অগ্নিভ ভৌমিক, মায়াপুর: চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের অপেক্ষা। তারপরই ভোট ঘোষণা করে দেবে নির্বাচন কমিশন। এই আবহে নদীয়া জেলায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সফরকে ঘিরে বঙ্গ রাজনীতিতে পারদ চড়ছিল। বুধবার মায়াপুর ইসকনে এক কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মতুয়া সম্প্রদায় ও তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে কী বার্তা দেন, সেইদিকেই নজর ছিল সমস্ত মানুষের। মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষরা আশা করেছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাগরিকত্ব নিয়ে সদর্থক কিছু বলবেন। কিন্তু সে গুড়ে বালি। ২৪ মিনিটের বক্তৃতায় মাত্র একবারই মতুয়াদের কথা তুললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু নাগরিকত্ব নিয়ে একটিও বাক্য ব্যয় করলেন না তিনি। বরং বক্তৃতা শুরু থেকেই শেষপর্যন্ত ছিল শুধুই তত্ত্ব কথা।
যার ফলে আশাভঙ্গের হতাশা ঘিরে ধরেছে মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষদের। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও নদীয়ার সভা থেকে নাগরিকত্ব নিয়ে কিচ্ছু বলেননি। মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষদের নাগরিকত্ব দেওয়া নিয়ে গেরুয়া শিবিরের দিল্লির সর্বোচ্চ নেতাদের ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ গোছের হাবভাব নির্বাচন প্রাক্কালে আরও অস্বস্তি বাড়িয়েছে বঙ্গ বিজেপির। এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। পাশাপাশি প্রশ্ন উঠছে, নাগরিকত্ব নিয়ে যে ফানুস বিজেপির তরফ থেকে ওড়ানো হয়েছিল ছাব্বিশের নির্বাচনের ফলাফলের আঁচ পেতেই কি তা চুপসে গিয়েছে? বক্তব্যের ১৯ মিনিট নাগাদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ সমাজকল্যাণের ভাবনাকে সর্বদা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। হরিচাঁদ ঠাকুর এবং গুরুচাঁদ ঠাকুর সমগ্র বিশ্বকে মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে যুক্ত করার কাজ করেছিলেন।› ব্যস! এইটুকুই। প্রত্যাশায় জল ঢেলে, তারপর ইসকনের মাধ্যম গীতার প্রচারের প্রসঙ্গে চলে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এমনিতেই এসআইআর ইস্যুতে বঙ্গ বিজেপির সাপের ছুঁচো গেলার অবস্থা। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের কাজ যে বুমেরাং হয়েছে, তা টের পাচ্ছেন গেরুয়া শিবিরের নেতারা। নথি সংক্রান্ত সমস্যার কারণে যাঁরা এসআইআরে নাম তুলতে পারছিলেন না, তাঁদের বিজেপি সিএএ–তে আবেদন করার ‘অফার’ দিয়েছিল। কিন্তু হাতেগোনা কয়েকজন ভোটার ছাড়া সেই উদ্যোগে বড় কোনো সাড়া মেলেনি। মঙ্গলবার মায়াপুর ইসকনে দেড়় ঘণ্টার কর্মসূচিতে এসেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এর আগে বেশ কয়েকবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ইসকন পরিদর্শনের কর্মসূচি বাতিল হয়েছিল। ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর মহারাজের ১৫২তম জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানে যোগ দিতেই তিনি মায়াপুরে এসেছিলেন। খাতায় কলমে অরাজনৈতিক অনুষ্ঠান হলেও সভাস্থল থেকে শুরু করে মঞ্চ সর্বত্রই ছিল বিজেপি নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের ভিড়। ছিলেন কেন্দ্র সরকারের পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব, রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে অনেকেই। ভোট মরশুমে অমিত শাহর এই জাঁকজমকপূর্ণ ইসকন পরিদর্শন রাজনৈতিকভাবেও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ‘হরে কৃষ্ণ’ ধ্বনি দিয়ে বক্তব্য শুরু করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তারপর প্রায় আধঘণ্টার বক্তব্যে ইসকনের মাধ্যমেই সনাতন ধর্ম প্রচারের ইস্যুতে শান দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সেইসঙ্গে তিনি জানান যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নয়, তিনি মায়াপুরে এসেছেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর একজন ভক্ত হিসেবে। তিনি বলেন, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভক্তি আন্দোলন শুরু করেছিলেন। সবশেষে তিনি বলেন, শুধু ভক্তি আন্দোলন বা শাস্ত্রের প্রচার করা নয়, ইসকন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ায়। তিনি ঘোষণা করেন, ২০৪৭ সালের মধ্যে বিকশিত ভারত এবং সনাতনের বার্তা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।