পূর্বা সেনগুপ্ত
পূর্বা সেনগুপ্ত
• কাশীর প্রমদাদাস মিত্রকে চিঠিতে লিখছেন স্বামী বিবেকানন্দ। মন ভারাক্রান্ত। শ্রীরামকৃষ্ণ এক বিরাট দায়িত্ব তাঁর উপর ন্যস্ত করে চলে গিয়েছেন। কিন্তু তা কি শুধু একটি সংঘ গঠনের দায়িত্ব? না, শ্রীরামকৃষ্ণ এই ধরিত্রীতে এসেছিলেন কোনও একটি সংঘ গঠনের জন্য নয়, পৃথিবীর ধর্মভাবনাকে জাগ্রত করার জন্য। বিশেষ করে ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার পুনরুজ্জীবনের জন্য। তাই তাঁর ভাবপ্রচারের জন্য চাই সংঘ। কিন্তু কার্যকরী বুদ্ধি কই? স্বামীজি লিখলেন, ‘বঙ্গদেশের লোকের কথা অনেক, কাজে এগোয় না... বঙ্গভূমির অবস্থা বড়ই শোচনীয়। ত্যাগ কাহাকে বলে, এদেশের লোকে স্বপ্নেও ভাবে না—কেবল বিলাস, ইন্দ্রিয়পরতা এবং স্বার্থপরতা এদেশের অস্থিমজ্জায় ভক্ষণ করিতেছে।’ কাশীর ধনী পণ্ডিত প্রমদাদাসকে লেখা এই চিঠির মধ্যেই স্বামীজি তত্কালীন ভারতবর্ষ সম্বন্ধে একটি রূপরেখা অঙ্কনের চেষ্টা করেছেন। তার সঙ্গে এ কথাও জানাতে তাঁর ভুল হয়নি যে, নতুন ভারত গঠনের জন্য শ্রীরামকৃষ্ণ প্রবর্তিত পথকেই কাম্য বলে মনে করেন তিনি।
কী ছিল সেই শ্রীরামকৃষ্ণ প্রবর্তিত পথ?
আমরা ফিরে যাব দক্ষিণেশ্বরের মন্দির প্রাঙ্গণের সেই ছোটো ঘরে। যেখানে ভক্তদের সামনে ধর্মপ্রসঙ্গ আলোচনা করতে করতে হঠাত্ই গভীরে ডুবে গেলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। আলোচনা হচ্ছিল বৈষ্ণব ধর্ম ও সেই ধর্মের ভক্তের লক্ষণগুলির কথা। শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, ‘নামে রুচি, জীবে দয়া, বৈষ্ণব সেবন’— অর্থাত্ গুরু প্রদত্ত ঈশ্বরের নামটি গ্রহণ করে সেই নামটিতে রুচি সৃষ্টি করা, বৈষ্ণব বা অন্য বিষ্ণু ভক্তদের সেবা করা, তাঁদের আত্মীয় বোধ করা আর জীবে দয়া! বর্ণনার তারতম্য ঘটল এই ‘জীবে দয়া’ কথাটি ঘিরে! হঠাত্ এক আধ্যাত্মিক গভীরতার স্তর থেকে অর্ধবাহ্য দশায় শ্রীরামকৃষ্ণ বলে উঠলেন, ‘জীবে দয়া? তুই কীটানুকীট তুই জীবকে দয়া করবার কে? বল, শিব জ্ঞানে জীব সেবা!’ সেই ছোটো ঘরে সেদিন অনেকে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম নরেন্দ্রনাথ। গৃহী ভক্ত পরম বৈষ্ণব রামচন্দ্র দত্তও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সমস্ত দৃশ্যটি হৃদয়ঙ্গম করতে পারলেন কেবল নরেন্দ্রনাথ দত্ত। আনন্দের সভা শেষ হল। সকলে একে একে বেরিয়ে এলেন সেই ছোটো ঘর থেকে। নরেন্দ্রনাথ জনান্তিকে জানালেন, ‘আজ এক নতুন আলোকে পেলাম! ভগবান যদি দিন দেন তবে তা একদিন সমগ্র পৃথিবীকে শোনাবো!’ সেই নতুন আলো হল—‘শিব জ্ঞানে জীব সেবা!’ শ্রীরামকৃষ্ণ ‘সেবা’ শব্দটি ব্যবহার করলেও, বাস্তবে রূপদানের সময় স্বামী বিবেকানন্দের হাত ধরে তা পুজোয় পরিণত হল। ‘সেবা’ শব্দটিকে আমরা যে ক্ষুদ্র পরিসরে ব্যবহার করে থাকি, সেই রূপরেখা ‘শিব জ্ঞানে জীব সেবা’র ক্ষেত্রে বজায় থাকে না। পুজোর নিষ্ঠায় তা হয়ে ওঠে প্রত্যক্ষ ঈশ্বরলাভের পথ।
সেই পরাধীন যুগে পাশ্চাত্যের মানুষ ভারতের সনাতন ধর্মবোধের দিকে সমালোচনার আঙুল তুলেছিল। যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করেছিল, হিন্দুধর্মই ভারতের সামাজিক অবনমনের জন্য দায়ী। তাই হিন্দুধর্ম ত্যাগ কর! তত্কালীন হিন্দুধর্ম ছিল ছুঁতমার্গের ধর্ম। প্রাচীন জ্ঞানমার্গকে পরিত্যাগ করে নানা সামাজিক আচারে পরিপূর্ণ ছিল এই ধর্মবোধ! একদিকে পুরোহিত শ্রেণির উত্থান, অপরদিকে অদ্বৈতবেদান্তের সাম্যভাবকে ত্যাগ করে ‘আমায় ছুঁয়ো ছুঁয়ো না’ বলে জাতি ব্যবস্থার বাড়াবাড়ি! বালক বেলায় নিজের পিতার বৈঠকখানায় বিভিন্ন জাতির জন্য আলাদা আলাদা করে রাখা হুঁকোয় টান মেরে বিলে দেখতে চেয়েছিলেন, ‘জাত যায় কেমন করে!’ বালকের এই কৌতূহল থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট, এই ‘জাত যাওয়া’ ব্যাপারটা একটা শিশুর মনেও কতটা দাগ কেটেছিল। পরবর্তীকালে যুবক সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ যখন পরিব্রাজক, তখন তিনি নিজের সাধন জীবন দিয়ে এই ভাবকে অতিক্রম করতে চেয়েছিলেন। আগ্রা থেকে বৃন্দাবনের দিকে চলেছেন স্বামীজি। দীর্ঘ ত্রিশ মাইল পথ পদব্রজে চলতে চলতে যখন বৃন্দাবনে প্রায় পৌঁছে গিয়েছেন, তখন হঠাত্ তাঁর চোখে পড়ল রাস্তার ধারে বসে এক ব্যক্তি মনের সুখে তামাক সেবন করে চলেছেন! তিনি সেই ব্যক্তির কাছে এসে তাঁর ছিলিমে দু’-এক টান দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিটি জানালেন, ‘মহারাজ! আমি ভাঙ্গী আছি!’ অর্থাত্ আমি মেথর! স্বামীজি একথা শুনে ধূমপানে নিরস্ত হয়ে আবার পথ চলতে লাগলেন। কিন্তু কিছুদূর গিয়েই তাঁর মনে হল, ‘আরে আমি না সাধু! জাতিবোধ, পারিবারিক সম্বন্ধ সবই তো আমি ত্যাগ করেছি। তবুও আমি ভাঙ্গীর হাতে তামাক খেতে পারলাম না!’ মনে হওয়ামাত্র ফিরে এলেন স্বামীজি। সেই ভাঙ্গীর হাতেই তামাক খেলেন। রাজস্থানেও সেই একই ঘটনা। এক রেল স্টেশনে বসে তিনদিন ধরে অনর্গল কথা বলে চলেছেন স্বামীজি! কত মানুষ এই যুবক সাধুকে দেখতে আসছেন। ধর্ম আলোচনা করে চলে যাচ্ছেন! কিন্তু সন্ন্যাসীর যে তিনদিন খাওয়া হয়নি, সে সম্বন্ধে তাঁরা উদাসীন। এই সময় রেল স্টেশনের কোণ থেকে বেরিয়ে এলেন এক মানুষ, স্টেশনের ধারেই তাঁর কুঁড়েঘর। পেশা আর জাতিতে সে অস্পৃশ্য। কিন্তু হৃদয়ে দেবতা জাগ্রত! তাই ধীরে ধীরে স্বামীজির কাছে এসে বললেন, ‘সাধুবাবা তিনদিন ধরে আপনি কথা বলে চলেছেন, কিন্তু এতটুকু দানাপানি আপনার মুখে পড়েনি! এ দেখে আমার ভারী কষ্ট হয়েছে। কিছু কাঁচা দ্রব্য এনে দিলে আপনি তৈরি করে গ্রহণ করবেন কি?’ একথা শুনে স্বামীজির মনে হল, স্বয়ং দেবতা তাঁর সম্মুখে সুধাপাত্র নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি সেই অস্পৃশ্য মানুষটিকে জানালেন, নিজে প্রস্তুত করে নয়, তাঁদের রান্না করা অন্নই তিনি গ্রহণ করবেন। স্বামীজির প্রস্তাব শুনে আঁতকে উঠেছিলেন দরিদ্র মানুষটি! ‘এ কথা রাজার কানে গেলে প্রাণদণ্ড হওয়ার আশঙ্কা আছে!’ কিন্তু সাধুর প্রেমচক্ষুর আকর্ষণে পরাজিত হন তিনি। হাতে প্রস্তুত করে সেই রুটি তুলে দেন সাধুর সম্মুখে। পরবর্তীকালে এই অস্পৃশ্যতাকে উদ্দেশ করে স্বামী ব্রহ্মানন্দজিকে লেখা একটি চিঠিতে স্বামীজি লিখছেন, ‘হিন্দু ধর্ম বেদে নাই, পুরাণে নাই, ভক্তিতে নাই, মুক্তিতে নাই—ধর্ম ঢুকেছে ভাতের হাঁড়িতে। হিঁদুর ধর্ম বিচারমার্গেও নয়, জ্ঞানমার্গেও নয়, ছুঁতমার্গে। আমায় ছুঁয়ো না, আমায় ছুঁয়ো না, ব্যস। ‘আত্মবত্ সর্বভূতেষু’ কি কেবল পুঁথিতে থাকিবে নাকি? যারা এক টুকরো রুটি গরিবের মুখে দিতে পারে না, তারা আবার মুক্তি কি দিবে! যারা অপরের নিঃশ্বাসে অপবিত্র হয়ে যায়, তারা আবার অপরকে কি পবিত্র করিবে? ছুঁতমার্গ একপ্রকার মানসিক ব্যাধি! সাবধান! সর্বপ্রকার বিস্তারই জীবন, সর্বপ্রকার সংকীর্ণতাই মৃত্যু। ... পরদুঃখ কাতরতা সকলের ভাগ্যে হয় না। রামকৃষ্ণ অবতারে জ্ঞান ভক্তি ও প্রেম। অনন্ত জ্ঞান, অনন্ত প্রেম, অনন্ত কর্ম, অনন্ত জীবে দয়া!’ এই ছুঁতমার্গ থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য স্বামীজি ভারতের প্রাচীন শাস্ত্রকে, সনাতন ধারার কথা স্মরণ করেছেন বারংবার। স্বামীজি লিখছেন, ‘উদ্দেশ্য অনেক আছে, উপায় এদেশে নাই। আমাদের মস্তক আছে, হস্ত নাই। আমাদের বেদান্ত-মত আছে, কার্যে পরিণত করিবার ক্ষমতা নাই। আমাদের পুস্তকে মহাসাম্যবাদ আছে, আমাদের কার্যে মহাভেদবুদ্ধি। মহানিষ্কাম কর্ম ভারতেই প্রচারিত হইয়াছে, কিন্তু কার্যে আমরা অতি নির্দয়, অতি হৃদয়হীন।’
তাই বিদেশে ধর্মপ্রচার বা ধর্মসম্মেলনের আগে স্বামীজি যে সব ঘরোয়া বক্তৃতাগুলি দিয়েছিলেন, তার প্রায় সবক’টিতেই এই আকুতি ফুটে উঠেছে! শুধু তাই নয়, স্বামীজি স্পষ্টভাবে শ্রোতাদের জানাতেন, ধর্মপ্রচার বা ধর্ম মহাসম্মেলনে যোগ দেওয়া ছাড়াও তাঁর বিদেশ যাত্রার নিগূঢ় উদ্দেশ্য আছে। সেই উদ্দেশ্য হল ভারতের দরিদ্র মানুষের জন্য কিছু করা, যাঁরা একবেলা ভাত, অন্যবেলা মহুয়া ফুলের মধু খেয়ে দিন কাটায়। এই জাগতিক উন্নয়নের জন্য বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও শিল্পের প্রসার চেয়েছিলেন স্বামীজি। শিষ্য শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তীকে বলেছিলেন, বিদেশে গিয়ে ব্যবসা কর! ভারতের ডালের সুপ, বেনারসি শাড়ি কেটে স্কার্ট তৈরি করে তা রপ্তানির মতো কত অভিনব পরিকল্পনাই স্বামীজি আমাদের দিয়ে গিয়েছেন। তাঁর এক পরিচিত ব্যক্তিকে বলেছিলেন, ‘পঞ্চাশ বছর পরে দেখবি, রাস্তার মোড়ে মোড়ে চপ, কাটলেটের দোকান হবে।’ আজকের স্ন্যাক্সবারগুলি সেই ভবিষ্যদ্বাণীকেই সত্য বলে প্রমাণিত করেছে। স্বামীজি তাঁর দিব্যদৃষ্টিতে দেখেছিলেন, জাগতিক ক্ষেত্রে ভারতবাসী দৃঢ় হয়ে উঠলে তার সঞ্চিত আধ্যাত্মিকতা গ্রহণে সমগ্র বিশ্ববাসী আগ্রহী হবে। কিন্তু সেই আদর্শকে বাস্তবায়িত করার ক্ষেত্রে অবহেলা, কপটতা দেখেছিলেন স্বামীজি। স্বামী অখণ্ডানন্দের সঙ্গে হিমালয়ের পথে চলেছেন। হঠাত্ এক জায়গায় দেখলেন একজন সাধু আপাদমস্তক বস্ত্রে আবৃত করে বসে আছেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, তিনি বোধহয় ধ্যানমগ্ন। কিন্তু স্বামীজির তীক্ষ্ম চক্ষু অচিরেই আবিষ্কার করেন, সাধুবাবা ঘুমাচ্ছেন। তীব্র বিরক্তি ঝরে পড়ে তাঁর কন্ঠে! তিনি বলে উঠলেন, ‘দে এর কাঁধে লাঙল তুলে দে!’ এই জাতীয় আলস্য দেখে কতই না আক্ষেপ করেছেন তিনি!
শ্রীরামকৃষ্ণ ধর্মকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন তাঁর অভিনব পরীক্ষাগারে! উপস্থিত ভক্তদের বললেন, ‘চোখ খুললে তিনি আছেন, আর চোখ বুজলে নেই!’ স্বামী বিবেকানন্দ সেই ‘দেখা লোকের’ কাছে ধর্মকে জীবন্ত হতে দেখেছিলেন এবং পরবর্তীকালে আলাসিঙ্গা পেরুমলকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আমার গুরুদেবের নিকট হইতে যাহা পাইয়াছি, আমি এখন তাহাই লোককে শিক্ষা দেব।... যে ধর্ম বা যে ঈশ্বর বিধবার অশ্রুমোচন করিতে পারে না অথবা অনাথ শিশুর মুখে একমুঠো খাবার দিতে পারে না, আমি সে ধর্মে বা সে ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না।’
প্রাচীনের আঙিনায় নতুন আদর্শের আলপনা অঙ্কিত করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। সমাজ ও নবগঠিত সন্ন্যাসী সংঘের অনেকেই এই আদর্শ দেখে ভয় পেয়েছেন, দ্বিধান্বিত হয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন স্বয়ং স্বামীজিকে! তাঁর মুখ নিঃসৃত বাক্যই হয়ে উঠেছিল নতুন আধ্যাত্মিক পথের নিউ টেস্টামেন্ট। যে টেস্টামেন্ট অনুসারে শুধু সন্ন্যাসীরা নন, আম জনতাও উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিলেন। রামকৃষ্ণ মঠ গঠনের কিছু পরে ‘শিব জ্ঞানে জীব সেবা’র ধারণায় গড়ে উঠেছিল রামকৃষ্ণ মিশন। যেখানে সন্ন্যাসী ও এই ভাবে অনুসারী ব্যক্তিদের সদস্যপদ গ্রহণ করতে হত। একটা সংগঠিতভাবে নতুন আলোক পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে উদগ্রীব ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। প্রেম-করুণায় পৃথিবীর উদ্দেশে ঝরে পড়েছিল তাঁর আবেগ। জগতের উদ্দেশে বলে উঠেছিলেন, ‘কে দুঃখে আছ? আমার কাছে এস, ঢেলে দাও তোমার দুঃখের বিষ, তারপর ভুলে যাও বিবেকানন্দ বলে কেউ ছিল!’
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : সত্যেন্দ্র পাত্র