সংবাদদাতা, বোলপুর: প্রতিবারের মতো এবারও বাংলা বছরের শেষদিন তথা চৈত্রসংক্রান্তিতে সতীপীঠ কঙ্কালীতলায় শুরু হল কাঞ্চিদেশ উৎসব। স্থানীয়দের কাছে যা কঙ্কালী মেলা নামে পরিচিত। সোমবার এই মেলা শুরু হলেও, এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় গত রবিবার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বীরভূম জেলা পরিষদের সভাধিপতি কাজল শেখ ও নানুরের বিধায়ক বিধান মাজি। এছাড়াও কঙ্কালীতলা পঞ্চায়েতের প্রধান সহ সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। সাত দিন ধরে এই উৎসব চলবে বলে জানিয়েছে উৎসব কমিটি। প্রতিদিনই বাংলার বিভিন্ন তারকা শিল্পী সেখানে অনুষ্ঠান করবেন বলে জানিয়েছেন কঙ্কালীতলা অঞ্চল কমিটির সদস্য তথা উৎসবের অন্যতম আহ্বায়ক আলেপ শেখ। নববর্ষের প্রথম দিনে ভক্ত ও পুণ্যার্থীদের ভিড় উপচে পড়বে,পাশাপাশি উৎসবের দিনগুলিতে মেলা প্রাঙ্গণ মানুষের মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠবে বলে আশাবাদী উদ্যোক্তারা।
বোলপুর শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কঙ্কালীতলা সতীপীঠ রূপে খ্যাত। পর্যটনস্থল ও তীর্থক্ষেত্র হিসেবে কঙ্কালীতলার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এই মেলা ও উৎসব উপলক্ষ্যেকঙ্কালীতলা স্থানীয় লোকসংস্কৃতি এবং ধর্মীয় ভাবনার এক মিলনক্ষেত্র হয়ে ওঠে। কাঞ্চিদেশ উৎসব মূলত দেবী কঙ্কালীর বাৎসরিক পুজো উপলক্ষ্যে চৈত্র সংক্রান্তিতে আয়োজিত হয়। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী সতীর কাঁকাল বা কোমরের অংশ এখানে পড়েছিল।কাঁকাল থেকেই নামকরণ হয় কঙ্কালীতলা। উৎসবের নামকরণ ‘কাঞ্চিদেশ’ কেন, তা নিয়ে নানা মত প্রচলিত আছে। কেউ বলেন, প্রাচীনকালে এই অঞ্চল কাঞ্চিদেশের অংশ ছিল, আবার কারও মতে দেবীর অলৌকিক শক্তির প্রভাবেই এই অঞ্চলের এমন নামকরণ। তবে নামের উৎপত্তির কারণ যাই হোক না কেন, এই উৎসব বহু বছর ধরে স্থানীয় মানুষের জীবন ও জীবিকায় এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
বর্তমানে পর্যটনের স্বার্থে কঙ্কালীতলা মন্দির প্রাঙ্গণকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। পুণ্যার্থীরা যাতে সুষ্ঠুভাবে পুজো দিতে পারেন সেজন্য মন্দির প্রাঙ্গণকে আরও বড় করা হয়েছে। এলাকা বাড়তেই এবছর মেলা প্রাঙ্গণে প্রায় পাঁচশো ছোটবড় স্টল করা হয়েছে। কচিকাঁচাদের আনন্দ দিতে নাগরদোলাও বসানো হয়েছে। সাতদিন ধরে চলা এই উৎসবে স্থানীয় মানুষদের কথা মাথায় রেখে কবিগান, সাংস্কৃতিক নৃত্য, সঙ্গীতানুষ্ঠান, পঞ্চরস, যাত্রাপালা, ভাদুগান প্রতিযোগিতা, আতশবাজির প্রদর্শনী ও আদিবাসী বিচিত্রা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কঙ্কালীতলা মন্দির ট্রাস্টের সভাপতি মহাদেব চৌধুরী ও সেবায়েত সতীনাথ ভট্টাচার্য।
বেশ কয়েক বছর ধরে গ্রামীণ মেলার পাশাপাশি উৎসবও ঘটা করে করেছে কাঞ্চিদেশ উৎসব কমিটি। এ বছরও তার অন্যথা হয়নি। সাতদিন ধরে প্রতিদিন তারকা শিল্পীদের এনে গ্রামবাসীদের মনোরঞ্জন করা হবে বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন। শিল্পী তালিকায় রয়েছেন বিশিষ্ট কীর্তনীয়া রিমি অধিকারী, সঙ্গীত শিল্পী আরোসি সিন্থিয়া, বলিউড গায়ক বিনোদ রাঠোর, পঞ্চরসের জন্য বিখ্যাত অধীর মণ্ডলের মতো শিল্পীরা অনুষ্ঠান পরিবেশন করবেন।
আহ্বায়ক আলেপ শেখ বলেন, উৎসবের দিনগুলিতে দিনের বেলায় মেলা প্রাঙ্গণে স্থানীয় লোকনৃত্য ও গানের আয়োজন করা হয়। বিশেষত বাউল গান এই অঞ্চলের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং মেলায় বাউল শিল্পীদের উপস্থিতি এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। এছাড়া, ধর্মীয় আলোচনা সভা ও কীর্তনও হয়। কাঞ্চিদেশ উৎসব ও কঙ্কালী মেলা স্থানীয় মানুষের জীবনে এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এটি শুধু একটি মেলা নয়, স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। পুণ্যার্থীদের যাতে কোনও রকম অসুবিধা না হয় সেজন্য পঞ্চায়েতের তরফে সবরকম ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি, অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে শান্তিনিকেতন থানা এ বছর প্রচুর পুলিস মোতায়েন করেছে।