পিনাকী ধোলে, বোলপুর: ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গান গাওয়ায় রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়েছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী বিজেপির হিমন্ত বিশ্বশর্মা। শনিবার সেই গান গেয়েই প্রতিবাদ জানালেন বিশ্বভারতীর পড়ুয়ারা। পড়ুয়াদের সদর্প ঘোষণা, ‘পারলে আমাদের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়ের করে দেখাক বর্বর বিজেপি সরকার। এদিন অসমের মুখ্যমন্ত্রীর ছবিও পোড়ানো হয়। পড়ুয়াদের দাবি, ওই গান বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হতে পারে। কিন্তু তা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টি। এই গান বাংলার গান। সেই গান গাওয়ায় কারও বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়ের অর্থ রবীন্দ্রনাথকে অপমান করা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই অপমান কোনওভাবেই মেনে নেবে না তাঁর স্বপ্নের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
অসমে দলীয় বৈঠকে আমার সোনার বাংলা গানটি গেয়েছিলেন এক কংগ্রেস নেতা। সেই অপরাধেই ওই প্রবীণ নেতাকে ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দিয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপি। কারণ, কবিগুরুর লেখা এই গানটিরই প্রথম দশ লাইন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। সেজন্যই রীতিমতো সাংবাদিক বৈঠক করে ওই নেতার বিরুদ্ধে পুলিশকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়েছেন স্বয়ং অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। তাঁর দাবি, বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে ভারতের নাগরিক ও দেশের জাতীয় সঙ্গীতের অসম্মান হয়েছে। এরাজ্যের বিজেপি নেতা সজল ঘোষও একধাপ এগিয়ে শুনিয়েছেন, ভারতবর্ষের মাটিতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া অপরাধ। ছাব্বিশের নির্বাচনের পর আর এসব চলবে না।
এদিন বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন বিশ্বভারতীর পড়ুয়ারা। ক্যাম্পাসের প্রথম গেটে বিক্ষোভ দেখান বিশ্বভারতীর এসএফআই ইউনিটের সদস্যরা। সেখান থেকে অসমের মুখ্যমন্ত্রীর ছবি পোড়ানো হয়। বিশ্বভারতীর পড়ুয়া তথা এসএফআইয়ের বিশ্বভারতী লোকাল কমিটির সম্পাদক বান্দুলি কারার, দেবজিৎ বুট বলেন, বিজেপি অশিক্ষিত, বর্বর, স্বৈরাচারীদের দল। তাদের রবীন্দ্রনাথ সহ্য হবে না, এটাই স্বাভাবিক। এদের চিহ্নিত করে সমাজচ্যুত করতে হবে। এদের ডিএনএতে সমস্যা আছে। পড়ুয়া রিকিতা পারিহাল বলেন, বিজেপি বাংলা ও বাঙালি বিদ্বেষী একটা দল। বিজেপি নেতারা জানেন না আমার সোনার বাংলা গানটি বাংলাদেশ তৈরির বহু আগে কবিগুরু লিখেছিলেন। এই গান মানবতার গান। অসমের মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য প্রসঙ্গে ঠাকুর পরিবারের সদস্য তথা প্রবীণ আশ্রমিক সুপ্রিয় ঠাকুর বলেন, ‘এই ধরনের মন্তব্য অশিক্ষার পরিচয়। যাঁরা এসব কথা বলেন তাঁরা বাংলার ইতিহাস জানেন না, রবীন্দ্রনাথ বোঝেন না।’
রবীন্দ্র গবেষকদের দাবি, বিজেপি যে উগ্র জাতীয়তাবাদের আদর্শ বয়ে বেড়াচ্ছে তারই চরম বিরুদ্ধে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবিগুরু মনে করতেন, উগ্র জাতীয়তাবাদ মানবতার আশীর্বাদ নয়, সভ্যতার সংকট। তাই জাতীয়তাবাদের নামে অন্য রাষ্ট্রের প্রতি ঘৃণা বা বিদ্বেষ ছড়ানো নয়, বরং শুধু নিজের দেশের গণ্ডি ভেদ করে বিশ্বের সঙ্গে মিলনের উৎসবে তিনি সকলের চৈতন্যকে জাগাতে চেয়েছিলেন। দেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা সবসময় বলতেন, দেশপ্রেম মানবতার ঊর্ধ্বে হতে পারে না। দেশকে ভালোবাসা অর্থাৎ সব ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে গিয়ে দেশের মানুষকে অকৃত্রিমভাবে ভালোবাসা। দেশপ্রেমের নামে অন্য কোনও দেশকে কোনওভাবে ছোট করা ছিল তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ। এসব যদি গেরুয়া নেতারা একটু বুঝতেন! নিজস্ব চিত্র