এআই খোঁজ দিল অজানা নক্ষত্রের। কীভাবে? জানালেন শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়।
এআই খোঁজ দিল অজানা নক্ষত্রের। কীভাবে? জানালেন শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়।
আকাশের অগণিত নক্ষত্রের ভিড়ে হারিয়ে যেতে কে না ভালোবাসে? কিন্তু ক’জনই বা পারে সেই অগণিত বিন্দুর মাঝে নতুন কোনও মহাজাগতিক রহস্য উন্মোচন করতে? নতুন বছরে বিজ্ঞানের দুনিয়ার সবচেয়ে আলোচিত নাম মাত্তেও পাজ। মাত্র ১৭ বছর বয়সি এই মার্কিন কিশোর কোনও ল্যাবরেটরি বা বিশাল টেলিস্কোপ ছাড়াই নিজের শোওয়ার ঘরে বসে যা করে দেখিয়েছে, তা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক মাইলফলক। সে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অর্থাৎ এআই ব্যবহারের মাধ্যমে মহাকাশের প্রায় ১৫ লক্ষ ‘লুকানো’ নক্ষত্র আবিষ্কার করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। নিচু ক্লাস থেকেই তাঁর ঝোঁক ছিল প্রোগ্রামিং ও মহাকাশ বিজ্ঞানের প্রতি। যেখানে সমবয়সিরা গেম খেলে সময় কাটাত, সেখানে মাত্তেও সময় কাটাত নাসার উন্মুক্ত ডেটা আর্কাইভে। তাঁর মনে হয়েছিল যে, আমাদের মহাজাগতিক মানচিত্রে এমন অনেক স্থান আছে যেগুলোকে আমরা ‘শূন্য’ মনে করি, কিন্তু আসলে সেখানে প্রচুর নক্ষত্র থাকতে পারে, যা সাধারণ টেলিস্কোপে ধরা পড়ে না। এই কৌতূহলই তাঁকে এক অসাধ্য সাধনের পথে নিয়ে যায়।
তাঁর মহাকাশ নিয়ে আগ্রহের পেছনে পরিবারের অবদান রয়েছে। মাত্তেও পাজ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের স্যান হোসে শহরের অধিবাসী। তাঁর বাবা মার্ক পাজ একজন দক্ষ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং মা এলিনা পাজ স্থানীয় একটি হাই স্কুলের অঙ্কের শিক্ষিকা।
বাবার কাছে কোডিংয়ের প্রাথমিক পাঠ নেওয়ার পাশাপাশি মায়ের কাছে অঙ্কের জটিল ধাঁধা সমাধান করতে করতে মাত্তেওর মনে বিজ্ঞানের প্রতি এক গভীর অনুরাগ জন্মায়।
মাত্তেও জানত যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে কোটি কোটি ডেটা পয়েন্ট বিশ্লেষণ করা অসম্ভব। তাই সে নিজেই নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ‘গায়া’ মিশনের বিশাল ডেটা সেট ব্যবহার করে একটি বিশেষ এআই অ্যালগরিদম তৈরি করে। তার তৈরি এই এআই মডেলটি মহাকাশের অত্যন্ত অস্পষ্ট আলো এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ক্ষুদ্রতম পরিবর্তনগুলো শনাক্ত করতে সক্ষম ছিল। টানা কয়েক মাসের পরিশ্রমের পর তাঁর প্রোগ্রামটি এমন সব নক্ষত্রপুঞ্জ এবং নক্ষত্র শনাক্ত করতে শুরু করে, যা আগে কখনও কোনও মহাকাশ মানচিত্রে ছিল না। যখন চূড়ান্ত ফলাফল সামনে এল, দেখা গেল সে প্রায় ১৫ লক্ষ নতুন নক্ষত্র খুঁজে পেয়েছে। এগুলো মূলত ছিল ‘ব্রাউন ডোয়ার্ফ’ বা বামন নক্ষত্র এবং এমন সব নক্ষত্র যা ঘন মহাজাগতিক ধূলিকণার আড়ালে ঢাকা পড়ে ছিল।
মাত্তেওর এই আবিষ্কারের খবর যখন নাসার বিজ্ঞানীদের কাছে পৌঁছয়, তাঁরা প্রথমে কিছুটা অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর দেওয়া ডেটা যাচাই করার পর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেন যে, এই নক্ষত্রগুলোর অস্তিত্ব সত্যিই আছে। এই আবিষ্কারের ফলে আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথের ঘনত্ব এবং এর গঠন নিয়ে পুরনো অনেক ধারণার বদল ঘটেছে।
মাত্তেও পাজের এই কাহিনি এখনকার প্রজন্মের ছোটদের কাছে এক গভীর বার্তা বহন করছে। সে দেখিয়ে দিয়েছে যে, বড় কিছু করার জন্য বয়স নয়, বরং গভীর পর্যবেক্ষণ শক্তি এবং শেখার আগ্রহ থাকা জরুরি। আর স্মার্টফোন বা কম্পিউটারকে শুধুমাত্র বিনোদন বা গেম খেলার বদলে যদি আরও বেশি শিক্ষার কাজে লাগানো যায় তবে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। কারণ বর্তমান বিশ্বে তথ্য বা ডেটা হল সবচেয়ে বড় সম্পদ। যাঁরা এই তথ্য বিশ্লেষণ করতে শিখবে, ভবিষ্যৎ তাঁদেরই।
তবে মাত্তেওর এই পথ চলা সহজ ছিল না। কোডিং করার সময় বারংবার ব্যর্থ হওয়া, ইন্টারনেটের ধীর গতি বা অনেক সময় সঠিক গাইডেন্স না পাওয়া তাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বর্তমানে সে তার এআই মডেলটিকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছে, যাতে এটি ‘এক্সোপ্ল্যানেট’ বা সৌরজগতের বাইরের গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করতে পারে। তার মূল লক্ষ্য হল মহাকাশে এমন কোনও গ্রহ খুঁজে বের করা যেখানে প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা আছে। এছাড়া সে ব্ল্যাক হোলের নিকটবর্তী নক্ষত্রগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
মাত্তেওর এই অভাবনীয় সাফল্য তাকে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি ও সম্মান এনে দিয়েছে। সে মর্যাদাপূর্ণ ‘রেজেনেরন সায়েন্স ট্যালেন্ট সার্চ’ প্রতিযোগিতায় শীর্ষস্থান দখল করেছে। নাসা তাকে ‘অনারারি সিটিজেন সায়েন্টিস্ট’ সম্মাননায় ভূষিত করেছে।
ফোর্বস ম্যাগাজিন তাকে ২০২৬ সালের ‘৩০ আন্ডার ৩০’ তালিকায় বিজ্ঞান বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন একটি ক্ষুদ্র গ্রহের নাম মাত্তেওর নামে রাখার প্রস্তাব করেছে।
মাত্তেও পাজ আজ সারা বিশ্বের কিশোর-কিশোরীদের কাছে একজন আইকন। সে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রাতের আকাশে আমরা যে তারাগুলো দেখি, তার বাইরেও এক বিশাল জগৎ লুকিয়ে আছে। সেই জগৎকে চেনার জন্য কেবল চোখের দৃষ্টি নয়, বরং প্রয়োজন প্রখর মেধা আর সাহসের সমন্বয়। মাত্তেও শুধু নক্ষত্র আবিষ্কার করেনি, সে লাখো শিশুর মনে বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসার এক নতুন নক্ষত্র জ্বালিয়ে দিয়েছে।
ভবিষ্যতে হয়তো এই ১৫ লক্ষ তারার মধ্যে কোনও একটির নাম রাখা হবে ‘মাত্তেও’, যা চিরকাল আমাদের মনে করিয়ে দেবে যে— স্বপ্ন দেখলে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করলে আকাশকেও ছোঁয়া যায়।