সংবাদদাতা, লালবাগ : মায়ের পিছনের চালি ও উপযুক্ত সাজ কেনার খরচের টাকা জোগাড় হচ্ছিল না। ফলে পুজোর উদ্যোক্তারা খরচ কমাতে মা কালীকে ভৈরবী রূপে আরাধনার সিদ্ধান্ত নেন। সেই থেকেই লালবাগের প্রাচীন কালীপুজোরগুলির মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে জিয়াগঞ্জের জটাকালী। প্রায় একশো বছরের প্রাচীন এই পুজো ঘিরে উৎসবে মাতেন জিয়াগঞ্জ শহরের আট থেকে আশি। ভক্তরা জটাকালীকে অত্যন্ত জাগ্রত দেবী বলে মানেন। প্রতি বছর দীপান্বিতা অমাবস্যার রাতে জিয়াগঞ্জের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ আসেন মাকে মানতের পুজো দিতে। শাক্তমতে এই পুজো হলেও এখানে দেবীকে আমিষ ভোগ দেওয়া হয় না। খিচুড়ি ও নিরামিষ বিভিন্ন পদ দিয়ে ভোগ নিবেদন করা হয় মাকে।
জটাকালী দেবীর মূল বৈশিষ্ট্য হল, পুজোর পরে মৃন্ময়ী মাকে মন্দিরে রেখে নিত্যপুজো চলে। দীপান্বিতা অমাবস্যায় পুজোর দু’দিন আগে পুরনো কালীমূর্তি মন্দিরের বাইরে বের করে নিয়ে আসা হয়। ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার দিন একাধিক ঢাক সহযোগে এক বছরের পুরনো প্রতিমা ভাগীরথী নদীতে নিরঞ্জন করা হয়।
জানা গিয়েছে, স্থানীয় এক প্রভাবশালীর হাত ধরে জিয়াগঞ্জের জটাকালীর পুজো শুরু হয়। এই দেবী প্রথমে জটাকালী নামে পরিচিত ছিলেন না। সেই সময় খুব আড়ম্বর ও জাঁকজমকের মধ্য দিয়ে শ্যামাকালীর পুজো হতো এখানে। কালীপুজো উপলক্ষ্যে নাটক, যাত্রা হতো। কলকাতা থেকে নাটক ও যাত্রার দল যেত জিয়াগঞ্জে।
তবে পরবর্তীতে এই শ্যামাকালী জটাকালীতে রূপান্তরিত হন। এলাকার প্রবীণ বাসিন্দাদের মতে, স্থানীয় ওই প্রভাবশালী ব্যক্তি বেশ কয়েক বছর ধরে এই পুজো চালান। কিন্তু পরবর্তীতে বয়সের ভারে পেরে উঠছিলেন না। ফলে পুজো বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর স্থানীয় বাসিন্দারা ফের পুজো শুরুর উদ্যোগ নেন। জিয়াগঞ্জের সিংহ বাহিনী মন্দির সংলগ্ন ফাঁকা জায়গায় ছোট আকারে পুজো শুরু হয়। বর্তমানে ওই জায়গাতেই পাকা মন্দির হয়েছে। ১৯৭৩ সাল থেকে মাটির বড় মূর্তি গড়ে জটাকালীর পুজো হচ্ছে। মায়ের মাথার চুল অত্যন্ত ঘন ও কোঁকড়ানো। মাথার উপরে খোপা এবং পিছন দিকে কেশরাশি বিস্তৃত। দেখে মনে হয় মায়ের মাথায় জটা রয়েছে।
পুজোর প্রধান উদ্যোক্তা উদয় সাহার কথায়, মা এখানে ভৈরবী। স্বাভাবিকভাবেই শোলার গয়নার পরিবর্তে মাকে জবাফুলের মালা, রুদ্রাক্ষ দিয়ে সাজানো হয়। মাথার উপরে গোল করে বাঁধা খোপা, গলা এবং দু’হাতে রুদ্রাক্ষের মালা থাকে।
পুজোর দিন রাতে এক কুইন্ট্যাল পঞ্চাশ কেজি চালের খিচুড়ি রান্না করে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। পরের দিন সকাল থেকে মাকে দর্শন করতে আসা সব ভক্তদের মধ্যে বিলি হয় প্রসাদ। ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার দিন কয়েক হাজার মানুষকে বসিয়ে লুচি, তরকারি, বোঁদের ভোগ খাওয়ানো হয়। বিকেলে মায়ের বিসর্জনে শোভাযাত্রা করে হাজার, হাজার মানুষ শামিল হন। মাকে নিয়ে জিয়াগঞ্জ শহর পরিক্রমা
করে রাতে সদরঘাটে নিরঞ্জন হয় প্রতিমার। -নিজস্ব চিত্র