কৌশিক মজুমদার: ‘আজ ষষ্ঠী; বাজারে শেষ কেনাবেচা, মহাজনের শেষ তাগাদা, আশার শেষ ভরসা। আজ আমাদের বাবুর বাড়িরও অপূর্ব শোভা; সব চাকর-বাকর নতুন তক্কা, উর্দী ও কাপড় পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, দরজার দুই দিকে পূর্ণকুম্ভ ও আম্রসার দেওয়া হয়েচে, ঢুলীরা মধ্যে মধ্যে রোশনচৌকি ও শানাইয়ের সঙ্গে বাজাচ্চে, জামাই ভাগ্নে বাবুরা নতুন জুতো ও নতুন কাপড় পরে ফররা দিচ্ছেন, বাড়ির কোন বৈঠকখানায় আগমনী গাওয়া হচ্চে, কোথাও নতুন তাসজোড়া পরকানো হচ্চে, সমবয়সী ও ভিক্ষুকের মেলা লেগেচে, আতরের উমেদারেরা বাবুদের কাছে শিশি হাতে করে সাত দিন ঘুচ্চে, কিন্তু বাবুদের এমনি অনবকাশ যে দু-ফোঁটা আতর দানের অবসর হচ্চে না’
প্রায় দেড়শো বছর আগে তাঁর বিখ্যাত নকশায় কলকেতার ষষ্ঠী নিয়ে এমনটাই লিখছেন হুতোম। সেকালের বহু লেখায় বারবার ঘুরেফিরে আসে দুর্গাপুজোর কথা আর তা নিয়ে আজব সব গপ্পো। ১৭৭০ সাল। জগৎরামের চার ছেলে ও একমাত্র কন্যা জগত্তারিণী প্রত্যেকবারের মতো সেবছরও গিয়েছে মামার বাড়ির দুর্গাপুজায়। কিন্তু আদরিণী মেয়ের মনে হল তাকে যেন কিছুটা অবহেলা করা হচ্ছে সেখানে। অভিমান করে বাড়ি ফিরেই বাবাকে জানাল, সেও বাড়িতে দুর্গাপুজো করবে। তাও আবার এই বছরেই। সেদিন ছিল অষ্টমী। মেয়ের জেদের কাছে নতি স্বীকার করে পরদিনই ঘটে-পটে পুজো করলেন জগৎরাম। মায়ের ভোগ ছিল খিচুড়ি আর কলাই ডাল। পুজোর সেই শুরু। জগৎরামের নাতি যদুনাথ মুখোপাধ্যায় কর্মসূত্রে ঢাকায় থাকাকালীন ঢাকেশ্বরীর মূর্তি দেখে ঠিক করলেন, কলকাতার বাড়িতে সেই আদলে সোনার দুর্গামূর্তি গড়বেন। কিন্তু শুধু সোনার তৈরি প্রতিমায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয় না। তাই অষ্টধাতু সংযোগে মাতৃমূর্তি স্থাপন করলেন ১৮৬৯-এ। এখনও সেই পুজো চলছে।
চিপ সাহেবের সেই পুজোর গল্পটাও বলি। বীরভূমের জনপ্রিয় কুঠিয়াল ছিলেন জন চিপস। লোকের মুখে মুখে তাঁর নাম হয়ে গিয়েছিল চিকবাহাদুর। মাত্র ষোল বছর বয়সে কলকাতায় রাইটার হিসেবে এসে ধীরে ধীরে বীরভূমের সবচেয়ে বড় কমার্শিয়াল এজেন্ট। তুলা, রেশম, লাক্ষার জমাটি কারবার। থাকতেন শান্তিনিকেতনের কাছেই, সুরুলে। সবই হচ্ছে কিন্তু ব্যবসায় ভালো লাভ হচ্ছে না। সাহেবের মন খারাপ। শেষে দেওয়ান শ্যামকিশোর সিংহ বুদ্ধি দিলেন, ‘সাহেব, তুমি বড় করে দুর্গাপুজো কর দেখি। আমাদের মা কাউকে হেলা করেন না। তিনি নিশ্চয়ই তোমার দুর্গতি দূর করবেন।’
চিপস রাজি হলেন। সুরুলের কুঠিবাড়িতে ধূমধাম করে পুজো হল। সাহেব সকাল থেকে না খেয়ে অঞ্জলি দিলেন। চারিদিক থেকে মানুষ ছুটে এল এই কাণ্ড দেখতে। তবে সবচেয়ে অবাক সাহেব নিজে। পরের বছর মুনাফা হল দ্বিগুণ। তিনি শ্যামকিশোরকে ডেকে বললেন, ‘মা আমায় কৃপা করেছেন। এবার থেকে প্রতি বছর পুজো চাই-ই চাই।’ ১৮২৮ অবধি বেঁচে ছিলেন সাহেব। একবারও পুজো বাদ যায়নি। ভক্তিভরে মায়ের অর্চনা করতেন চিকবাহাদুর। অষ্টমীর দিন গাঁয়ের সব মানুষের নেমতন্ন হতো সাহেবের কুঠিতে। দুপুরে পেটভরে অন্নভোগ খেয়ে সবাই সাহেবকে দু’হাত তুলে আশীর্বাদ করতে করতে বাড়ি যেতেন।
সাকিন কলকেতার পুজোতে সাহেবদের মাতামাতি নেহাত কম ছিল না। অমৃতলাল বসু লিখছেন, ‘স’ বাজারের রাজার বাড়িতে লেগে যেত সাহেব মেম দর্শকদের ভীড়। সাদা মুখের শোভায় রাজবাড়ির উঠানে পদ্মফুলের মালা ফুটে উঠত আর আমরা কালো কালো অলিরা আশেপাশে ঘেঁষে গুঞ্জন করতুম। সাহেবদের জন্য শেরি শ্যাম্পেন ব্র্যান্ডি বিস্কুট থাকত বটে, ভাগ্যবান দু-দশজন বাঙালী প্রসাদও পেতেন। কিন্তু খাওয়া দাওয়ার বেলা বাঙালিদের ভাগ্যে ফক্কা।’ সাহেবদের খুশি করতে বাড়াবাড়িও হতো। প্রাণকৃষ্ণ দত্ত জানিয়েছেন, ‘কালীশঙ্কর ঘোষের বাটীর গুরু পুরোহিত কর্তা প্রভৃতি পুরুষ, অন্দরে গৃহিণী এবং সমস্ত পুরনারী মায় দাসদাসীদের সুরাপান করিতে হইত।’ একদিন মাতাল কালীশঙ্করের পা টিপছে তাঁর মাতাল চাকর। হঠাৎ সে ডুকরে কেঁদে উঠল। ‘বাবু বলিলেন, ‘তুই কাঁদিতেছিস কেন রে?’ উত্তর হইল, ‘কর্তা আপনার একখানা পা খুঁজিয়া পাইতেছি, আর একখানা বোধ হয় হারাইয়া ফেলিয়াছি, খুঁজিয়া পাইতেছি না।’ বাবু হাসিয়া কহিলেন, ‘তা চিন্তা কি বোধ হয় জল খাবারের জায়গায় ফেলিয়া আসিয়াছি। যা বাটীর ভিতর হইতে লইয়া আয়।’
যিনি দুই-আড়াই টাকার বেতনের চাকরি করেন, তাঁর বাড়িতেও নাকি মা দুর্গা আসতেন। তত আড়ম্বরের পুজো অবশ্য হতো না। তবে এমন কোনও ভদ্রপল্লি ছিল না, যেখানে অন্তত চার পাঁচটি দুর্গাপুজো হতো না। ২০/২৫ টাকায় দুর্গাপুজো হয়ে যেত। তবে রেষারেষির পুজোও ছিল। অমুকবাবু চারটে ঢোল, দুটো ঢাক বাজাচ্ছে, আমাকেও আটটা ঢোল, চারটে ঢাক রাখতে হবে। ওখানে দুটো পাঁঠা বলি হলে আমি চারটে বলি দেব। কুমোরটুলির গোবিন্দরাম মিত্রের পুজোয় এত ধুমধাম হতো যে, ‘তাঁহার কয়েক অধস্তন পুরুষ পৈতৃক রীত্যানুসারে পূজার ধুমধাম করিয়াই সর্বসান্ত হইয়াছেন।’ দুর্গাপুজোতে বলিদানের বাড়াবাড়ি হতো। তিনদিন টানা বলি তো হতোই, নবমীর দিন সেই বলির সীমা থাকত না। শোভাবাজারের জয় মিত্রের বাড়িতে সপ্তমীর দিন থেকে যত বলি হতো, সেই সব ছাগল গুদামে রেখে দেওয়া হতো। একাদশীর দিন সেই পরিবার থেকে যেসব ব্রাহ্মণ সিধে পেতেন, তাঁদের বলির পাঁঠা পাঠানোর নিয়ম ছিল। নবমীতে ‘কেবল মহিষ মেষ ছাগ কুষ্মাণ্ড ও আখ বলি নহে, তাহার পর আমোদ করিয়া গোধিকা, কপোত, মাগুরমাছ, লেবু, সুপারি এমনকি গোলমরিচ অবধি বলিদান হইত। বলিদান শেষ হইলেই শুরু হইত নৃত্য। সেই রক্তপ্লাবিত প্রাঙ্গণে মোষের মুণ্ড, আখ, লেবু , নারিকেল লইয়া কাড়াকাড়ি আর রক্তে গড়াগড়ি দেওয়া হইত।’ তারপর পথে মিছিল বের হতো। সেই রক্তাক্ত দেহের পুরুষদের দেখে ‘মনে হইত যেন দক্ষযজ্ঞ ধবংস করিয়া শৈব সৈন্যেরা সদর্পে পৃথিবী কাঁপাইয়া চলিয়াছেন।’
এই বলি নিয়ে একটা প্রাচীন গল্প না ‘বলি’লেই নয়। এক বলির রাতে নেশায় চুচ্চুর কর্তার খেয়াল হল এতগুলো পশুকে বলি দিয়ে স্বর্গে পাঠাচ্ছি, আমার কত পুণ্য হচ্ছে। যদি স্বয়ং গুরুদেবকে বলি দিই, তাহলে আরও কতই না পুণ্য হবে। ‘গুরুকেও এই কথা বলামাত্র তিনি তথাস্তু বলিয়া নাচিয়া উঠিলেন।’ তাঁকে হাড়িকাঠে নিয়ে যাওয়া হল। যারা বলি দেবেন, তাঁরা শুধু মদ খাননি। কারণ, মদ খেলে বলিদানের শক্তি থাকে না। এই ভীষণ বুদ্ধি শুনে তাঁদের তো চক্ষু চড়কগাছ। এদিকে গুরুদেবও হাড়িকাঠে গলা দিয়ে হাসিহাসি মুখে বলি দেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন। শেষে এক কামারের মাথায় বুদ্ধি এল। সে বাবুকে বললে, “কর্তা মশাই, যে খাঁড়ায় পশুদের বলি দিই, তাতে কি গুরুদেবকে বলি দেওয়া যায়? আমি নতুন খাঁড়া নিয়ে আসছি। আপনি অপেক্ষা করুন।’ বেরিয়েই সে এক থানাদারকে ডেকে আনে। থানাদারের ধমকে বাবু এবং গুরুর এক অভিনব নরবলির ইচ্ছে পূরণ হতে পারল না।
সাবেক কলকেতার সেরা তিন পুজো ছিল দাঁ বাড়ি, মিত্র বাড়ি আর স’ বাজারের রাজবাড়ি। প্রবাদে আছে, ‘মা আসিয়া গহনা পরেন শিবকৃষ্ণ দাঁ-র বাটী, ভোজন করেন কুমারটুলির অভয়চরণ মিত্রের বাটী আর রাত জাগরণ করিয়া বাইনাচ দেখেন স’ বাজারের রাজবাটীতে।’ আর সে পুজো মানেই পুজোর ফর্দ। আরবি ফরদ থেকে আসা এই শব্দের মানে তালিকা। দুর্গাপুজোর ফর্দ লেখা হতো লাল কালিতে। তুলোট কাগজে। মোট ১৩টি ভাগে বানানো হতো এই ফর্দমালা। বিভিন্ন দ্রব্যাদির ভাগগুলো হল- কল্পারম্ভ, নবপত্রিকা, বোধন, আমন্ত্রণ, অধিবাস, সপ্তমী, মহাস্নান, হোম, অষ্টমী, সন্ধিপূজা, নবমী, দশমী-র দ্রব্য এবং অন্যান্য দ্রব্য। দুই পুরাণ মতে এই ফর্দ তৈরি করা যেত- কালিকাপুরাণ ও বৃহন্নন্দিকেশরপুরাণ। এই ফর্দের ভাষায় সংস্কৃত ভাষার উল্লেখ দেখা যেত প্রায়ই। ফর্দ হত মোটামুটি এই রকম—
‘প্রতিপদে মাথাঘষা, সুগন্ধ তৈল, চিরুনি, দ্বিতীয়াতে মাথায় বাঁধার পট্টডোর, তৃতীয়াতে দর্পন, সিঁদুর আর অলক্তক, চতুর্থীতে মধুপর্ক...’ এই রকম।
আর মাথায় লেখা থাকত ‘শ্রী শ্রী দুর্গামাতা সহায়’...
সেকালে কিছু আলোকপ্রাপ্ত চাকুরে বাঙালি পুজো এলেই বেরিয়ে যেত বাৎসরিক ভ্রমণে। হোল্ডঅল, ট্রাঙ্ক আর বেতের ঝুড়ি ভরে উঠত গরম জামাকাপড়ে। টিকিটবাবুদের মুখ ঝামটা খেয়ে কোনমতে বাবুদের টিকিট কেটে আনা। সওদাগরি আপিসে ছুটির রেশ। কেউ যাচ্ছেন পুরী, কেউ দার্জিলিং, কেউ বা হাওয়া বদলাতে গিরিডি। সেখানে সব কিছু বেশ সস্তা। সস্তায় বাজারহাট করে হাওয়া বদলাতে যাওয়া বাবুরা আহ্লাদে আটখানা হয়ে ‘ড্যাম চিপ’, ‘ড্যাম চিপ’ বলে চিৎকার করে ওঠেন। পরে গেলে জিনিষের দাম বেড়ে যাবে, ড্যাঞ্চিবাবুরা তাই পুজোর আগেই ভিড় জমান গিরিডি, দুমকা, রাঁচি, হাজারিবাগ আর শিমুলতলায়। সুলভ সমাচারে বিজ্ঞাপন বেরোয় ‘সর্ব্বসাধারণকে জ্ঞাত করা যাইতেছে যে, যে সকল ব্যক্তি পূজার ছুটিতে রেলে বেড়াইতে যাইতে ইচ্ছা করেন তাঁহাদের সুবিধার জন্য ১ম এবং ২য় শ্রেণীর মাসিক রিটার্ন টিকিট সিঙ্গল টিকিটের দেড় গুণ মূল্যে ২০এ সেপ্টেম্বর হইতে ২০এ অক্টোবরের মধ্যে প্রতিদিনই বিক্রয় হইবে। যাঁরা ৫০ মাইলের কম দূরে যাইবেন, তাঁহারা টিকিট এ মূল্যে পাইবেন না। ৩রা সেপ্টেম্বর, ১৮৭৫। সিসিল ষ্টিফিন্সন, এজেন্ট।’
স্টেশনে কেলনারের কর্মচারীদের কাজ বাড়ে। সাদা তোয়ালে মুড়ে গরম গরম ধোঁয়া ওঠা মাটন কাটলেট না হলে বাবুর মন ওঠে না। ট্রেন ছাড়তে না ছাড়তে কুলির সঙ্গে পাই পয়সার দরদাম সারা। গার্টার দিয়ে বাঁধা মোজা, লপেটা পায়ে বাবু উড়নিটা একটু ভালোভাবে জড়িয়ে নেন। হাতে লাল চামড়ায় বাঁধানো নতুন গল্পের বই। গিন্নি এই ফাঁকে আঁচল সামলে লাল নীল উলের বল বার করে কাঁটা বুনছেন। কম্পার্টমেন্টের এধার থেকে ওধার ছুটে বেড়াচ্ছে ঝকঝকে নতুন জামা পরা ছোট ছেলেমেয়েরা। জানলা দিয়ে মাঝে মাঝেই ভিতরে ঢুকে পড়ছে স্টিম ইঞ্জিনের কয়লার গুঁড়ো। কোন বাচ্চার যেন চোখে ঢুকে বেজায় লাল হয়েছে! তবু যে জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখল মাঠের মাঝে মাথা দোলাচ্ছে ধবধবে কাশফুল। আর সব ব্যথা ভুলে আচমকা চেঁচিয়ে বলে, ‘মা, দেখ পুজো আসছে...’
আজকাল এই আকালেও বাঙালির জীবনে পুজো আসে। অফিসের জানলা দিয়ে দেখতে পাই দুপুর পেরোলেই রোদটা কেমন মিহিমতো হয়ে আসছে। ভোরের দিকে হালকা একটা শিরশিরানি। বাড়ির পাশের পুকুরটায় পদ্ম আর শালুক ফুটেছে। মাঝে মাঝেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি। মাঝে আবার সোনালি আলো। ফেসবুকের পাতায় পাতায় পুজোবার্ষিকীর বিজ্ঞাপন। কলেজ স্ট্রিট জুড়ে ছাড়বেলা। দোকানের সামনে ভিড়। ফুচকাওয়ালা দাদা ঝাল বেশি আর ঝাল কম নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। কান পাতলে চলন্ত টোটোর মাইকে আবছা কানে আসছে বীরেন ভদ্রের গলা। ও বাড়ির মেনিটা চারটে বাচ্চা নিয়ে হয়রান। এ বাড়ির নেড়িদুটো দিব্যি কামড়াকামড়ি করে খেলছে। পালবাবুর আটচালাতে মূর্তিতে রং ধরানো প্রায় শেষ। চক্ষুদান এখনও বাকি। কোন ভোরে উঠে ঘুমপাড়ানি মাসি পিসিরা ফুলের বোঁচকা নিয়ে সাড়ে চারটের বনগাঁ লোকালে চলেছে গোবরডাঙা থেকে দমদম। এঁদো ডোবার ধারে সাদা মাথা দোলাচ্ছে কাশফুল।
খুব সকালে জামরুল গাছের মাথার দিকে জড়ানো শালা দোশালার মতো আলগা কুয়াশা। শিউলি ঝরা শুরু হয়েছে ক’দিন হল। উঠোনের একপাশ সাদা কমলায় জড়িয়েমড়িয়ে একশা হয়ে গেছে। সোনা রঙের রোদ উঠে গাছের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে পথ খুঁজে মাটিতে আশ্রয় পাওয়ার আগেই ফুরিয়ে যাচ্ছে। আলামন্ডার হলুদ ফুলে চিকচিকে শিশির ঝরে পড়ার আগে খানিক বিশ্রাম নিচ্ছে আলগোছে। কার বাড়ি সকাল সকাল পুজো হচ্ছে। ধুপকাঠির গন্ধ। ভারতদর্শন। সেই কোন ছোটবেলায় নবমীর দিন সকাল সকাল টিনের চকচকে চ্যাপ্টা বন্দুক আর রোল ক্যাপের গোলাপি ছোটো ছোটো ট্যাবলেটের মতো বাক্স নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম রাস্তায়। আমরা যখন রাজা ছিলাম বালককালে। এ পাড়া ও পাড়া ক্যাপের লড়াই। বারুদের গন্ধের সঙ্গে তখনও কোথা থেকে যেন এই ধূপের গন্ধ ভেসে আসত। অনাহুত অতিথির মত। ক্যাপ ফাটানো শেষ হলে লাল ক্যাপের ছেঁড়া ফিতে আর জ্বলে যাওয়া বারুদের বিন্দুগুলো উড়ে বেড়াত রাস্তায়। স্নান করতে হত তেল মেখে। সর্ষের তেল। বাবা ঘানি থেকে নিয়ে আসতেন, বড্ড ঝাঁজ। প্রথমেই হাতের তেলোতে নিয়ে দুই কানের ফুটো আর নাইকুণ্ডে। তাহলে নাকি উত্তরে হাওয়ায় শরীরের রস শুকিয়ে যায় না। অনেক সময় পাশের বাড়ি থেকে নিমডাল নিয়ে দুটো পাতা ফেলে দেওয়া হতো সেই তেলে। তেল মেখে, গামছা পরে খানিক রোদ্দুরে ঘোরা। মাথার তেল বলতে কেয়ো কার্পিন আর ক্যান্থারাইডিন।
দূর থেকে ভেসে আসছে...‘হায়রে কালা, এ কী জ্বালা’। এই গানগুলো যে খুব ভালো লাগে তা না। কিন্তু না হলে যেন পুজো ঠিক পুজো পুজো লাগে না। কিশোরের ‘একদিন পাখি উড়ে’, ‘নয়ন সরসী কেন’ কিংবা ‘আকাশপথে প্রেম করেছি’ সারা বছর শুনি কোথায়? প্রকৃতির রূপ বদলে যাচ্ছে। বাজারে উঁকি মারছে লম্বা ডাঁটা কচি ফুলকপি বা ছোট্ট পালং আর ধনেপাতার আঁটি। এই ঋতু কর্মনাশা। কাজ করতে ভালো লাগছে না একেবারেই। বুকে নতুন পুজোসংখ্যা নিয়ে ঝিমঝিমে দুপুর আর আলসেমি ভরা সন্ধ্যা কাটাতে ইচ্ছে করছে। এই তো মাত্র ক’টা দিন আমাদের হাতে সময় থাকে একসঙ্গে মেতে ওঠার। মিশে যাওয়া জনজোয়ারে। সবার সঙ্গে। সবার মতো হয়ে।
তারপর তো আবার কাজে ফেরার পালা। যারা প্রবাসে থাকেন ধীরে ধীরে পাততাড়ি গুটিয়ে কাজের জায়গায় ফিরে যাবেন তাঁরাও। পুজোতে শেষ করবার সংকল্প নেওয়া হয়েছিল যে পুজো সংখ্যাগুলোর, তাদের কিছু মাস দুয়েক ঘুরতে থাকবে অফিসের ব্যাগে ব্যাগে, আসা যাওয়ার পথের সঙ্গী হয়ে। বাকিরা অপঠিত, মুখ লুকিয়ে শুয়ে থাকবে বালিশের আনাচে কানাচে, বুক সেলফের কোণে। তারপর এক নির্জন রোদেলা দুপুরে পুরোনো কাগজ বিক্রিওয়ালার নড়বড়ে দাঁড়িপাল্লায় চেপে এক কিলো সাত টাকা দরে পৌঁছে যাবে গোডাউনে। রাস্তাঘাট কিছুদিন এমনটা সেজে থাকবে। যেমন থাকে বিয়ের কনে বিয়ের কিছুদিন পরেও। সেই আলগা ভালোলাগা গায়ে মেখে শহর আঁকড়ে ধরে থাকতে চাইবে এই যাই যাই উৎসবের কাল, আনন্দের মুহূর্তগুলোকে। সবার পুজো ভালো কাটুক।
• কার্টুন : সেন্টু
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : সত্যেন্দ্র পাত্র