প্রধানমন্ত্রী সিঙ্গুর ঘুরে যাওয়ার ১০দিনের মাথায় সভা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সিঙ্গুরে প্রধানমন্ত্রীর সভার দিন ঘোষণা হতেই বিজেপির নেতাকর্মীরা এক বুক প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। কীসের অপেক্ষা? বিজেপি ক্ষমতায় এলে সিঙ্গুরে শিল্প হবে, এমন কথাই শুনতে চেয়েছিলেন তাঁর মুখ থেকে। বঙ্গ বিজেপির নেতারা ভাষণে সেই প্রসঙ্গ তুলে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে মনে করিয়েও দিয়েছিলেন। কিন্তু সযত্নে এড়িয়ে গিয়েছেন, ঠিক যেমনটি মতুয়াগড় রানাঘাটের সভায় মুখেও আনেননি মতুয়াদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রসঙ্গ। জমি আন্দোলনের মাটিতে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যবাসীকে উপহার দিলেন ৩৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, দিলেন সিঙ্গুরে অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি গড়ার আশ্বাস এবং ঘোষণা করলেন এসআইআর-এর বিরুদ্ধে জেহাদ। বুঝিয়ে দিলেন ছাব্বিশে বিজেপিকে কোণঠাসা করতে অলআউট’ লড়াইয়ের জন্য তিনি প্রস্তুত। এবারের ‘খেলা’ ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে।
বাংলার রাজনীতির পালাবদলে সিঙ্গুরের কৃষক আন্দোলনের অবদান অনস্বীকার্য। খেতমজুর, প্রান্তিক চাষি ও খেটেখাওয়া মানুষের বিশ্বাসের উপর তৈরি বাম সাম্রাজ্যের ভিতে ফাটল ধরিয়েছিল সিঙ্গুরের কৃষিজমি রক্ষার আন্দোলন। টাটাদের কারখানার জন্য জোর করে উর্বর কৃষিজমি কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াই শুধু সিঙ্গুরের নয়, গোটা দেশের চাষিদের দেখিয়েছিল নতুন দিশা। চাষিরা জানেন, জমির অধিকার বর্তায় বংশানুক্রমে। কিন্তু চাকরির সুফল মেলে বড়োজোর ২৫ থেকে ৩০ বছর। অর্থাৎ একপুরুষেই সব শেষ।
একথা ঠিক, কোনো রাজ্য বা দেশ শুধু কৃষির উপর নির্ভর করে উন্নতির শীর্ষে উঠতে পারে না। তারজন্য শিল্প, কলকারখানা আবশ্যক। বাংলার প্রতিটি মানুষ চায় এরাজ্যে শিল্প হোক। তাঁদের সন্তানরা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ শেষে সেখানে কাজ পাক। কিন্তু শিল্পের জন্য নিজের চাষের জমি ছাড়তে চান কি না প্রশ্ন করলে উত্তর আসে, ‘না’। এর অর্থ, আমরা শিল্প চাই। তবে তা হোক অন্যের জমিতে। অন্যের জমিতে হওয়া শিল্পে কাজ করবে তাঁদের সন্তানরা। ‘গাছেরও খাব তলারও কুড়াব’ মানসিকতার মানুষের সংখ্যাই এ জগতে বেশি।
সিঙ্গুরে কারখানার জন্য জমি দিয়েছিলেন তাঁরাই যাঁরা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদের আলে কোনোদিন পা দেননি। কিন্তু, সিঙ্গুরের প্রকৃত চাষিদের কাছে জমি হল জীবন ও জীবিকার ‘ফিক্সড ডিপোজিট’। তা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদে ও মূলে বাড়ে। তাই টাটাদের কারখানা রাজ্য থেকে যাওয়ায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গায়ে ‘শিল্পবিরোধী’ তকমা লাগানোর মরিয়া চেষ্টাও হালে পানি পায়নি। সিঙ্গুরের চাষিরা উপলব্ধি করেছেন, জমি বাঁচানোর লড়াইটা আসলে অধিকার সুরক্ষিত রাখার সংগ্রাম। লড়াইয়ের সামনের সারিতে ছিলেন স্বয়ং তৃণমূলনেত্রী। সেই কৃতজ্ঞতা থেকেই প্রতিটি নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রার্থীকে জিতিয়ে চলেছে সিঙ্গুর। আর যিনিই তার বিরোধিতা করেছেন তাঁর ঠাঁই হয়েছে ‘রাজনীতির ডাস্টবিনে’ অথবা নিতে হয়েছে ‘রাজনৈতিক সন্ন্যাস’।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই সিঙ্গুরে জমি বাঁচানোর লড়াইয়ের সঙ্গে বাংলায় এসআইআর বিরোধী আন্দোলনের মিল খুঁজে পাচ্ছেন। তাঁদের মতে, দু’টি লড়াইয়ের প্রেক্ষিত ভিন্ন হলেও আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য এক। অধিকার থেকে উৎখাতের বিরুদ্ধে সরব প্রতিবাদ। বামফ্রন্ট সরকার সিঙ্গুরের চাষিদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল জমির অধিকার। তাতে শুধু সিঙ্গুরের নয়, গোটা রাজ্যের চাষিরাই আতঙ্কিত হয়েছিলেন। তাঁরা বুঝেছিলেন, শিল্পপতি গোষ্ঠীর মুনাফার জন্য জমি কেড়ে নেওয়ার উদ্যোগ ঠেকাতে না পারলে পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর। তাঁরাও একদিন বিপদে পড়বেন। তাই ‘ঘুঁটে’ পোড়ার সময় ‘গোবর’ মুচকি হাসি হাসেনি। উলটে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছিল। সিঙ্গুরের জমিরক্ষার আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন গোটা রাজ্যের চাষি। তাতেই সরতে শুরু করেছিল তিন দশকের বাম সাম্রাজ্যের ভিতের মাটি। ‘কৃষি আমাদের ভিত্তি শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ’ স্লোগান দিয়েও আটকানো যায়নি বামেদের ‘ভূমিক্ষয়’।
এবার এসআইআরকে হাতিয়ার করে বিজেপি কেড়ে নিতে চাইছে বাংলার মানুষের অধিকার। নাগরিকত্বের অধিকার। বংশ পরম্পরায় যাঁরা এরাজ্যের বাসিন্দা, দেশের নাগরিক, তাঁদেরও ডাকা হচ্ছে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে। প্রাথমিকভাবে মৃত ও স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ায় প্রতিবাদ হয়নি। উলটে অনেকেই তাকে সমর্থন করেছিলেন। তারপর ‘নো ম্যাপিং’। সেখানেও নাম পাওয়া গিয়েছিল প্রায় ৩০ লক্ষ। তা নিয়ে চর্চা হলেও প্রতিবাদ হয়নি। কারণ অবৈধভাবে এদেশে আসা লোকজনের নাগরিকত্ব পাওয়ার বিরুদ্ধে রাজ্যের অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু, লক্ষ্যপূরণ হয়নি বিজেপির। তাই তৈরি হল ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’র তালিকা। সেই সুবাদেই চলছে লক্ষ লক্ষ ভোটারকে শুনানিতে ডেকে হেনস্তা করা। বাদ যাচ্ছেন না হেমব্রম, টুডু, মুর্মু পদবির লোকজনও। অর্থাৎ আদিবাসীরা। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ‘সন্দেহজনক ভোটারে’র সংখ্যা। বাড়তে বাড়তে এখন প্রায় দেড় কোটি।
অনেকে বলছেন, টাটাদের কারখানার জন্য সিঙ্গুরের চাষিদের জমি জোর করে ঘিরে নেওয়ার পর চাষিদের অধিকার ছিনতাইয়ের লোভ আকাশ ছুঁয়েছিল। তাই হাত বাড়িয়েছিল নন্দীগ্রামের দিকে। তার পরিণতি কী হয়েছে, সকলেরই জানা। একইভাবে রাজ্যবাসীর নাগরিকত্ব হরণের নেশা চেপে বসেছে বিজেপির মাথায়। তাদেরই অঙ্গুলি হেলনে কমিশন বাড়িয়ে চলেছে ‘সন্দেহজনক ভোটারে’র সংখ্যা। তাতে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, আদিবাসী, কেউই বাদ যাচ্ছে না। এক্ষেত্রেও বঙ্গ বিজেপির পরিণতি এরাজ্যের বামেদের মতোই হবে। কমিশনকে সামনে রেখে বিজেপি যে ‘ক্রিয়া’ ঘটাচ্ছে তার বিপরীত ‘প্রতিক্রিয়া’ ভোগ করতে হবে তাদের। এটা অনুমান বা আশঙ্কা নয়, বিজ্ঞান।
এসআইআর নিয়ে রাজ্যের সাধারণ মানুষের মধ্যে যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে তা উগরে দিতে দিল্লি যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার সহ কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে তাঁর দেখা করার কথা। সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন শ্রদ্ধেয় ও বিশিষ্টজনদের শুনানির চিঠি ধরানোর প্রমাণ। দিল্লি যেতে পারেন কমিশনের চোখে ‘মৃত’ ভোটাররাও। সিঙ্গুরের মঞ্চে তাঁর রণং দেহি মেজাজ বুঝিয়ে দিয়েছে, এসআইআরের নামে বাংলার মানুষের লাগাতার হয়রানির একটা হেস্তনেস্ত চাইছেন তিনি। ফলে শুধু তৃণমূল কর্মী সমর্থকরাই নন, বাংলার লক্ষ লক্ষ ভুক্তভোগী তাকিয়ে আছেন ২ ফেব্রুয়ারির দিকে। অনেকে বলছেন, কমিশনের কাছ থেকে সন্তোষজনক উত্তর না পেলে ডাক দিতে পারেন আন্দোলনের। বসতে পারেন ধরনায়। কারণ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে হ্যাটট্রিক করলেও এখনও তিনি ‘স্ট্রিট ফাইটার’।
মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াইকে সপ্তমে তোলার পাশাপাশি বিদ্যুৎ গতিতে বাড়িয়ে চলেছেন সামাজিক প্রকল্পে বেনিফিসিয়ারির সংখ্যা। সিঙ্গুরের মঞ্চ থেকে ৩৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প রাজ্যবাসীকে উপহার দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ৬১৬টি প্রকল্পের, পূরণ করেছেন ১০৭৭টি। বুঝিয়ে দিয়েছেন, ‘গাজর’ ঝোলানোর রাজনীতি তাঁর নাপসন্দ। ২০লক্ষ পরিবারের হাতে তুলে দিয়েছেন ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পে ২৪ হাজার কোটি টাকা। শিলান্যাস করেছেন বহু কাঙ্ক্ষিত ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের। অথচ এই দু’টি প্রকল্পেই আর্থিক সাহায্য করার কথা কেন্দ্রীয় সরকারের। কিন্তু, কানাকড়ি ঠেকায়নি।
একুশের নির্বাচনে গোহারা হওয়ার পর থেকেই নানান অজুহাতে বাংলার টাকা আটকে দিচ্ছে মোদি সরকার। বন্ধ ১০০দিনের কাজ। আটকেছে আবাস যোজনার টাকা। সেখানে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের টাকা দেবে কেন্দ্র? ভাবাটাও মূর্খামি! তবে, তাতেও বন্ধ হয়নি কোনও প্রকল্প। আগেই ১২ লক্ষ পরিবারকে দিয়েছেন বাড়ি তৈরির টাকা। তার সঙ্গে যুক্ত হল আরও ২০লক্ষ পরিবার। একই সঙ্গে প্রতিশ্রুতিমতো আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করে দিলেন ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের কাজ।
এই মুহূর্তে রাজ্যে চালু রয়েছে ৯৪টি সামাজিক প্রকল্প। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালু করা প্রকল্পের সুবিধা পান না, এমন পরিবারের সংখ্যা নগণ্য। কেন্দ্রীয় সরকার টাকা না দিলেও সমস্ত সামাজিক প্রকল্প শুধু চালুই রাখেননি, উত্তরোত্তর বাড়িয়ে চলেছেন। কারণ তাঁর হাতে সিবিআই নেই, নেই ইডির মতো প্রবল শক্তিশালী এজেন্সি। তাঁর ভরসা রাজ্যের সাধারণ মানুষ। তাই যখনই তারা বিপদে পড়েছে, তখনই লড়াইটা নামিয়ে এনেছেন রাস্তায়। সেক্ষেত্রে কখনো তাঁর প্রতিপক্ষ কেন্দ্রীয় এজেন্সি, কখনো কমিশন, কখনো কেন্দ্রীয় সরকার। প্রতিপক্ষ যেই হোক না কেন, লড়াইটা করেন বুক চিতিয়ে। সেটা টের পাচ্ছেন নির্বাচন কমিশনারও। বিহারে ‘রেড কার্পেটে’র মসৃণ রাস্তায় হেঁটে লক্ষ্যে পৌঁছলেও বাংলায় ধাক্কা খাচ্ছেন পদে পদে। সেটা আরও ভালো করে বুঝবেন যখন হবেন বাংলার ‘স্ট্রিট ফাইটারে’র মুখোমুখি।