নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: পঞ্চায়েতের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর আশিস কর্মকার ছিল চুক্তিভিত্তিক কর্মী। মাসিক বেতন ১০ হাজার ৩৯৮ টাকা। স্বাভাবিকভাবেই বার্ষিক আয় কম বেশি আড়াই লক্ষ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু সেই কর্মীর অ্যাকাউন্টেই পাওয়া গিয়েছে ৭১ লক্ষ টাকার আর্থিক লেনদেনের হদিশ। চাপড়ার হৃদয়পুর পঞ্চায়েতের ভুয়ো জন্ম শংসাপত্রকাণ্ডে ধৃত আশিস কর্মকারের সম্পত্তির তদন্ত করে এমনটাই জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা। পাশাপাশি চারটি গাড়ি সহ তার বিপুল সম্পত্তির হদিশও মিলেছে। যা দেখে তাজ্জব বনে গিয়েছেন তদন্তকারী অফিসাররা। ভুয়ো জন্ম শংসাপত্র বানিয়ে দিয়েই এই বিপুল সম্পত্তি করেছে ধৃত আশিস বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। গত মার্চ মাসে চাপড়া থানার পুলিস তাকে গ্রেপ্তার করে।
কৃষ্ণনগর পুলিস জেলার এক আধিকারিক বলেন, অভিযুক্ত পঞ্চায়েত কর্মীর সম্পত্তি নিয়ে আর্থিক তদন্ত করা হয়েছিল, তাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয় ও সম্পত্তির মধ্যে অসঙ্গতি দেখা গিয়েছে। সেইমতো তদন্ত চলছে।
জানা গিয়েছে, রাজ্যের যে কোনও প্রান্তের বাসিন্দা তিন থেকে চার হাজার টাকা খরচা করলেই অল্প সময়ের মধ্যেই জন্ম শংসাপত্র পেয়ে যেত। যার ফলে সরকারি খাতায় জন্মসূত্রে চাপড়ায় হৃদয়পুর পঞ্চায়েতের বাসিন্দা হয়ে যেত আবেদনকারীরা। পঞ্চায়েত প্রধানের ডিজিটাল স্বাক্ষরের সুযোগ নিয়ে ভিন জেলার বাসিন্দাদেরও ভুয়ো জন্ম শংসাপত্র বানিয়ে দিয়েছে অভিযুক্ত। শংসাপত্র পিছু পঞ্চায়েত কর্মীর পকেটে ঢুকেছে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা। বাকি টাকা যেত দালালদের পকেটে। এইভাবেই সম্পত্তির পাহাড় গড়ে আশিস কর্মকার। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে হওয়া আর্থিক তদন্তের বিষয়টি আদালতে ওঠে। সেখানে তার এই বিপুল সম্পত্তির হিসেব দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত সময়ের আবেদন করে আশিস।
যদিও পুলিস মনে করছে, আয় ও ব্যয়ের মধ্যে যে অসঙ্গতি দেখা গিয়েছে, তা আদালতে সঙ্গত প্রমাণ করতে কালঘাম ছুটে যাবে ধৃত পঞ্চায়েত কর্মীর।
জানা গিয়েছে, আশিস কর্মকার ২০২৩ সাল পর্যন্ত চাপড়া ব্লকের মহেশপুর পঞ্চায়েতে কর্মরত ছিল। সেখান থেকে হৃদয়পুর পঞ্চায়েতে বদলি হয়। সেখানেই ভুয়ো জন্ম শংসাপত্র দিয়ে সে টাকা তুলত বলে অভিযোগ। নদীয়ার চাপড়া ব্লকের হৃদয়পুর পঞ্চায়েতে এক বছরের মধ্যে ১,১২৯টি ভুয়ো নন-ইনস্টিটিউশনাল জন্ম শংসাপত্র ইস্যু করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই ছ’ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিস। ধৃতদের মধ্যে অন্যতম এই আশিস কর্মকার, যে এই চক্রের মূল মস্তিষ্ক বলে জানা গিয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আশিসের সঙ্গে একাধিক সাইবার ক্যাফের মালিক, এক পঞ্চায়েত সদস্যর স্বামী এবং হাঁসখালির এক পঞ্চায়েত সহায়ক জড়িত ছিল। তারা ‘পার্টি’ জোগাড় করে মোটা টাকার বিনিময়ে সিটিজেন পোর্টালের মাধ্যমে জন্ম শংসাপত্রের জন্য আবেদন করাত। এইসব আবেদন যাচাই না করেই আশিস শংসাপত্র ইস্যু করত এবং তার বিনিময়ে মোটা কমিশন নিত। প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী, নন ইনস্টিটিউশনাল জন্ম শংসাপত্র ইস্যুর আগে বিডিওর অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও, এইসব ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।