিকাংশই মতুয়া সম্প্রদায়ের, সঙ্গে কিছু বৈষ্ণব ও নমঃশূদ্র, যাঁরা একসময় ধর্মের কারণে নির্যাতিত হয়ে দেশ ছেড়েছিলেন। এদেশে আশ্রয়ের দুই–তিন দশক পরেও নাগরিকত্ব প্রমাণের তাগিদে অসুস্থ, অক্ষম শরীর নিয়ে শুনানির লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে তাঁদের।
কথা হচ্ছিল ষাটোর্ধ শচীন্দ্রনাথ সরকারের সঙ্গে। বর্তমানে তিনি হিজুলি-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের জাফরনগরের বাসিন্দা। জন্ম থেকে যৌবনের প্রথমার্ধ কেটেছে বাংলাদেশের রাজবাড়ি জেলার পাংশা থানা এলাকায়। ধর্মের কারণে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল তাঁর ন্যূনতম সম্বল। কেবল প্রাণে মারেনি। ‹প্রাণভিক্ষা› দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এদেশে। তারপর প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে এদেশে বসবাস করছেন। অনায়াসেই ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম উঠতে পারত। কিন্তু পুঁথিগত বিদ্যার অভাব এবং উদাসীনাতার কারণে তা হয়নি। হবেই বা কীভাবে? ভোটার তালিকায় নাম তোলার আগে পেটের খিদে মেটানোই শচীন্দ্রনাথবাবুর লক্ষ্য ছিল। তাই শুনানির লাইনে দাঁড়িয়ে চোখের কোণে আসা জল মুছতে মুছতে আক্ষেপ করে বললেন, ‹সেদিন যদি জানতাম কাগজটাই এত দামি হবে তাহলে ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য লাইন দিতাম। তবে তাঁর আস্থা নেই সিএএ-তে। তাই আবেদন করেননি সেখানে।
শুনানিতে এসেছেন মতুয়া সম্প্রদায়ের সুবলচন্দ্র বিশ্বাস। সুবলবাবু বাংলাদেশ ছেড়ে আড়াই দশক আগে চলে এদেশে এসেছিলেন। পেশা বলতে মতুয়াদের ধর্মানুষ্ঠানে নামগান। তিনি বলেন, সেই কতদিন আগে এদেশে এসেছি। হঠাৎ করে আমার স্ত্রী এবং পরিবারের লোকজনদের ডাক পড়েছে। সিএএ-তে আবেদন করেছি। কিন্তু, আশা দেখছি না। দুশ্চিন্তায় রাত যেন কাটতে চাইছে না। জানি না পরিবার নিয়ে ফের পথে বসতে হবে কি না! শঙ্করপুর গ্রামের বাসিন্দা কানাই বিশ্বাস বলেন, বাংলাদেশে অত্যাচারিত হওয়ার কারণেই তো এদেশে আসতে বাধ্য হয়েছিলাম। কিন্তু, এখানেও রেহাই মিলল কই? ডাক পড়েছে এসআইআরে শুনানিতে। সিএএ-তে আবেদন করিনি। জানি না অদূর ভবিষ্যতে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে! লাইনে দাঁড়ানো অনেকে বলেন, ভোট দিয়ে যাদের ক্ষমতায় আনলাম তারাই আমাদের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চাইছে। ভোটাধিকার চলে গেলে সমস্ত সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হব। যদি নাগরিকত্ব মেলে তা কবে মিলবে, আদৌ মিলবে কি না জানি না।