রামপুরহাটে দুই-এক বছর হলো এসেছি। ধুবলহাটির রাজ-পরিবারের এক কন্যার সঙ্গে আমার বিবাহের একটি প্রস্তাব আসে। মা (শ্রীমা) আমাকে বলেছিলেন, “বিয়ে করোনা”। এই প্রস্তাবটিকে আমি সরাসরি অগ্রাহ্য করতে পারতাম, কিন্তু তা না করে সোজা বাগবাজারে মায়ের কাছে গিয়ে উপস্থিত হলাম। মা’কে সব কথা বললাম। মা বললেন, “কেন বাবা, তুমি তো বেশ আছ। তোমাকে দিয়ে অনেক ছেলের কল্যাণ হচ্ছে, এরপরে আরও অনেকের হবে। অনেক বড় কাজ করবে তুমি।”
“কিন্তু মা, আমার যে মাঝে মাঝে সংসার করতে খুব ইচ্ছে করে।” মা বললেন, “তোমার তো অনেক বড় সংসার হবে।” আমি বললাম, “কিন্তু মা, আমি কি এভাবে সারাজীবন থাকতে পারবো? যদি কখনো মনে দুর্বলতা আসে?"” মা দৃঢ়ভাবে বললেন, “ওর জন্য তুমি ভেবো না। কলিতে মনের পাপ পাপ নয়। যখনই দুর্বলতা আসবে ঠাকুরকে স্মরণ করবে, আমাকে ভাববে।”
মায়ের কথা ছিল খুব মিষ্টি। সেই মধুমাখা কথা এখনো কানে বাজে। মা একদিন আমাকে বলেছিলেন, “মা, কখনো চুপচাপ বসে থেকোনা-কিছুনা কিছু কাজ করবে। একটা কিছু কাজ নিয়ে থাকতে হয়, নইলে অলস মনে নানা বদ্চিন্তা এসে ভিড় করবে।”
একজন বয়স্ক মহিলাকে মা একদিন বলেছিলেন, “যে রাস্তায় তুমি চলছ, যদি দেখ সে-রাস্তায় কেউ পড়ে গিয়েছে তাকে তুমি তুলে দেবে। পথে পড়ে-থাকা কাউকে দেখে কখনো ফেলে যেতে নেই।” ... এই আদর্শ তো মা তাঁর নিজের জীবন দিয়েই দেখিয়ে গেলেন। পথে পড়ে-থাকা কত পাপী-তাপী, আর্ত নরনারীকে দু’হাতে পথ থেকে তুলে নিয়ে নিজের কোলে তিনি স্থান দিয়েছেন। ধন্য তারা—মায়ের সেই পথে-কুড়ানো ছেলেমেয়ের দল।
শ্রীশ্রীমা ছিলেন “রামকৃষ্ণগতপ্রাণা”। তাঁর প্রতিটি কাজ, প্রতিটি কথা, প্রতিটি চিন্তায় ঠাকুর থাকতেন জড়িয়ে। মা আমার মা-দিদিমাকে বলতেন, “জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে ঠাকুরকে স্মরণ রেখো। তাহলে কোনও কষ্টকে আর কষ্ট বলে মনে হবে না। জীবনে দুঃখ-কষ্ট কার বা নেই? ওসব তো থাকবেই; তাঁর নাম নিলে, তাঁকে আশ্রয় করলে তিনি শক্তি দেবেন। দুঃখ ও কষ্ট তখন আর তোমার ওপর ছাপ ফেলতে পারবে না।”
(মায়ের মাথায় ছিল একরাশ কালো চুল, আর সে চুল কি সুন্দর। মা নিজে যেমন গভীর ঠিক যেন তেমনি গভীর ঘন মায়ের মাথার চুল। …মায়ের পা-দুটি ছিল খুব সুন্দর। পায়ের তলায় পদ্মফুলের রক্তাভা। পায়ের গড়নও ছিল খুব সুন্দর। মুখের গড়ন ছিল ভারি মিষ্টি; চোখ, নাক ছিল অপূর্ব। করুণা আর মমতায় মাখা ছিল মায়ের মুখ, মায়ের চোখ দুটি।)
শ্রীশ্রীমায়ের পদপ্রান্তে আসার কিছুদিন পর তাঁকে যখন আমি কিছুটা ধারণা করতে পেরেছি তখন একদিন তাঁর কাছে গিয়ে করজোড়ে আবদার করি, “মা, আমি আপনার সেবা করতে চাই।”
তারাপদ দাস সংকলিত ‘শ্রীমা সারদা দেবীর উপদেশামৃত’ থেকে