অংশুমান কর: ওসি নাজিরুলের গালে এক থাপ্পড় কষিয়ে বলল, সাচ মান লো। তুমলোগ বাংলাদেশি হি হো।নাজিরুল আবার ঘাড় দু’দিকে নেড়ে মিনমিন করে বলল, নহি সাব। হাম বাঙ্গালি হ্যায়।
অংশুমান কর: ওসি নাজিরুলের গালে এক থাপ্পড় কষিয়ে বলল, সাচ মান লো। তুমলোগ বাংলাদেশি হি হো।নাজিরুল আবার ঘাড় দু’দিকে নেড়ে মিনমিন করে বলল, নহি সাব। হাম বাঙ্গালি হ্যায়।
ইন্ডিয়ান হ্যায়।
থানায় ওসির চেয়ারে বসেছিলেন এসডিপিও। তিনি চিৎকার করে বললেন, হাঁ, তুমলোগ বাঙ্গালি হো ঔর বাংলাদেশি ভি হো।
নাজিরুল কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর গালে আরেকটা থাপ্পড় পড়ল। ওসির। এসডিপিও বলল, ইসকো ভি লকআপ মে ডাল দো। কাল সুবহ উস কলোনি সে সবকো উঠা লে না। ইন সব লোগোকো সিধা বাংলাদেশ ভেজেঙ্গে।
একজন কনস্টেবল ওকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে লকআপে পুরে দিল।
একটা ছোটমতো ঘরের মধ্যে জনা পনেরো মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কোনওরকমে এককোণে দাঁড়িয়ে পড়ল নাজিরুল। তখনই ওর চোখ পড়ল হরনাথের ওপর। এই লকআপে ও হরনাথকে দেখতে পাবে ভাবেইনি। দুপুর থেকে যা হচ্ছে, তাতে ওর ধারণা হয়েছিল বেছে বেছে মুসলিমদেরই আনা হচ্ছে থানাতে। কিন্তু এখন বুঝতে পারছে শুধু মুসলিমদের নয়, হিন্দু বাঙালিদের ওপরও সারাদিন ধরে এই অত্যাচারই চলেছে। হরনাথ ওকে চিনতে পেরেছে বলে মনে হল না। অথচ বুনিয়াদপুর থেকে ওকে দিল্লিতে নিয়ে এসেছিল হরনাথই। হরনাথ ওর ছেলেবেলার বন্ধু। ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস এইট পর্যন্ত দু’জনে একসঙ্গেই পড়াশোনা করেছে। তারপর নাজিরুল আর পড়াশোনা করেনি। হরনাথও মাধ্যমিক পরীক্ষায় ফেল করার পর পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিল। বাহারি চুল ছিল হরনাথের। মাধ্যমিক পরীক্ষায় ফেল করার পর চুল কাটিয়ে দিয়েছিল ওর বাবা। বলেছিল, আর টেরি বাগাতে হবে না। চেহারা আর চুল নিয়ে খুব মাথা ঘামাত হরনাথ। আর আজ কী চেহারা হয়েছে হরনাথের! ওর বড় বড় চোখ দুটোর জন্যই ওকে চিনতে পেরেছে নাজিরুল। চোখ দুটো না-থাকলে হরনাথকে ও চিনতেই পারত না। হরনাথের ঠিক পাশে গিয়ে নাজিরুল বলল, তুরেও ধরসে? তুই তো হিঁদু।
হরনাথ কোনও উত্তর দিল না। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে নাজিরুল আবার বলে, চিনতে পারস নাই? আমি নাজিরুল।
নিজের নাম বলাতে হরনাথ এবার ওকে চিনতে পারল। বলল, বাঙালি হইলেই আর কথায় বাঙাল ভাষার টান থাকলেই ধরতাসে। হিন্দু মুসলিম দেখতাসে না। কয়েকজনরে ধরসে যাদের এমপির সার্টিফিকেট ছিল। তাও ধরসে।
খুঁজে খুঁজে বাঙালিদের যে এমন ধড়পাকড় চলছে, তা নাজিরুল জানতেই পারেনি। গুরগাঁওয়ের সেক্টর ৫৬এ-তে একটা হোটেলে কাজ করে নাজিরুল। দুপুরবেলা ওকে ফোন করে মুন্নি। বলে বাড়িতে পুলিস এসেছে। এক্ষুনি যেন নাজিরুল বাড়িতে ফিরে যায়। সে ভাড়া থাকে সেক্টর ৫৫-র ঘাটাগাঁওয়ে। তড়িঘড়ি করে ঘরে ফিরেছিল নাজিরুল। ততক্ষণে ফোনেই মুন্নিবিবি জানিয়ে দিয়েছে যে, পুলিস এসে বলছে ওরা নাকি বাংলাদেশি! ওদের বাংলাদেশ ফেরত পাঠানো হবে।
কাজের জন্য দিল্লি আসার কথা ওকে প্রথম বলেছিল হরনাথই। কাজের জন্য আজ এখানে, কাল ওখানে চলে যেত। একবার এমনকী চলে গিয়েছিল দুবাই। দুবাইতে পশ্চিমবঙ্গের অনেক পরিযায়ী শ্রমিক কাজ করে। মুর্শিদাবাদের এরকম একজন শ্রমিকের সঙ্গেই নাজিরুলের আলাপ হয়েছিল রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করতে গিয়ে। সেই শেখ মিন্টুই ওকে বলেছিল দুবাইয়ের কথা। দুবাইয়ে নাকি ডলার ওড়ে। মিন্টুর কথা শুনে বাড়িতে কাউকে কিছু না বলেই দুবাই চলে গিয়েছিল নাজিরুল। অবশ্য এজন্য ওকে কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল বিস্তর। মিন্টুই সে সমস্ত ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। একজন আড়কাঠির মাধ্যমে নাজিরুলকে পাসপোর্ট বানাতে হয়েছিল, ভিসা করাতে হয়েছিল। দুবাই গিয়ে প্রথম প্রথম ভালোই লাগত নাজিরুলের। রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজই করতে হতো ওকে। ছোট ছোট ঘরে অনেকে মিলে একসঙ্গে থাকা। কিন্তু কিছুদিন পরেই ওর বাড়ির জন্য মন কেমন করতে থাকে। মুন্নির মুখটা দিনরাত চোখের সামনে ভাসত। তখনও হোয়াটসঅ্যাপে কল করা যেত না। একবার ফোন করলেই অনেকগুলো টাকা খরচ হতো। তবু নাজিরুল সপ্তাহে দু’-তিনবার ফোন করত মুন্নিকে। ওদের ছেলেপুলে না হওয়ার জন্যই বোধহয় মুন্নিবিবির ওপর এতটা টান আছে নাজিরুলের। তিন মাস পর থেকেই ওর মন বাড়ি যাব বাড়ি যাব করতে থাকে। তখন ওকে মিন্টু জানায় যে, দুবাই থেকে বাড়ি ফেরা যায় বছরে মাত্র একবারই। মাসখানেকের ছুটি। সেটাই সব। ওই ছুটি নিয়ে বাড়ি যে ফিরেছিল নাজিরুল আর দুবাইতে ফিরে যায়নি। মাইনে বাকি ছিল শেষ তিন মাসের। সে মাইনেও আর নেয়নি।
এসব আজকের কথা নয়। বছর পনেরো আগের কথা। দুবাই থেকে ফিরে আসার পরেই ওর সঙ্গে দেখা হয় হরনাথের। সেটা ছিল আশ্বিন মাস। দুর্গাপুজোর জন্য ছুটি নিয়ে দিল্লি থেকে সাতদিনের জন্য বাড়ি এসেছিল হরনাথ। ওই বলেছিল নাজিরুলকে যে, আমার সঙ্গে দিল্লি চল। ঠিক একটা কাজ জুটে যাবে। এখানে তো কাজটাজ পাওয়া খুবই মুশকিল। হরনাথকে বিশ্বাস করত নাজিরুল। প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় থেকেই। ওদের দু’জনেরই খুব শখ ছিল তেঁতুলবিচি জমানোর। সকাল-বিকেল দু’বেলা দু’জনে মিলে ডাংগুলি খেলত। খেলতে খেলতে কোথায় চলে যেত! নিজেদের গ্রাম ছেড়ে চলে যেত অন্য গ্রামে। নাজিরুলের ভয় লাগত না। মনে হতো হরনাথ আছে তো! হরনাথ থাকলে আকাশটাকেও কী নীল আর বড় মনে হতো নাজিরুলের! এমন অনেকদিন হতো যে, আকাশে ঘন কালো মেঘ করে এসেছে। এদিকে ওকে খেলতে ডাকতে এসেছে হরনাথ। আকাশের মেঘ দেখে ঘর থেকে বেরতে ভয় পেত নাজিরুল। হরনাথ ওকে অভয় দিত। বলত যে, কিচ্ছু হবে না। সত্যিই কিছু হতো না। ঘন কালো মেঘ কোথায় উড়ে যেত হরনাথের সঙ্গে ডাংগুলি কিংবা মার্বেল নিয়ে নাজিরুল বেরিয়ে পড়লেই। আবার ঝকঝকে নীল হয়ে যেত আকাশ। হরনাথের কথায় বিশ্বাস করে তাই দিল্লি চলে এসেছিল নাজিরুল।
করোলবাগের একটা হোটেলে নাজিরুলকে কাজ দেখে দিয়েছিল হরনাথ। হরনাথ নিজে কাজ করত তার পাশের একটা হোটেলে। করোলবাগের সেই হোটেলেই মনে হয় এখনও কাজ করে হরনাথ। কিন্তু এর মধ্যে দু-তিনবার ঠাঁই বদল হয়েছে নাজিরুলের। প্রথমে ও মুন্নিবিবিকে দিল্লি নিয়ে আসেনি। বছর তিনেক হল গুরগাঁওয়ের এই হোটেলে কাজ পাওয়ার পর বাড়ি ভাড়া নিয়ে মুন্নিবিবিকে নিয়ে এসেছে। তখন থেকেই আর হরনাথের সঙ্গে ওর যোগাযোগ নেই।
ছোট্ট লকআপ রুমে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়েই হরনাথকে নাজিরুল জিজ্ঞেস করে, তুর এরম চেহারা হল ক্যামনে?
হরনাথ বলল, মারণরোগে ধরসে। বেশিদিন বাঁচুম না। কেমো চলতাসে।
হতবাক হয়ে গেল নাজিরুল। কতখানি নির্দয় হতে পারে পুলিস! কেমো-চলা একজন ক্যান্সারের পেশেন্টকেও ছাড়েনি। কিন্তু, হরনাথকে তো ধরার কথা দিল্লি পুলিসের। হরিয়ানা পুলিস ওকে ধরল কী করে! ও জিজ্ঞেস করার আগেই হরনাথই ওকে বলল, আমার তো চাকরি আর নাই। কুনো রকমে ঘাটাগাঁওয়ে এক আত্মীয়র বাড়িতে আসি। কেমো শেষ হইলেই বুনিয়াদপুর চইল্যা যামু।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাজিরুল ভাবে, সত্যিই কি বুনিয়াদপুরে যেতে পারবে হরনাথ? একটু আগেই তো এসডিপিও বলছিলেন ওদের সবাইকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
নাজিরুলের ফোনটার কারণেই ওসির বেশি বেশি করে সন্দেহ হয়েছে যে, ওরা বাংলাদেশি। দুপুরে ও বাড়ি ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই ওসি সাহেব ওর হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল ওর ফোনটা। দুবাইতে থাকার সময় বাংলাদেশের অনেক শ্রমিকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল নাজিরুলের। দুবাইতে পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের অনেক মানুষ রাজমিস্ত্রি আর জোগাড়ের কাজ করে। ওরা দুই দেশের মানুষ হলেও কেমন মিলেমিশে গিয়েছিল বিদেশ-বিভুঁইয়ে। একসঙ্গে থাকা, খাওয়া, গান গাওয়া, নাচা সবই তো হতো! সেসব যোগাযোগগুলোর সবক’টা ছিন্ন হয়নি। মাঝে মাঝে কয়েকজনের সঙ্গে ফোনে কথা হতো। তারপর হোয়াটসঅ্যাপ কল শুরু হওয়ার পর ঈদ আর মহরমের সময় ভিডিও কলে কুশল বিনিময় হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে প্রায় রোজই একটা দুটো করে গুড মর্নিং আর গুড নাইট মেসেজ আসে ফোনে। সমস্ত মেসেজ আর হোয়াটসঅ্যাপের কললিস্ট চেক করে ওসি দুপুরবেলা নাজিরুলকে বলেছিল, তুমহারা ফোন মে ইতনে সারে বাংলাদেশি কন্টাক্টস কিঁউ হ্যায়?
বুঝিয়ে বলেছিল নাজিরুল। মাঝে মাঝে কথা বলে উঠছিল মুন্নিবিবিও। মুন্নির হিন্দিটা এখনও ঠিকঠাক হয়নি। বললেই বোঝা যায় একজন বাঙালি হিন্দি বলছে। আর বাংলা বললে তো তাতে স্পষ্ট উত্তরবঙ্গের টান। এই টান নাজিরুলের কথাতেও খুবই স্পষ্ট। হরনাথের কথাতেও। মায়ের ভাষাকে তো আর ফেলে দেওয়া যায় না। ভাষাও হিন্দু-মুসলিম বোঝে না। তাই যে-ভাষায় নাজিরুল কথা বলে, সেই ভাষাতেই কথা বলে হরনাথও।
ওর ফোনে বাংলাদেশের এত নম্বর কেন অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছিল নাজিরুল। কিন্তু ওসি সাহেব কোনও কথাই শোনেনি। মুন্নিবিবি ওদের দু’জনেরই আধার কার্ড, ভোটার কার্ড দেখিয়েছিল। সেসব কোনও কিছুকেই পাত্তা দেয়নি ওসি। সোজা নাজিরুলকে এনে তুলেছিল থানায়।
লকআপটা এত ছোট যে, পনেরোজন লোক মিলে একটু যে শুয়ে নেবে, সে উপায়ও নেই। সব্বাই দাঁড়িয়ে রয়েছে। হরনাথকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে, সে আর পারছে না। তার পাশের লোকটাকে নাজিরুল বলে, ওরে একটু বইতে দ্যান। ওরে মারণরোগে ধরসে।
লোকটা কী বুঝল কে জানে, একটুখানি সরে দাঁড়াল। ছোট্ট মতো একটা জায়গা তৈরি হল যাতে একজন মানুষ বসতে পারে। হরনাথ বসে পড়ল। আঁকড়ে ধরে থাকল নাজিরুলের পা। ওকে দেখে বোঝাই যাচ্ছে না যে, কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত ও নাজিরুলকে চিনতেই পারছিল না।
রাত বাড়ছে। নাজিরুল বুঝতে পারছে না ওদের ভাগ্যে কী লেখা আছে। আজকের রাতটা যে লকআপেই কাটাতে হবে তা নিশ্চিত। কিন্তু কাল সকালে ওরা ছাড়া পাবে কি? বাড়ি যেতে পারবে? নাকি সত্যিই পুলিস ওদের পাঠিয়ে দেবে বাংলাদেশে? কয়েকজন গুনগুন করে এইসব কথাই বলছিল একটু আগে। অনেকজনকেই নাকি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে ইতিমধ্যেই। পনেরোজন লোকের মধ্যে প্রায় সকলেই কথা বলছে। তাই কে কী বলছে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না সবসময়। একটা গুনগুন ঘরের মধ্যে সারাক্ষণ ঘোরাফেরা করছে। তারই মধ্যে টুকরো টুকরো যেসব কথা নাজিরুল শুনেছে তা থেকেই বুঝেছে ওরা সবাই বাঙালি কিন্তু সবাই পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসেনি। অনেকেই এসেছে ত্রিপুরা, অসম থেকে। এমনকী আন্দামানেরও আছে দু’জন। এটাই স্বাভাবিক। দিল্লি এমন একটা জায়গা যেখানে গোটা ভারতবর্ষের মানুষ কাজের সন্ধানে এসে উপস্থিত হয়।
রাত্রি প্রায় এগারোটার নাগাদ হঠাৎ করে ওদের লকআপের দরজা খুলে গেল। একজন কনস্টেবল এসে বলল, হরনাথ কৌন হ্যায়?
মিহি গলায় হরনাথ উত্তর দিল, ম্যায় হুঁ। ওর উত্তর কনস্টেবলের কানে গিয়ে পৌঁছলই না। নাজিরুলই চিৎকার করে বলল, ইয়ে হ্যায় হরনাথ। বলে ধীরে ধীরে ভিড়ের মধ্যে থেকেই কোনওরকমে জায়গা করে লকআপের দরজার সামনে নিয়ে গিয়ে হাজির করল হরনাথকে। কনস্টেবলটা হরনাথের হাত ধরে ওকে প্রায় হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে চলে গেল।
সকলের মধ্যে থেকে আলাদা করে একজন ক্যান্সার রোগীকে টেনে বের করে নিয়ে গেল কেন পুলিস, তা কিছুতেই নাজিরুল বুঝতে পারছে না। ওকে কি ছেড়ে দেবে? নাকি আলাদা করে আবার চড়-থাপ্পড় কষাবে? যাতে হরনাথের অবস্থা দেখে ওরা সকলে ভয়ে থাকে!
উৎকণ্ঠা নিয়ে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না নাজিরুলকে। একটু পরেই ওই কনস্টেবলই এসে লকআপের বাইরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, শেখ নাজিরুল কৌন হ্যায়?
লকআপের দরজার কাছে এগিয়ে গেল নাজিরুল। তালা খুলে ওকেও বের করে হাত ধরে প্রায় হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে চলল কনস্টেবলটা। হাজির করল ওসির সামনে। নাজিরুল দেখল ওসির চেয়ারে এখন ওসিই বসে আছেন। এসডিপিও আর নেই। সামনের চেয়ারে বসে ধুঁকছে হরনাথ।
ওসি নাজিরুলকে বলল, ইয়ে তুমহারা দোস্ত হ্যায়?
নাজিরুল ঘাড় নাড়াল।
ওসি বলল, হাম বাঙ্গাল সে গ্র্যাজুয়েশন কিয়ে হ্যায়। কলকাতা কে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ সে। বাঙ্গালি লোগোঁ সে মেরা কোই লেনা-দেনা নেহি হ্যায়। বাঙ্গালি লোগ তো জ্যাদাতার আচ্ছে হোতে হ্যায়। হুম ক্যা করেঁ? ইহ তো উপর কা অর্ডার হ্যায়। তুম আপনে দোস্ত কো লে কর নিকাল যাও। ইসকি তবিয়ত বহুত খারাব হ্যায়। কাল সুবহ কা ট্রেন পকড় কর সিধা ওয়েস্ট বেঙ্গল ওয়াপাস চলে জানা। এসডিপিও কো ম্যায় সাম্ভাল লুঙ্গা।
যেই ওসি ওকে এতক্ষণ ধরে চড়-থাপ্পড় মারছিল, সেই ওসিই ওদের এভাবে ছেড়ে দেওয়ায় একটু হতবাক হয়ে গেল নাজিরুল।
ততক্ষণে ওসি ওদের দু’জনের ফোনই ওদের দু’জনের হাতে তুলে দিয়েছে।
থানা থেকে বেরিয়ে মুন্নিবিবিকে ফোনে ধরল নাজিরুল। ও ছাড়া পেয়েছে শুনে খুবই খুশি হল মুন্নি। এতক্ষণ ধরে শুধু নাকি কেঁদেই গেছে। রান্নাবান্না কিছুই করেনি। এত রাতে হরনাথকে আর ওর আত্মীয়র বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া ঠিক হবে না। নাজিরুল তাই মুন্নিবিবিকে বলল, হরনাথও আসে আমার লগে। হক্কলের ভাত বসাও।
বাড়ি যাওয়ার পরে যে নাজিরুল কী করবে ও জানে না। ওসির কথামতো কালই কি গুরগাঁও ছেড়ে চলে যাবে বুনিয়াদপুর? ট্রেনে রিজার্ভেশন তো পাবে না! জেনারেল কম্পার্টমেন্টে গাদাগাদি করে যাবে গোরু বাছুরের মতো? হরনাথই বা কী করবে? এই অবস্থায় ওকে দিল্লিতে ফেলে রেখে চলে যাওয়া কি ঠিক হবে? ও কী করবে, কী করা উচিত হবে সেসব ভাবতে ভাবতেই ধীর পায়ে হাঁটতে থাকে নাজিরুল। ওকে ধরে আস্তে আস্তে হাঁটছে হরনাথও। সেই ছেলেবেলায় যেমন ওরা দু’জনে হেঁটে এক গ্রাম থেকে আর এক গ্রামে চলে যেত, তেমনই আজও একসঙ্গে দুই বন্ধু হাঁটছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই প্রথম নাজিরুলের মনে হচ্ছে আকাশ আর নীল নয়। দিল্লির আকাশ এমনিতেই একটু ঘোলাটে থাকে। নীল আকাশ দেখতে পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার। তবে রাত্রিবেলা তারা দেখা যায়। আজ তারাগুলোও দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে আকাশে ঘন কালো মেঘ করেছে। শুধু সেই মেঘ ছিঁড়ে একটি জায়গায় দেখা যাচ্ছে চাঁদের একফালি। দেখতে লাগছে অনেকটা একটা চোখের মতো। চোখের মতো ওই একটুকরো চাঁদের দিকে তাকিয়ে নাজিরুলের হঠাৎ মনে হল দিল্লির আকাশটা আর আকাশ নেই, হয়ে গিয়েছে এক চক্ষু দানব।