ইন্দ্রজিৎ রায়, বোলপুর: ‘ওয়েডিং ডিস্টিনেশন’ বলে ইদানীং একটা কথার বেশ প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ছে। কেউ ঘর ছেড়ে পাহাড়ে, কেউ সমুদ্র সৈকতে, কেউ আবার আকাশে বিয়ে করে জীবনে নতুন ইনিংস শুরুর মুহূর্তকে মনের মণিকোঠায় বন্দি করে রাখছেন। তবে, বন্যার জলে সাতপাক ঘুরে দু’টি জীবনকে এক সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার শপথ বোধহয় এর আগে কেউই নেননি।
বীরভূমের সতীপীঠ কঙ্কালীতলা এখনও বানভাসি। মন্দির প্রাঙ্গন জল থইথই। এখানে বিয়ে হলে ছাতনাতলা হয় পঞ্চবটির তলা। মন্দিরের সামনেই সেটি। বিয়ের পর সেখানেই সাতপাকে ঘোরেন নবদম্পতি। সেই পঞ্চবটিকে ঘিরেও এখন প্রায় হাঁটুসমান জল। তাতেই বা কি? রবিবার ওই পঞ্চবটিকেই ‘ওয়েডিং ডেস্টিনেশন’ হিসেবে বেছে নিলেন প্রিয়তোষ রায় ও শ্রাবণী সরকার। জলের সঙ্গে যুদ্ধ করে ঘুরলেন সাতপাক। তাঁদের এই অভিনব বিয়ে দেখতে রীতিমতো ভিড় জমে যায় মন্দির প্রাঙ্গণে। কেউ কেউ ছবিও তুলে রাখলেন। স্থানীয়দের এমন উদ্দীপনা দেখে আপ্লুত পাত্র-পাত্রী দুজনেই।
ইলামবাজারে বাড়ি প্রিয়তোষ-শ্রাবণীর। এদিন ছিল তাঁদের বিয়ে। নব জীবনের শুরুকে স্মৃতিতে ধরে রাখতে প্রায় বন্যাকবলিত কঙ্কালীতলাকেই বেছে নেন তাঁরা। বেশ কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে এমনিতেই জলমগ্ন ছিল মন্দির প্রাঙ্গন। রবিবার সকালে কোপাই নদীর জল বেড়ে ওঠে। আবারও ডুবে যায় কঙ্কালীতলা। হাঁটু জল পেরিয়েই পুণ্যার্থীরা মন্দিরে পুজো দেন। সেই সময়ই বিয়ে করতে হাজির হন ইলামবাজারের দেবীপুর গ্রামের প্রিয়তোষ ও শ্রাবণী। কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী প্রিয়তোষ। কলকাতায় কর্মরত। শ্রাবণীও চাকরি করেন। প্রেমের সম্পর্ক ছিল দু’জনের। দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ের দিন স্থির হয়। দু’জনের পরিবারই ঠিক করেছিল পাত্র-পাত্রী পবিত্র সতীপীঠ কঙ্কালীতলায় সাতপাকে বাঁধা পড়বেন। সেইমত দুই পরিবারের আত্মীয়স্বজন হাজির হন। প্রথা মেনে সতীপীঠের গর্ভগৃহে সম্পন্ন হয় বিয়ের সকল অনুষ্ঠান। এরপর মন্দিরের ওই পঞ্চবটিকে সাক্ষী রেখে হয় মালাবদল ও সাত পাকে বাঁধা পড়া। সবটাই হয় জলের মধ্যে। উপস্থিত বহু দর্শনার্থী সেই দৃশ্য মোবাইলে বন্দি করেন। তাদের মধ্যে অনেকে বলেন, এমন বিয়ে আগে দেখিনি। বর-কনের মুখেও হাসি। বললেন, ‘জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা হল আজ। আমৃত্যু আমাদের মনে থাকবে।’ ফি বর্ষায় এমন জলমগ্ন অবস্থা হয় কঙ্কালীতলায়। জল জমে থাকার দরুণ নিত্যপুজোতেও বিলম্ব হয়। এই অবস্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এদিনও কঙ্কালীতলা পঞ্চায়েত ও শান্তিনিকেতন থানার পুলিস সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এবারের ঘটনা শুধু জলমগ্ন হওয়াই নয়, বরং প্রেম আর সংকল্পেরও ছবি ধরা থাকল কঙ্কালীতলায়। গড়ে উঠল এক নতুন দাম্পত্য জীবন। প্রিয়তোষ-শ্রাবণীকে আশীর্বাদ। -নিজস্ব চিত্র